ঈদের সুন্দর স্মৃতির সঙ্গে যে কয়টি বিষয় জড়িত তার অন্যতম একটি নতুন সাবান। ঈদ উপলক্ষে নতুন জামা জুতোর পাশাপাশি নতুন সুগন্ধী সাবানেরও মোড়ক খোলা হতো। সে সাবানে গোসল সেরে নামাজ পড়তে যেত বাড়ির ছেলেরা। ঈদের সকালে নতুন সাবান দিয়ে গোসল করার রেওয়াজ গ্রামাঞ্চলে এখনও আছে। বর্তমান প্রজন্মের কাছে সে আনন্দ রূপকথা মনে হলেও বাংলাদেশে বা উপমহাদেশে সাবানের পথচলা খুব বেশি দীর্ঘ নয়।
এই কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশের নারীরা, মাটি, রিঠা, শিকাগাই ও খৈল দিয়ে চুল পরিষ্কার করতেন। কাপড় পরিষ্কারে ব্যবহৃত হতো ছাই বা কলার খোল ভেজানো ক্ষার। ঐতিহ্যগতভাবে উপমহাদেশের মানুষ গোসলের সময় শিকাকাই, বেসন, হলুদ-তুলসী বাটা, নিম বা চন্দনের প্রলেপ, পদ্মের পাপড়ি প্রভৃতি ব্যবহার করতেন। সাবান সম্পর্কিত ভারতীয় গবেষণা ‘হিস্টরি অব সোপ ইন ইন্ডিয়া’র তথ্য অনুযায়ী, আদিম যুগে মানুষ ত্বক পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যবহার করতো কাদামাটি, গাছ-গাছড়া ও ছাই। মধ্যযুগে পানি ও গাছগাছরার সমন্বয়ে গোসলের কাজ সারত মানুষ। তারা বিশ্বাস করতো, পানি একাই সবকিছু পরিষ্কার করতে পারে না।
অনার্য তাপসের ‘সাবাননামা’ প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ‘সাবান’ শব্দটি বাংলা ভাষায় আসে ইংরেজদের হাত ধরে। ইংরেজি সোপ শব্দটি এসেছে লাতিন শব্দ স্যাপো থেকে। যার অর্থ তেল বা চর্বি ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে তৈরি পরিষ্কারক। রাসায়নিকভাবে সাবান হচ্ছে ফ্যাটি অ্যাসিডের লবণ। কোনো কিছু ধোয়া বা পরিষ্কার করার কাজ ছাড়াও সাবান বস্ত্রশিল্পে পিচ্ছিলকারক পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। ১৭৯১ সালের আগ পর্যন্ত সাবান ছিল অভিজাত পরিবারে ব্যবহৃত বিলাসী পণ্য।
ইতিহাসের কোন সময়ে, কোন জনপদে প্রথম সাবান আবিষ্কৃত হয় সেটা জানা না গেলেও, প্রাচীন ব্যাবিলনে সাবান ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে। খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতকের দিকে ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনে সাবানের ব্যবহার শুরু হয় বলে জানা যায়। তবে ইউরোপের অন্যান্য অংশে সাবান প্রচলিত হয় আরও অনেক পরে—সতেরো শতাব্দীর দিকে।
ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষের সঙ্গে সাবানের পরিচয় ১৮৯৭ সালে, লিভার ব্রাদার্সের হাত ধরে। এরপর ১৯১৮ সালে ভারতে প্রথম সাবান কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। জামশেদ ভাই টাটার এ প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্র্যান্ডের সাবান বাজারজাত শুরু করে ১৯৩০ সালের প্রথম দিকে।
বাংলাদেশের প্রথম সাবান ‘কসকো’। এটি কমান্ডার সোপ কোম্পানি লিমিটেডের একটি ব্র্যান্ড। দেশভাগের পরের বছর ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এ কোম্পানি। সত্তরের দশক থেকে বাজার দখল করতে থাকে ব্র্যান্ডটি আর নব্বইয়ের দশকে পায় বিপুল জনপ্রিয়তা।
আমি কবি তুমি কবিতা
তুমি প্রথম প্রেম, প্রথম প্রেম ওগো সুস্মিতা
ত্বকের সৌন্দর্যে কসকো
তারিন-পল্লবের এ জিঙ্গেল কসকোর জনপ্রিয়তার কথা মনে করিয়ে দেয়। দেশে উৎপাদিত এ সাবানের দাপুটে বাজার ছিল দীর্ঘদিনের। ‘ক্ষয় কম; ব্যবহার করা যায় বেশি দিন’ এ ট্যাগলাইন কসকোর বাজার ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। জন্মদিন, আকিকা, বিয়ে বা ব্যক্তিগত কাজে মানুষ কসকো সাবান ব্যবহার করত। বর্তমানে জনপ্রিয়তা কমে গেলেও সাত দশক পরেও পণ্যের গুণগত মান ও মোড়কে পরিবর্তন আসেনি। সাবানের রংও আছে আগের মতো। ক্রেতার আস্থা ধরে রাখতে গন্ধেও বদল আনেনি উৎপাদক প্রতিষ্ঠান।
কসকোর কয়েক বছর পর বাজারে আসে তিব্বত সাবান। অন্য সাবানের তুলনায় সস্তা দাম ও কাপড় বেশি পরিষ্কার, উজ্জ্বল, ধবধবে করার প্রতিশ্রুতি পণ্যটিতে জনপ্রিয় করে তোলে। একই সময়ে বাজারে গোল্লা সাবানের দাপট ছিল। ভারী গোলাকৃতির সাবানটি চার টুকরো করে বিক্রি করত দোকানীরা। এরপর সাবানের বাজার কেয়া ও লাক্সের দখলে চলে যায়। ‘এক সাবানেই কাপড় কাচা সে সাবানেই গোসল’ ট্যাগলাইন কেয়া সুগন্ধী সাবানকে বেশ কয়েক বছর বাজার ধরে রাখতে সহায়তা করেছে। কাপড় কাঁচার ক্ষেত্রে সেসময় আলমের পঁচা সাবানের আধিপত্য ছিল।
সৌন্দর্যের ধারণা নিয়ে বাজারে এসেছিল কসকো। সেই ধারণা থেকে বেরিয়ে জীবাণুনাশের বার্তা নিয়ে আসে লাইফবয়, স্যাভলন ও ডেটল। তবে করোনার সময়ে বাজার পুরোপুরি দখল করে নেয় লিকুইড সাবান। পরিস্কারক ও জীবাণুনাশক হিসেবে সাবানের পরিবর্তে ব্যবহৃত হতে থাকে স্যানিটাইজার, লিকুইড বা তরল সাবান।