‘অ্যাটেনশন সিকার’ নাকি সাহায্য পাওয়ার শেষ চেষ্টা

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সামাজিক ধারণার একটি বড় অংশ এখনো এমন-কষ্টের কথা বলা মানে দুর্বলতা। বিশেষ করে আমাদের মতো সমাজে যেখানে ‘মানুষ কী বলবে’— এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপরও প্রবল প্রভাব ফেলে, সেখানে মানসিক সংকটের কথা প্রকাশ করা আরো কঠিন। ফলে মানুষ প্রথমে নিজের কষ্ট লুকায়। তারপর কিছুটা প্রকাশ করে। সেখানে উপহাস পেলে আরও চুপ হয়ে যায়। এভাবেই তৈরি হয় একটি বিপজ্জনক চক্র; কষ্ট → সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা → বিচার → লজ্জা → নীরবতা → আরো বিচ্ছিন্নতা

অ্যাটেনশন সিকার। মানুষের কষ্টকে অস্বীকার করার জন্য এর চেয়ে সহজ দুটি শব্দ হয়তো আর নেই। কেউ কাঁদছে— ‘অ্যাটেনশন সিকার’। বারবার বলছে ভালো নেই— ‘নাটক করছে’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের ভাঙাচোরা সময়ের কথা লিখছে— ‘দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে’। আসলেই কি তাই?

বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক সংকোচ এখনো বড় বাস্তবতা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-র হিসাবে দেশে প্রতিবছর ১০ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যান। বিশ্বজুড়ে সংখ্যাটি সাত লাখেরও বেশি, ১৫-২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মহত্যা। তাই এবছরের বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের মূল আহ্বান-‘স্টার্ট দ্য কনভারসেশন’। অর্থাৎ আত্মহত্যা নিয়ে শুধু নীরবতা ভাঙা নয়, বরং এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে মানুষ বিচারিত হওয়ার ভয় ছাড়াই নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে।

মনোযোগ চাওয়া কি সত্যিই অপরাধ?

মানুষ যখন শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়, তখন সে সাহায্য চায়। ব্যথা হলে বলে, ‘আমার ব্যথা করছে’। আমরা তাকে অ্যাটেনশন সিকার বলি না। কিন্তু মানসিক যন্ত্রণার ক্ষেত্রে নিয়মটা যেন আলাদা। মানুষ যখন বলে, ‘আমি আর পারছি না’, আমরা অনেক সময় তার সমস্যার সমাধান করার বদলে সমস্যাটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন করি। ‘এত কিছু তো হয়নি’, ‘তোমার তো সবই আছে’, ‘অন্য মানুষ আরো কত কষ্টে আছে’ বা ‘এসব নিয়ে এত ভাবার কী আছে?’

এই তুলনাগুলো সমস্যার সমাধান করে না। বরং একজন মানুষকে শেখায়— তার কষ্ট প্রকাশ করার অধিকার নেই। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তীব্র মানসিক সংকটকে শুধু একটি নির্দিষ্ট রোগ বা নির্দিষ্ট ঘটনার ফল হিসেবে দেখা যায় না। আত্মহত্যার ঝুঁকির সঙ্গে হতাশা, একাকীত্ব, সম্পর্কের সংকট, আর্থিক চাপ, সহিংসতা, নির্যাতন, দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক অসুস্থতা এবং আকস্মিক জীবনসংকট-বিভিন্ন বিষয় জড়িত থাকতে পারে। ডব্লিউএইচও-ও আত্মহত্যাকে একাধিক সামাজিক, মানসিক, জৈবিক ও পরিবেশগত কারণের সঙ্গে যুক্ত একটি জটিল ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করে।

‘অ্যাটেনশন’ আর ‘হেল্প’-এর মাঝখানে যে ভুলটা করি

আমরা ধরে নিই, কেউ যদি চায় অন্যরা তার কষ্ট দেখুক, তাহলে সে নিশ্চয়ই কৃত্রিমভাবে সেটি দেখাচ্ছে। এই ধারণাটিই বিপজ্জনক। অনেক সময় মানুষ সরাসরি বলতে পারে না, ‘আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি’। এর পরিবর্তে আচরণ বদলে যায়। কেউ অতিরিক্ত কথা বলে, কেউ অস্বাভাবিকভাবে চুপ হয়ে যায়, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের কষ্ট প্রকাশ করে, কেউ মানুষের কাছে বারবার ফিরে আসে। সব আচরণ আত্মহত্যার সংকেত নয়। কিন্তু কোনো কষ্টকে কেবল ‘নাটক’ বলে বাতিল করে দেয়াও নিরাপদ নয়। ডব্লিউএইচও বলছে, আত্মহত্যার চিন্তায় থাকা মানুষ অনেক সময় বেঁচে থাকা এবং মারা যাওয়ার মধ্যে দ্বিধায় থাকে; তারা প্রায়ই মৃত্যুর চেয়ে অসহনীয় মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি খুঁজছে। এমন সংকট কখনো কখনো স্বল্পস্থায়ীও হতে পারে। সেই মুহূর্তে একটি কথোপকথন, একজন মানুষের উপস্থিতি কিংবা সময়মতো পেশাদার সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

ডিজিটাল পৃথিবী আমাদের একটি অদ্ভুত বাস্তবতা দিয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, কিন্তু একইসঙ্গে আগের চেয়ে বেশি অদৃশ্যও হতে পারে। একজন মানুষের হাজার বন্ধু থাকতে পারে, অথচ রাত ৩টায় তার কথা শোনার মতো একজন মানুষ নাও থাকতে পারে। একটি পোস্টে শত শত প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, কিন্তু একটি সত্যিকারের ফোনকল নাও আসতে পারে

সবচেয়ে বড় সমস্যা: আমরা সাহায্য চাওয়াকে লজ্জায় পরিণত করেছি

মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সামাজিক ধারণার একটি বড় অংশ এখনো এমন-কষ্টের কথা বলা মানে দুর্বলতা। বিশেষ করে আমাদের মতো সমাজে যেখানে ‘মানুষ কী বলবে’— এই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপরও প্রবল প্রভাব ফেলে, সেখানে মানসিক সংকটের কথা প্রকাশ করা আরো কঠিন। ফলে মানুষ প্রথমে নিজের কষ্ট লুকায়। তারপর কিছুটা প্রকাশ করে। সেখানে উপহাস পেলে আরও চুপ হয়ে যায়। এভাবেই তৈরি হয় একটি বিপজ্জনক চক্র; কষ্ট → সাহায্য চাওয়ার চেষ্টা → বিচার → লজ্জা → নীরবতা → আরো বিচ্ছিন্নতা।

বাংলাদেশে এই সমস্যাটি আরো গুরুত্বপূর্ণ। ডব্লিউএইচও-র ২০২৬ সালের বাংলাদেশবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মানসিক সমস্যায় থাকা প্রয়োজনীয় মানুষের ৯০ শতাংশের বেশি চিকিৎসা পায় না। একইসঙ্গে আত্মহত্যা প্রতিরোধে স্কুলভিত্তিক সামাজিক-আবেগীয় দক্ষতা, আগাম শনাক্তকরণ এবং দায়িত্বশীল গণমাধ্যম কাভারেজের ওপর কাজ চলছে। অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ব্যক্তির নয়। এটি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সমাজ-সবকিছুর।

আরেকটি আয়না: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

ডিজিটাল পৃথিবী আমাদের একটি অদ্ভুত বাস্তবতা দিয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান, কিন্তু একইসঙ্গে আগের চেয়ে বেশি অদৃশ্যও হতে পারে। একজন মানুষের হাজার বন্ধু থাকতে পারে, অথচ রাত ৩টায় তার কথা শোনার মতো একজন মানুষ নাও থাকতে পারে। একটি পোস্টে শত শত প্রতিক্রিয়া আসতে পারে, কিন্তু একটি সত্যিকারের ফোনকল নাও আসতে পারে। কেউ নিজের ভেঙে পড়ার কথা লিখলে আমরা মন্তব্য করি— ‘অ্যাটেনশন চায়’। কিন্তু সেই পোস্ট লেখার আগে সে কত রাত ঘুমাতে পারেনি, কতবার ফোন হাতে নিয়ে আবার রেখে দিয়েছে, কতবার নিজের কথাগুলো মুছে নতুন করে লিখেছে, সেটি আমরা জানি না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাই কখনো কখনো মানুষের কষ্টের প্রদর্শনী নয়; বরং কথা বলার শেষ খোলা জানালাও হতে পারে।

তাহলে কী করব?

সবকিছুর উত্তর আমাদের জানার দরকার নেই। কখনো শুধু বলা দরকার— ‘আমি তোমার কথা শুনছি’। ‘তুমি কেন এমন ভাবছ’-এর বদলে বলা যায় ‘তোমার জন্য কোন ব্যাপারটা সবচেয়ে কঠিন লাগছে?’ ‘এত কিছু তো হয়নি’-এর বদলে বলা যায় ‘তোমার কাছে বিষয়টা কতটা কঠিন, সেটা আমি বুঝতে চাই’। আর যদি কেউ সরাসরি আত্মহত্যার কথা বলে বা তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে আছে বলে মনে হয়, তাকে একা না রেখে দ্রুত পরিবার, বিশ্বস্ত ব্যক্তি, মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী বা জরুরি সহায়তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কারণ আত্মহত্যা প্রতিরোধ শুধু আত্মহত্যার কথা বলার সময় শুরু হয় না। শুরু হয় তার অনেক আগেই—যখন একজন মানুষ প্রথমবার বলে, ‘আমি ভালো নেই’।

আরও