উপন্যাসে মিলবে প্রকৃত স্বাদ

পর্দায় হারিয়ে যাচ্ছে জেন অস্টিনের সূক্ষ্মতা— কী বলছেন সমালোচকরা

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ক্যাথরিন সাদারল্যান্ড মনে করেন, পর্দায় অস্টিনের গল্পকে অনেক বেশি রোমান্টিক করে তোলা হয়। অথচ অস্টিনের মূল আগ্রহ ছিল তার নায়িকাদের মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক সংকট। তার চরিত্রগুলোকে শুধু প্রেমের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখা যায় না। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নারীদের সীমাবদ্ধতাও তার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ

বারবার পর্দায় ফিরেছে জেন অস্টিনের উপন্যাস। প্রতিবারই নতুন প্রজন্মের দর্শক তার গল্প, চরিত্র ও প্রেমের কাহিনির সঙ্গে পরিচিত হয়েছে। চলতি বছরও অস্টিনের দুটি বহুল পরিচিত উপন্যাসের নতুন চিত্রায়ন আসছে। জর্জিয়া ওকলির ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’ থেকে নির্মাণ করেছেন সিনেমা। ‘প্রাইড অ্যান্ড প্রেজুডিস’–থেকে হয়েছে নতুন টিভি সিরিজ।

অবশ্য অস্টিনের ভক্ত ও গবেষকদের কাছে প্রশ্নটা শুধু গল্প পর্দায় এসেছে কিনা, তা নয়। তাদের মতে, অস্টিনের উপন্যাসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক চলচ্চিত্র ও সিরিজে প্রায়ই বদলে যায়। বিশেষ করে প্রেম, পোশাক, ভাষা ও চরিত্র নির্বাচনে এমন কিছু পরিবর্তন থাকে, যা মূল লেখার স্বাদ অনেকটাই পাল্টে দেয়।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক ক্যাথরিন সাদারল্যান্ড মনে করেন, পর্দায় অস্টিনের গল্পকে অনেক বেশি রোমান্টিক করে তোলা হয়। অথচ অস্টিনের মূল আগ্রহ ছিল তার নায়িকাদের মনস্তত্ত্ব ও নৈতিক সংকট। তার চরিত্রগুলোকে শুধু প্রেমের সম্পর্কের মধ্য দিয়ে দেখা যায় না। সামাজিক অবস্থান, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নারীদের সীমাবদ্ধতাও তার গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অক্সফোর্ডের অধ্যাপক স্যান্ডি বায়র্নের মতে, অস্টিন জানতেন বাজার কী চায়। তাই তার গল্পে নায়ক-নায়িকার সম্পর্কের পরিণতি থাকে। কিন্তু বিয়ে বা প্রেমের প্রস্তাবকে তিনি কখনো গল্পের একমাত্র চূড়ান্ত মুহূর্ত বানাননি। চলচ্চিত্রে সেটিই অনেক সময় প্রধান হয়ে ওঠে। ফলে অস্টিনের সামাজিক ব্যঙ্গ ও শ্রেণিবৈষম্যের দিকটি আড়ালে পড়ে যায়।

পোশাক ও সাজসজ্জা নিয়েও আপত্তি আছে। ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’র ট্রেলারে ১৯ বছর বয়সী এলিনর ও ১৭ বছর বয়সী মেরিয়েনকে খোলা চুলে দেখা যাওয়ার পর অস্টিনভক্তদের প্রশ্ন ছিল—‘বনেট কোথায়?’ বায়র্নের মতে, রিজেন্সি যুগে বড় মেয়েদের সাধারণত চুল বেঁধে বনেট পরার কথা ছিল।

শুধু চুল নয়, আধুনিক মেকআপ, ঝকঝকে দাঁত এবং শরীরের গড়নও অনেক সময় সেই সময়ের বাস্তবতা থেকে চরিত্রগুলোকে দূরে সরিয়ে দেয়। গাউচার কলেজের অধ্যাপক জুলিয়েট ওয়েলসের ভাষায়, আধুনিক ‘জিম-টোনড’ শরীর, দাঁতের চিকিৎসা ও ভিনিয়ার অস্টিনের যুগের মানুষের চেহারার সঙ্গে সবসময় মেলে না।

জেন অস্টিন

আরেকটি বড় সমস্যা ভাষা ও গতি। অস্টিনের লেখার অন্যতম আকর্ষণ তার ব্যঙ্গ, রসবোধ ও সূক্ষ্ম ভাষা। কিন্তু চলচ্চিত্রে দৃশ্যের ওপর জোর দিতে গিয়ে সংলাপ অনেক সময় কমে যায়। সাদারল্যান্ডের মতে, অস্টিন মূলত কথোপকথনের মধ্য দিয়েই অনেক কিছু প্রকাশ করতেন। অথচ আধুনিক সিনেমা দৃশ্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

অস্টিনের গল্পের গতি নিয়েও একই সমস্যা। তার উপন্যাসে চরিত্রের পরিবর্তন ধীরে ধীরে আসে। পাঠককে সেই পরিবর্তন লক্ষ্য করার সময় দেয়া হয়। বড় পর্দায় সেই ধীর গতি ধরে রাখা কঠিন। ফলে গল্প দ্রুত এগিয়ে যায় এবং চরিত্রের সূক্ষ্ম বিকাশের কিছু অংশ হারিয়ে যেতে পারে।

সবশেষে আছে তারকা-নির্ভর কাস্টিং। অস্টিনের চরিত্রগুলোকে অতিরিক্ত আকর্ষণীয় অভিনেতা দিয়ে ফুটিয়ে তুললে গল্পের রহস্যও কমে যায়। সাদারল্যান্ডের মতে, দর্শক শুরুতেই বুঝে যেতে পারেন কে নায়ক বা নায়িকা। ১৯৯৫ সালের ‘সেন্স অ্যান্ড সেন্সিবিলিটি’-এ হিউ গ্র্যান্ট অভিনীত এডওয়ার্ড ফেরার্স তার একটি উদাহরণ। উপন্যাসে ফেরার্সকে সরাসরি সুদর্শন বলা হয়নি, বরং উল্টো ইঙ্গিতই রয়েছে। কিন্তু পর্দায় গ্র্যান্টকে নায়ক হিসেবে দেখানোর ফলে গল্পের পরিণতি অনেক আগেই অনুমান করা যায়।

অস্টিনের উপন্যাসের চিত্রায়নে তাই মূল চ্যালেঞ্জ শুধু গল্প ঠিক রাখা নয়। তার ভাষা, ব্যঙ্গ, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং চরিত্রের ধীর পরিবর্তনও ধরে রাখা। আর সেই জায়গাতেই চলচ্চিত্র ও সিরিজ নির্মাতাদের সঙ্গে অস্টিনের গবেষক ও ভক্তদের বিতর্ক বারবার ফিরে আসে।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও