জাপানে সম্প্রতি চেরি ব্লসম বা সাকুরার মৌসুম শুরু হয়েছে। সাধারণত মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরুতে এ মৌসুম শুরু হয়। চলতি মৌসুমে এরই মধ্যে টোকিও, ফুকুওকা এবং অন্যান্য অঞ্চলে ফুটতে শুরু করেছে। জাপানের বিভিন্ন শহর ছেয়ে গেছে গোলাপি ও সাদা ফুলে। অপূর্ব দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা।
চেরি ব্লসম মৌসুমের ইতিহাস
চেরি ব্লসম বা সাকুরার সঙ্গে জাপানের সম্পর্ক শতাব্দী-প্রাচীন। এর ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় হেইয়ান যুগে (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ)। সে সময় অভিজাত শ্রেণির লোকেরা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ‘হানামি’ বা ফুল দেখার উৎসবের প্রথা শুরু করে।
চেরি ব্লসমে মুগ্ধ বিশ্ব ছবি: রয়টার্স
প্রাথমিকভাবে এটি প্লাম ব্লসম নিয়ে শুরু হলেও নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে চেরি ব্লসম প্রধান আকর্ষণ হয়ে ওঠে। সাকুরা জাপানি সংস্কৃতিতে জীবনের ক্ষণস্থায়ী প্রকৃতির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়, যা জাপানিজ দর্শনের ‘মনো নো আওয়ারে’ (ক্ষণস্থায়ী জিনিসের সৌন্দর্য) ধারণার প্রতিফলন।
এডো যুগে (১৬০৩-১৮৬৮) হানামি সাধারণ মানুষের মধ্যেও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শোগুনরা চেরি গাছ রোপণকে উৎসাহিত করায় শহর ও গ্রামাঞ্চলে এর বিস্তার ঘটায়।
ওয়াশিংটনে চেরি ব্লসম ছবি: রয়টার্স
আধুনিক যুগে জাপানের বিভিন্ন পার্কে ব্যাপকভাবে সাকুরা গাছ লাগানো হয়। পাশাপাশি, ১৯১২ সালে জাপান ওয়াশিংটন ডিসি-তে দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে ৩,০০০ চেরি গাছ উপহার দেয়। ফলে এর প্রচলন শুধু জাপানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী।
অপূর্ব দৃশ্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা ছবি: রয়টার্স
বিংশ শতাব্দীতে চেরি ব্লসম জাপানের জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটি সৈনিকদের জন্য আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। তবে যুদ্ধের পর তা আবার শান্তি ও পুনর্জন্মের প্রতীক হয়ে ফিরে আসে। আজ জাপানে প্রায় ৬০০ প্রজাতির চেরি গাছ রয়েছে, যার মধ্যে ‘সোমেই ইয়োশিনো’ সবচেয়ে জনপ্রিয়।
জাপানে চেরি ব্লসম মৌসুম ২০২৫-এর শুরু
জাপানের আবহাওয়া সংস্থা ইতিমধ্যে চেরি ব্লসম মৌসুম শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে। টোকিওতে এটি মার্চের শেষ সপ্তাহে শুরু হয় যেখানে গাছগুলো একযোগে ফুলে ঢেকে যায়। এই বছর চেরি ব্লসম মৌসুম কিছুটা ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে শুরু হলেও পর্যটকদের উৎসাহে কোন ভাটা পড়েনি। জাপানিরা এই সময়ে ‘হানামি’ উৎসব পালন করে। পার্কে, নদীর তীরে বা গাছের নিচে বসে তারা ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করে।
ছবি: এপি
জাপান আবহাওয়া সংস্থার টোকিও আঞ্চলিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের কর্মকর্তারা গত ২৪ মার্চ, সোমবার, টোকিওর ইয়াসুকুনি শ্রাইন-এ থাকা সোমেই ইয়োশিনো নমুনা গাছের ফুল ফোটার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন।
বিশ্বব্যাপী আয়োজন
জাপানের বিভিন্ন শহর ছেয়ে গেছে চেরি ব্লসমে ছবি: রয়টার্স
টোকিও: টোকিওতে চেরি ব্লসম উৎসব পুরো দমে চলছে। স্থানীয়রা ও পর্যটকরা ঠান্ডা আবহাওয়া উপেক্ষা করে পার্ক ও নদীর তীরে জড়ো হয়ে সাকুরার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। এএফপি’র একটি ভিডিও রিপোর্টে দেখা গেছে, শত শত মানুষ গাছের নিচে পিকনিক করছেন এবং ছবি তুলছেন।
চেরি ব্লসমে মুগ্ধ বিশ্ব ছবি: রয়টার্স
ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র: জাপানের কাছ থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া চেরি গাছগুলো এখানেও ফুটতে শুরু করেছে। ন্যাশনাল চেরি ব্লসম ফেস্টিভালের অংশ হিসেবে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্যারেডের আয়োজন করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনে চেরি ব্লসম ছবি: রয়টার্স
সিউল, দক্ষিণ কোরিয়া: দক্ষিণ কোরিয়াতেও চেরি ব্লসম ফুটেছে। সিউলের ইয়োউইডো পার্কে হাজারো দর্শনার্থী ফুল দেখতে ভিড় করছেন। এপ্রিল ১-২ তারিখে এখানে ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা ও স্থানীয় খাবারের মেলার আয়োজন করা হয়েছে।
লন্ডনে চেরি ব্লসম ছবি: রয়টার্স
লন্ডন, যুক্তরাজ্য: লন্ডনে কিউ গার্ডেনে একটি বিশেষ চেরি ব্লসম প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। এপ্রিল ১ তারিখে এখানে জাপানি চা অনুষ্ঠান ও ফুলের বিন্যাস প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।