ভাষা মানুষের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৭ হাজারেরও বেশি ভাষা প্রচলিত আছে। কিন্তু আমরা কি জানি, এই বিশাল শব্দভাণ্ডারের শুরুটা হয়েছিল কোথায়? কোন ভাষাটি পৃথিবীর বুকে প্রথম উচ্চারিত বা লিখিত হয়েছিল?
ভাষা ক্রমাগত বিবর্তিত হচ্ছে। কিছু অনুমান অনুযায়ী, ২১০০ সালের মধ্যে এগুলোর অন্তত অর্ধেক বিলুপ্ত বা মারাত্মকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়বে। নতুন ভাষা তৈরি হওয়া, পরিবর্তন হওয়া, হারিয়ে যাওয়া এবং নতুন করে আবিষ্কৃত হওয়ার এই ধারায় কোনটি প্রথম এসেছিল তা খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। তাহলে, বিশ্বের প্রাচীনতম ভাষা কোনটি? দেখা যাচ্ছে, এটি একটি জটিল প্রশ্ন যার কোনো একক উত্তর নেই।
ইতিহাসের ধোঁয়াশা ও লিখন পদ্ধতির লড়াই
পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক গ্যারেথ রবার্টসের মতে, মানুষ যখন প্রাচীনতম ভাষা নিয়ে প্রশ্ন করে, তারা আসলে জানতে চায় ইতিহাসের সবচেয়ে পুরনো ‘লিখিত’ প্রমাণ কোনটি। কারণ, মানুষ কথা বলতে বা ইশারা ভাষা ব্যবহার করতে শিখেছে লিখতে শেখার হাজার হাজার বছর আগে। কিন্তু প্রাচীন সেই সব কথ্য ভাষার কোনো প্রমাণ আমাদের কাছে নেই, কারণ সেগুলো পাথর বা মাটির মতো স্থায়ী মাধ্যমে ধরে রাখা হয়নি।
সুমেরীয় বনাম মিশরীয়: কে আগে?
ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শনের লড়াইয়ে সমানে সমান অবস্থানে আছে দুটি প্রাচীন সভ্যতা: সুমেরীয় এবং মিশরীয়।
সুমেরীয় কিউনিফর্ম: বর্তমান ইরাক অঞ্চলে মেসোপটেমীয় সভ্যতায় প্রায় ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার বছর আগে কীলক আকৃতির এই লিখন পদ্ধতির উদ্ভব হয়। মূলত বাণিজ্যের হিসাব রাখার জন্য কাদার চাকতিতে এই চিহ্নগুলো ব্যবহার করা হতো।
মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফিক: প্রায় একই সময়ে মিশরেও চিত্রলিপি বা হিয়েরোগ্লিফিকের বিকাশ ঘটে। মজার ব্যাপার হলো, সুমেরীয়রা আগে লিখতে শুরু করলেও ইতিহাসে প্রথম ‘পূর্ণাঙ্গ বাক্য’ পাওয়া গেছে মিশরীয় লিপিতে। ফারাও সেথ-পেরিবসেনের সমাধিতে পাওয়া সেই বাক্যের অর্থ— 'তিনি তার পুত্র রাজা পেরিবসেনের জন্য দুই ভূমিকে একত্রিত করেছেন।'
বর্তমানে টিকে থাকা প্রাচীনতম ভাষা কোনটি?
অনেকেই অবাক হতে পারেন এটি জেনে যে, প্রাচীন সেই সব ভাষার অধিকাংশই আজ মৃত। তবে অধ্যাপক রবার্টসের মতে, যদি প্রশ্ন করা হয়—আজও পৃথিবীতে কথা বলা হয় এমন কোন ভাষার লিখিত রূপ সবচেয়ে পুরনো? তবে উত্তর হবে গ্রিক। এই ভাষার প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শন এবং বর্তমানের আধুনিক গ্রীক ভাষার মধ্যে একটি সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে, যা অন্য অনেক প্রাচীন ভাষার ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না।
কেন সঠিক উত্তর পাওয়া কঠিন?
ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্লেয়ার বোয়ার্ন একটি চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, 'একটি ভাষার বয়স নির্ধারণ করা কোনো শিশুর বয়স বলার মতো নয়; এর কোনো নির্দিষ্ট জন্মদিন নেই।' ভাষা কোনো স্থির বস্তু নয়, এটি সময়ের সাথে সাথে নদী বা স্রোতের মতো পরিবর্তিত হয়।
আজ আমরা যে ভাষাগুলোতে কথা বলি, তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের বিবর্তন। কোনো গুহাচিত্র থেকে শুরু হওয়া আদি-লিখন (Proto-writing) কালক্রমে বর্ণমালায় রূপ নিয়েছে। হয়তো মাটির নিচে এমন কোনো লিপি এখনো চাপা পড়ে আছে যা আমাদের জানা সমস্ত ইতিহাসকে বদলে দিতে পারে। ততদিন পর্যন্ত সুমেরীয় কিউনিফর্ম এবং মিশরীয় হিয়েরোগ্লিফিক্সকেই আমরা ভাষার ইতিহাসের আদিমতম স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করতে পারি।