কপ৩১ এর আগে কী বার্তা দিচ্ছে ভূমধ্যসাগরের সামুদ্রিক কচ্ছপ?

ডিম ফুটে জন্ম নেয়া স্ত্রী লগারহেড কচ্ছপ সাধারণত কয়েক দশক পর আবার সেই সৈকতেই ফিরে আসে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।

জোৎস্না রাতে তুরস্কের ভূমধ্যসাগর উপকূলে বালুর নিচ থেকে ফুটফুটে কচ্ছপের ছানাগুলো বেরিয়ে আসছে। এরপর কোনোদিকে না তাকিয়ে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে তারা ছুটে চলেছে উত্তাল সাগরের দিকে। যুগ যুগ ধরে চলে আসা প্রকৃতির এই প্রাচীন জীবনচক্র আজ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনে উষ্ণ হয়ে উঠছে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, বদলে যাচ্ছে কচ্ছপের জীবনচক্রও। বিজ্ঞানীদের মতে, এসব পরিবর্তন পুরো সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য আগাম সতর্কবার্তা।

তুরস্কের ইজতুজু সৈকতে রাতভর কচ্ছপের বাসা পর্যবেক্ষণ করেন সামুদ্রিক কচ্ছপবিষয়ক গবেষক ইয়াকুপ কাস্কা ও তার দল। দিনের বেলায় পর্যটকদের ভিড় থাকলেও রাতে ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বালুচর হয়ে ওঠে কচ্ছপ সংরক্ষণের জায়গা। বালুর নিচে থাকা ডিম শিয়ালের হাত থেকে বাঁচাতে বাসার ওপর বসানো হয় পিরামিডের মতো খাঁচা। ছানাগুলো কখন বালু ভেঙে বেরিয়ে আসে, সেদিকে নজর রাখে দলটি।

ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে বাসা বাঁধা লগারহেড প্রজাতির এই কচ্ছপকে আগামী মাসে তুরস্কে অনুষ্ঠিতব্য জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন কপ৩১-এর প্রতীক হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছে। সম্মেলনে সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় হবে। গবেষকদের মতে, ১৯৮০-এর দশকের শুরু থেকে ভূমধ্যসাগরের তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর প্রভাব পড়ছে কচ্ছপের ডিম, ছানার জন্ম এবং বেঁচে থাকার ওপর।

বালুর তাপমাত্রার কারণে বদলে যাচ্ছে কচ্ছপের জীবনচক্র

কচ্ছপের ছানা স্ত্রী হবে, নাকি পুরুষ, তা অনেকটাই নির্ভর করে ডিম ফোটার সময় বালুর তাপমাত্রার ওপর। বালু বেশি উষ্ণ হলে স্ত্রী ছানার জন্মের সম্ভাবনা বাড়ে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কচ্ছপের বংশবিস্তারের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

উস্কুদার বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ্যার শিক্ষক আয়ফের সিরিন লগারহেড কচ্ছপ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তার মতে, কচ্ছপকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক ধরনের দ্রুত সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা যায়। কারণ প্রজননের জন্য তাদের স্থলভাগের সৈকত প্রয়োজন, আবার খাবার ও বেড়ে ওঠার জন্য নির্ভর করতে হয় সমুদ্রের ওপর। ফলে উপকূল ও সামুদ্রিক পরিবেশের পরিবর্তন তাদের জীবনেই দ্রুত ধরা পড়ে।

পামুক্কালে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ বছর ধরে করা গবেষণায় সিরিন দেখেছেন, তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে কচ্ছপের বাসা বাঁধার সময় এগিয়ে আসছে, ডিম ফোটার সময় কমছে এবং স্ত্রী ছানার সংখ্যা বাড়ছে।

পাতারা সৈকতে করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, গড়ে প্রায় ৭০ শতাংশ ছানা স্ত্রী। গবেষণার সিদ্ধান্ত, আচরণে কিছু পরিবর্তন এনে কচ্ছপ হয়তো উষ্ণতার সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে পারে, কিন্তু তাতে জলবায়ু পরিবর্তনের সব প্রভাব ঠেকানো সম্ভব নয়।

ইজতুজু সৈকতে গত ২০ বছরে বাসার তাপমাত্রা প্রায় এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে বলে জানিয়েছেন কাস্কা। তার ভাষ্য, বিভিন্ন কচ্ছপের ওপর করা বৃহত্তর বিশ্লেষণে অনেক জনগোষ্ঠীতে স্ত্রী ছানার হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে।

এভাবে তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে একসময় প্রজননের জন্য প্রয়োজনীয় পুরুষ কচ্ছপের সংখ্যা কমে যেতে পারে। সিরিন জানান, বাসার তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে ভ্রূণ মারা যাওয়ার ঝুঁকিও বাড়ে। অর্থাৎ, উষ্ণ বালু একদিকে স্ত্রী ছানার সংখ্যা বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে কিছু ডিমের ভেতরেই প্রাণের বিকাশ থেমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।

বিশ্বজুড়ে লগারহেড কচ্ছপকে ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। তবে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের কচ্ছপের অবস্থা তুলনামূলক ভালো। সংরক্ষণ কার্যক্রমের অগ্রগতির কারণে সেখানে তাদের কম উদ্বেগজনক শ্রেণিতে রাখা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই সাফল্যের মধ্যেও জলবায়ু পরিবর্তন নতুন চাপ তৈরি করছে।

এক সৈকতে জন্ম, কিন্তু খাবারের খোঁজে অন্য দেশে

কচ্ছপের জীবনচক্র শুধু একটি সৈকতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তুরস্কের সৈকতে ডিম পাড়া কচ্ছপ খাবারের সন্ধানে যেতে পারে তিউনিসিয়া কিংবা অ্যাড্রিয়াটিক সাগরে। তাই তাদের রক্ষায় বিভিন্ন দেশের মধ্যে সমন্বয় জরুরি বলে মনে করেন কাস্কা। তার মতে, একটি দেশে কচ্ছপের বাসা রক্ষা করলেই হবে না। সমুদ্রজুড়ে তাদের বিচরণক্ষেত্রও নিরাপদ রাখতে হবে।

তুরস্কের পরিবেশমন্ত্রী ও কপ৩১-এর সভাপতি মুরাত কুরুম গত মাসে এক সমুদ্রবিষয়ক সম্মেলনে বলেন, সমুদ্র রক্ষা সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এ দায়িত্বকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দিতে হবে, পুনরুদ্ধার করতে হবে বাস্তুতন্ত্র এবং বাড়াতে হবে প্রকৃতির পরিবর্তন মোকাবেলার সক্ষমতা।

২০৫৩ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ শূন্যে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে তুরস্ক। দেশটির জলবায়ু কৌশলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তারও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।

জালে আটকে মৃত্যু, প্লাস্টিকে ভরে যাচ্ছে পেট

ডিম ফুটে জন্ম নেয়া স্ত্রী লগারহেড কচ্ছপ সাধারণত কয়েক দশক পর আবার সেই সৈকতেই ফিরে আসে, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল। তবে পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে কিছু কচ্ছপ এখন উত্তরের এমন সব সৈকতে বাসা বাঁধছে, যেখানে আগে তাদের দেখা কম মিলত বলে জানিয়েছেন কাস্কা।

তারপরও ইজতুজু সৈকত কচ্ছপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। প্রতি মৌসুমে এখানকার শত শত বাসা থেকে প্রায় ৩০ হাজার ছানা সমুদ্রে প্রবেশ করে। সৈকতে স্বেচ্ছাসেবীরা মৃদু লাল আলো ব্যবহার করে তাদের চলাচল পর্যবেক্ষণ করেন, যাতে আলো ও মানুষের উপস্থিতিতে ছানাগুলো বিরক্ত না হয়। ঢেউয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই ছোট প্রাণীগুলোর জন্য সমুদ্রেও অপেক্ষা করে নানা বিপদ। মাছ ধরার জাল, নৌকা ও প্লাস্টিক বর্জ্য তাদের জীবন কেড়ে নিতে পারে।

সিরিন বলেন, মাছ ধরার জালে আটকে গেলে কচ্ছপ আর বাতাস নিতে পানির ওপরে উঠতে পারে না। শেষ পর্যন্ত পানিতেই ডুবে মারা যায়।

ইজতুজু সৈকত থেকে অল্প দূরেই দেকামের পুনর্বাসনকেন্দ্র। সেখানে বড় গোলাকার জলাধারে চিকিৎসা চলে আহত কচ্ছপের। নৌকার পাখার আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত কচ্ছপসহ বিভিন্ন কারণে আহত প্রাণীদের সেবা দেন পশুচিকিৎসকরা।

কেন্দ্রটিতে আসা কচ্ছপের অন্তত ৬০ শতাংশের পরিপাকতন্ত্রে পাঁচ বা তার বেশি প্লাস্টিকের টুকরা পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন কাস্কা। তার কথায়, সমুদ্রে একটি প্লাস্টিকের ব্যাগ ফেলে দেয়া কচ্ছপের দিকে গুলি ছোড়ার মতো।

গবেষকদের কাছে কচ্ছপ তাই শুধু একটি প্রাণী নয়, ভূমধ্যসাগরের সামগ্রিক পরিবেশের স্বাস্থ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক। রাতের শেষে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে শেষ দল ছানাও ঢেউয়ের মধ্যে হারিয়ে যায়। বেঁচে থাকলে তাদের কেউ কেউ কয়েক দশক পর আবার ফিরবে জন্মসৈকতে, নতুন প্রজন্মের জন্ম দিতে। কিন্তু তত দিনে সমুদ্র ও বালুর তাপমাত্রা কতটা বদলে যাবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন।

—রয়টার্স থেকে অনূদিত ও পরিমার্জিত

আরও