সুরক্ষা সিরিজ পর্ব- ২

কিটেনদের টিকা বা ভ্যাকসিনেশনের সঠিক নিয়ম ও ইমিউনিটি তৈরির কৌশল

সঠিক সময়ে ভ্যাকসিনই বাড়ায় বিড়ালের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা

ভ্যাকসিনেশনের সময় প্রতিষ্ঠানের নাম, ভ্যাকসিনের মেয়াদ (এক্সপায়ারি ডেট) আছে কিনা এবং ভায়ালটি আপনার সামনেই খোলা হচ্ছে কিনা, তা দেখে নিন। পাশাপাশি ভ্যাকসিন কার্ডে টিকার নাম, ব্যাচ নম্বর, টিকা দেয়ার তারিখ ও পরবর্তী ডোজের সম্ভাব্য তারিখের উল্লেখ ভ্যাকসিন কার্ডে দেয়া আছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করুন। এসব ছোট ছোট সচেতনতাই আপনার কিটেনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

গত পর্বে আলোচনা করা হয়েছিল কেন কিটেন বা বিড়াল ছানায় প্রথম স্বাস্থ্যসুরক্ষা শুরু হয় ডিওয়ার্মিং দিয়ে। কৃমিমুক্ত ও সুস্থ শরীরই ভ্যাকসিন বা টিকার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। তবে শুধু ডিওয়ার্মিং করালেই যে দায়িত্ব শেষ এমন নয়। জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সঠিক সময়ে পূর্ণাঙ্গ ভ্যাকসিনেশন সম্পন্ন করা। কারণ এই সময়েই কিটেনের শরীর নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে শুরু করে।

জন্মের পর প্রথম কয়েক সপ্তাহ কিটেন মায়ের শালদুধ থেকে অ্যান্টিবডি পায়। এই অ্যান্টিবডি তাকে বিভিন্ন সংক্রমণের বিরুদ্ধে সাময়িক সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই সুরক্ষা কমতে থাকে। আর ঠিক তখনই প্রয়োজন হয় ভ্যাকসিনের, যা শরীরকে নির্দিষ্ট ভাইরাসের বিরুদ্ধে নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

কোন টিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?

আন্তর্জাতিক ভেটেরিনারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড স্মল অ্যানিম্যাল ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউএসএভিএ) এবং আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ফেলাইন প্র্যাকটিশনার্স (এএএফপি)–এর গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি কিটেনের জন্য কিছু কোর ভ্যাকসিন বা বাধ্যতামূলক টিকা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো এফভিআরসিপি (এফভিআরসিপি), যা তিনটি প্রাণঘাতী রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়—

  • ফেলাইন প্যানলিউকোপেনিয়া (এফপিভি) বা ফেলাইন পারভোভাইরাস
  • ফেলাইন হারপিস ভাইরাস-১ (এফএইচভি-১) বা ভাইরাল রাইনোট্র্যাকিইটিস
  • ফেলাইন ক্যালিসিভাইরাস (এফসিভি)

এই তিনটি রোগই ছোট কিটেনের জন্য খুবই সংক্রামক এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী।

ভ্যাকসিন সূচি কী হবে?

ডব্লিউএসএভিএ ও এএএফপি-এর গাইডলাইন অনুযায়ী কিটেনের কোর ভ্যাকসিন সাধারণত নিচের সময়সূচি অনুযায়ী দেয়া হয়—

  • প্রথম ডোজ (কোর ভ্যাকসিন): ছানার বয়স ৬-৮ সপ্তাহ হলে প্রথম ‘ট্রাইক্যাট’ বা ‘এফভিআরসিপি’ টিকা দিতে হবে।
  • দ্বিতীয় ডোজ (প্রথম বুস্টার): প্রথম ডোজ দেয়ার ঠিক ৩-৪ সপ্তাহ পর (অর্থাৎ ৯-১২ সপ্তাহ বয়সে) দিতে হয়।
  • তৃতীয় ডোজ (দ্বিতীয় বুস্টার): ছানার বয়স ১৬ সপ্তাহ হলে অথবা শেষ টিকার ৩-৪ সপ্তাহ পর চূড়ান্ত বুস্টার দেয়া হয়, যা ছানার শরীরে দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনিটি নিশ্চিত করে।
  • র‍্যাবিস বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধক: ১৬ সপ্তাহ বয়স পেরোলে বিড়ালকে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক দিতে হয়।
  • বার্ষিক ডোজ: প্রাথমিক কোর্সের সব ডোজ শেষ হওয়ার পর প্রতি বছরে ১টি করে টিকা দিয়ে ইমিউনিটি বজায় রাখতে হয়।

এছাড়া ভ্যাকসিনেশনের সময় প্রতিষ্ঠানের নাম, ভ্যাকসিনের মেয়াদ (এক্সপায়ারি ডেট) আছে কিনা এবং ভায়ালটি আপনার সামনেই খোলা হচ্ছে কিনা, তা দেখে নিন। পাশাপাশি ভ্যাকসিন কার্ডে টিকার নাম, ব্যাচ নম্বর, টিকা দেয়ার তারিখ ও পরবর্তী ডোজের সম্ভাব্য তারিখের উল্লেখ ভ্যাকসিন কার্ডে দেয়া আছে কিনা, সেটিও নিশ্চিত করুন। এসব ছোট ছোট সচেতনতাই আপনার কিটেনের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অসুস্থ কিটেনকে কখনো টিকা নয়

টিকা দেয়ার আগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কিটেনটি সম্পূর্ণ সুস্থ কিনা।

জ্বর, ডায়রিয়া, বমি, শ্বাসকষ্ট, চোখ বা নাক দিয়ে অতিরিক্ত স্রাব, তীব্র কৃমির সংক্রমণ কিংবা মারাত্মক অপুষ্টি থাকলে আগে চিকিৎসা করতে হবে। একেবারে সুস্থ হওয়ার পরই টিকা দেয়া উচিত। কারণ অসুস্থ শরীরে ভ্যাকসিন প্রত্যাশিত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে নাও পারে।

এ কারণে অনেক ভেটেরিনারিয়ান টিকা দেয়ার এক থেকে দুই সপ্তাহ আগে ডিওয়ার্মিং সম্পন্ন করার পরামর্শ দেন, যাতে কিটেন সর্বোচ্চ উপকার পায়।

টিকা দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়

অনেকেই মনে করেন টিকা দেয়ার পর আর কোনো ঝুঁকি নেই। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।

মনে রাখা জরুরি, ভ্যাকসিন দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বিড়ালের শরীরে তাৎক্ষণিক সুরক্ষা তৈরি হয়ে যায় এমন না। শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়ে এই ভ্যাকসিন পুরোপুরি কার্যকর বা সক্রিয় হতে সাধারণত ১৪ দিনের মতো সময় লাগে। তাই এ সময়টাতেও ওদের সতর্কতার সঙ্গে রাখতে হবে।

ভ্যাকসিন রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দেয়, কিন্তু অপুষ্টি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ বা অসুস্থ প্রাণীর সংস্পর্শে থাকলে কিটেন নানা সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। তাই টিকার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ভ্যাকসিন কোনো বুলেটপ্রুফ কভার নয়। টিকা নেয়া বিড়ালের শরীর যদি কখনো ক্যালিসিভাইরাস বা রাইনোট্র্যাকিইটিসের (বিড়ালের ফ্লু) সংস্পর্শে আসে, তবে আক্রান্ত হলেও রোগের উপসর্গগুলো খুব মৃদু থাকে। যেমন— একটি আন-ভ্যাকসিনেটেড বিড়ালের ক্ষেত্রে যেখানে ফ্লু থেকে নিউমোনিয়া বা মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে, সেখানে ভ্যাকসিনেটেড বিড়াল হালকা হাঁচি-কাশি বা একটু কম খাওয়া-দাওয়ার পরেই অল্প চিকিৎসায় দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। বিষয়টি অনেকটা আমাদের মানুষের মতোই। মানুষ যেমন ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা নেয়ার পরও হালকা ঠাণ্ডা-কাশিতে ভোগে, বিড়ালের ক্ষেত্রেও এটা একই ভাবে কাজ করে।

পরের পর্বে যা থাকছে

সময়মতো ডিওয়ার্মিং ও ভ্যাকসিন অনেক প্রাণঘাতী রোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরও কোন রোগগুলো কিটেনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি? কীভাবে বুঝবেন আপনার কিটেন অসুস্থ? কোন লক্ষণ দেখলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে নিতে হবে?

এসব নিয়েই থাকছে ‘কিটেনদের লালন-পালন ও স্বাস্থ্যসুরক্ষা’ সিরিজের তৃতীয় ও শেষ পর্ব—মারাত্মক রোগ, সতর্ক সংকেত ও প্রতিরোধের উপায়।

আরও