ফুটবল স্টেডিয়াম মানেই সমর্থকদের উচ্চকণ্ঠ। ঢাক-ঢোলের তালে তালে উচ্ছ্বাস, পতাকা ওড়ানো আর বিজয়ের গান। কখনো চিৎকার, গলাবাজি, গালাগালি এমনকি হাতাহাতি। হাজারো কণ্ঠের সেই কোলাহল, প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও একজন মানুষ নীরব থাকেন পুরো সময়জুড়ে। অথচ সেই নীরবতাই তাকে বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরিচিত সমর্থকে পরিণত করেছে। পরিচিতি ‘লুমুম্বা ভেয়া’ নামে।
গ্যালারিতে স্যুট-টাই পরা, এক হাত উঁচু করে স্থির দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটিকে প্রথম দেখলে অনেকেই বিস্মিত হন। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি প্রায় একই ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকেন। চারপাশের উৎসবের আমেজের মধ্যে তিনি এক জীবন্ত ভাস্কর্য। কিন্তু এই নীরবতার পেছনে রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি ও দেশপ্রেমের এক গভীর গল্প।
লুমুম্বা ভেয়ার প্রকৃত নাম মিশেল কুকা এম্বোলাডিঙ্গা। তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘লুমুম্বা ভেয়া’ রেখেছেন। এ কথার অর্থ ‘লুমুম্বা বেঁচে আছেন’। এই নাম ও তার সাজসজ্জা ও উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি শ্রদ্ধা জানাতে চেয়েছেন কঙ্গোর স্বাধীনতা সংগ্রামের মহান নেতা প্যাট্রিস লুমুম্বাকে।
আফ্রিকায় উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন প্যাট্রিস। ১৯৬০ সালে তিনি স্বাধীন কঙ্গোর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নজর দিয়েছিল কঙ্গোর খনিজ সম্পদের দিকে। কিন্তু লুমুম্বা ছিলেন প্রতিবাদী ও প্রতিরোধের কণ্ঠস্বর। ফলে এক বছরের মধ্যেই নানা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। খুন হন লুলুম্বা। ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয় তাকে। শোনা যায় তার দেহ টুকরো করে পরে সালফিউরিক অ্যাসিড দিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। অবশিষ্ট হাড় পুড়িয়ে দেয়া হয় যেন লুমুম্বার কোনো সমাধি না থাকে। যেন তাকে ঘিরে নতুন করে আন্দোলন না হয়। যেন তাকে ভুলে যায় স্বাধীনতাকামীরা। প্রতিবাদ এভাবেই বন্ধ করতে চেয়েছিল সাম্রাজ্যবাদীরা।
প্যাট্রিস লুমুম্বা। ছবি: দি আফ্রিকা রিপোর্ট
কিন্তু প্রতিবাদী চেতনা, দেশপ্রেম ও সৎ মানুষদের ভুলিয়ে দেয়া সহজ না। সে কারণেই আজো প্যাট্রিস লুমুম্বাকে মনে রেখেছে ইতিহাস। তার তাকেই যেন ফিরিয়ে এনেছেন তার দেশের এক নাগরিক। প্যাট্রিস লুমুম্বা এখনো কঙ্গোর স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং অধরা স্বপ্নের প্রতীক। বিশ্বেও সম্মানিত। মিশেল এম্বোলাদিঙ্গা সেই স্মৃতিকেই নতুনভাবে ফিরিয়ে এনেছেন ফুটবল গ্যালারিতে। গ্যালারিতে মিশেল মূলত লুমুম্বাকেই তুলে ধরেন। তার ভঙ্গি মূলত লুমুম্বার একটি মূর্তির অনুকৃতি।
২০১০-এর দশকের শুরু থেকে কঙ্গোর জাতীয় ফুটবল দল ‘লিওপার্ডস’-এর ম্যাচে নিয়মিত উপস্থিত হচ্ছেন লুমুম্বা ভেয়া। আফ্রিকা কাপ অব নেশনস থেকে শুরু করে বিশ্বকাপের মঞ্চ, যেখানেই কঙ্গো খেলেছে, সেখানেই দেখা গেছে তাকে। সমর্থনের তার এই অভিনব ধরন দ্রুতই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়ে। তাকে নিয়ে কিছু বিতর্কও হয়েছে। তবে মিশেলের উদ্দেশ্য প্রকাশ হওয়ার পর থেকে তার ও প্যাট্রিসের প্রতি নতুন করে আগ্রহ দেখাতে শুরু করে সবাই।
এখন বিশ্ব ফুটবলের বড় আসরগুলোয় টেলিভিশন ক্যামেরা প্রায়ই তাকে খুঁজে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার ছবি ও ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই তাকে ‘বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী সমর্থক’ হিসেবে অভিহিত করেন। কঙ্গোর জাতীয় দলও নিজেদের সঙ্গে দলের অংশ হিসেবে মিশেলকে সঙ্গী করে।
গ্যালারিতে মিশেল এম্বোলাডিঙ্গা। ছবি: আফ্রিকা গ্লোবাল নিউজ
খ্যাতি বা প্রচারের জন্য নয়, বরং দেশের সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়কে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এই পথ বেছে নিয়েছেন লুমুম্বা ভেয়া। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নানা সংকটে জর্জরিত কঙ্গোর মানুষের জন্য ফুটবল একটি বড় ঐক্যের প্রতীক। সেই ঐক্যের বার্তাই তিনি ছড়িয়ে দিতে চান নিজের নীরব উপস্থিতির মাধ্যমে।
ক্লাব ফুটবল থেকে বিশ্বকাপ ফুটবল, সবখানেই সমর্থকদের উন্মাদনা অনেক সময় কেবল গর্জন, উপস্থাপনা, নাচ গান এমনকি রঙের প্রদর্শনীতে ছড়িয়ে যায়। জাতীয়তাবাদও উগ্র হয়ে ওঠে। এর মধ্যেই সেখানে লুমুম্বা ভেয়া দেখিয়েছেন, সমর্থনের ভাষা সবসময় উচ্চকণ্ঠ হতে হয় না। কখনো কখনো নীরবতাও হতে পারে সবচেয়ে শক্তিশালী বার্তা। তার নীরব অবস্থান যেন স্মরণ করিয়ে দেয় দেশপ্রেম, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়ের শক্তি শব্দের চেয়েও অনেক বেশি গভীর।