কাঠমান্ডুর আকাশে এক সময় চোখ রাখলেই দেখা যেত হিমালয়ের গম্ভীর গৌরব। সেই তুষারে মোড়া শৃঙ্গগুলো যেন ছিল সেখানকার বাসিন্দা ও পর্যটকদের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু এখন, বহু বছর পর বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের পরিবেশ বিষয়ক প্রতিনিধি নাভিন সিং খাড়কা দেশে ফিরে প্রতিবারের মতো সেই পুরনো চেনা দৃশ্যটা আবার চোখে পড়বে বলে আশা করেছিলেন। অথচ তিনি দেখলেন, বাস্তবতা ঠিক এর উল্টো।
এখন হিমালয় যেন চোখের আড়ালেই রয়ে গেছে—একটা ধোঁয়াশার চাদরের পেছনে। বসন্ত কিংবা শরতের নির্মল আকাশও আজকাল আর পরিষ্কার থাকে না। সর্বত্র শুধু কুয়াশার মতো ঘনীভূত দূষণ। গত এপ্রিল মাসে কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে অবতরণ করতে গিয়ে নাভিনের ফ্লাইটটিকে আকাশেই প্রায় বিশবার চক্কর খেতে হয়েছে। কারণ নিচে এতটাই ঝাপসা যে রানওয়ে দেখা যাচ্ছিল না।
দুই সপ্তাহের সফরে এমন একটি হোটেলে তিনি উঠেছিলেন, যেখান থেকে ভালো আবহাওয়ায় হিমালয় স্পষ্ট দেখা যাওয়ার কথা। কিন্তু সে সুযোগ একদিনও হল না। এমনকি কাঠমান্ডুর বাইরে নাগরকোটের মতো প্রসিদ্ধ পর্যবেক্ষণস্থান থেকেও শুধু ধূসর ধোঁয়াশা—হিমালয় যেন হারিয়ে গেছে দিগন্ত থেকে।
হিমালয়ের এই ‘অদৃশ্য হয়ে যাওয়া’র পেছনে রয়েছে ভয়াবহ বায়ু দূষণ। ধুলিকণা, ধোঁয়া ও জ্বলন্ত বর্জ্যের কণা মিলে একটি ঘন বায়বীয় স্তর তৈরি করছে, যা আকাশে আটকে থাকায় দৃষ্টিসীমা নেমে এসেছে ৫ হাজার মিটারের নিচে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘতর হওয়ায় দূষণ এখন আরো দীর্ঘ সময় স্থায়ী হচ্ছে।
আগে মার্চ থেকে মে এবং অক্টোবর-নভেম্বর ছিল পাহাড় দেখা ও ভ্রমণের সেরা সময়। এখন এসব মাসেও ঘন ধোঁয়াশা, দৃষ্টিসীমায় নেই হিমালয়! ডিসেম্বর থেকেই শুরু হচ্ছে এই অবস্থা, যা কখনো কখনো বর্ষা আসা পর্যন্ত চলতে থাকে।
বাঁয়ের ছবিতে পরিষ্কার দিনে যেখানে ফিশটেইল পর্বতশৃঙ্গ চোখে পড়ে, ডানে একই স্থান থেকে তোলা ছবি। তবে এবার পর্বতমালাটি ঢাকা ধোঁয়াশার চাদরে। ছবি-বিবিসি
নেপালের প্রথম দিকের একজন নারী ট্রেকিং গাইড লাকি ছেত্রী বলছেন, হিমালয় দেখা না যাওয়ায় ব্যবসা প্রায় ৪০% কমেছে। গত বছর এক গ্রুপকে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে, কারণ গাইডরা তাদের শৃঙ্গ দেখাতে পারেননি।
কেউ কেউ হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন, কেউ আবার বারবার ফিরে আসছেন এক ঝলক পাহাড় দেখার আশায়। পর্যটননির্ভর শহরগুলোতে হোটেল ব্যবসায়ীরাও দিশেহারা। নাগরকোটের অভিজ্ঞ হোটেল মালিক যোগেন্দ্র শাক্য বলেন, ‘আগে সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত আর হিমালয়ের ভিউ ছিল আমাদের ব্র্যান্ডিংয়ের মূল অংশ। এখন তা বাদ দিয়ে ইতিহাস-সংস্কৃতিকে সামনে আনছি।‘
ভারতের উত্তরাখণ্ড বা পাকিস্তানের গিলগিটেও কমবেশি একই চিত্র। যেখানে আগে চোখে পড়ত পাহাড়ের সারি, এখন সেখানে ছড়িয়ে থাকে ধূলিময়তা। পাকিস্তানের পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার সাবেক প্রধান আসিফ শুজা বলেন, একটা ধোঁয়াশার চাদর যেন দীর্ঘ সময় ধরে আকাশে ঝুলে থাকে।
দক্ষিণ এশিয়ার শহরগুলো নিয়মিতভাবে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় থাকে। গাড়ি ও শিল্পের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা, খোলা আকাশে বর্জ্য পোড়ানো, কৃষিজ আবর্জনা পোড়ানো—সব মিলিয়ে দূষণ ক্রমাগত বাড়ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্টি হওয়া দীর্ঘ শুষ্ক মৌসুম বনাঞ্চলের দাবানলকেও আরো ভয়াবহ করে তুলেছে।
নেপালের আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে পোখারা বিমানবন্দরে ২৩টি দিনকে হেজি বা ঝাপসা হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬৮-তে।
দক্ষিণ এশিয়ার গর্ব হিমালয় আজ যেন তারই মানুষের কারণে অন্তরালে চলে যাচ্ছে। যে শৃঙ্গেরা ছিল ছবির মতো জীবন্ত, তারা এখন হয়তো শুধু ছবিতেই রয়ে যাবে। আর এই অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে না দেখে ফিরে যাওয়া ট্রেকারদের পাশাপাশি বিব্রত হচ্ছেন স্থানীয় গাইড, হোটেল ব্যবসায়ী, ও ট্যুর অপারেটররাও।
লাকি ছেত্রী বলেন, ’কখনো কখনো মনে হয় আমরা যেন অপরাধবোধ নিয়েই ব্যবসা করছি। কারণ পর্যটকেরা যে সৌন্দর্যের জন্য আসেন, সেটা আমরা এখন দেখাতে পারি না। আর এই ধোঁয়াশার বিরুদ্ধে আমাদের কিছুই করার থাকে না।'