শুধু লেবুর রসে গাঢ় হয় মেহেদীর রঙ?

মেহেদি লাগানোর পরই যে রং গাঢ় হয়ে উঠবে, এমনটা নয়। বরং এর আসল রং ফুটে ওঠে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এই সময়টুকুতে মেহেদি ধীরে ধীরে অক্সিডাইজ হয়।

ঈদের আগের রাতে চাঁদ দেখার সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ঘরে এক ধরনের উৎসবমুখর ব্যস্ততা ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়টাতে উৎসবের আনন্দ দ্বিগুণ করে তোলে হাত ভর্তি মেহেদির নকশায়। কিন্তু মেহেদি শুধু নকশা নয়, শুধু সাজ নয়, এটা এক ধরনের অপেক্ষা, এক ধরনের রসায়ন, যেখানে সময় আর যত্ন মিলে তৈরি করে সেই কাঙ্ক্ষিত গভীর রং।

মেহেদির রং গাঢ় করা নিয়ে নানা ধরনের মতামত প্রচলিত আছে। মূলত এর পেছনে কাজ করে একদম নির্ভুল একটি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। মেহেদির পাতায় থাকা ‘লসোন’ নামের একটি প্রাকৃতিক রঞ্জক ত্বকের কেরাটিনের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই বন্ধন যত বেশি দৃঢ় হয়, আর যত ভালোভাবে তা অক্সিডাইজ হয়, ততই রং হয়ে ওঠে গাঢ়, কমলা থেকে লালচে, তারপর ধীরে ধীরে গভীর বাদামি বা প্রায় কালচে।

দীর্ঘ সময় ধরে মেহেদি হাতে রাখুন-

এই রংয়ের গভীরতা নির্ভর করে মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর-সময়, উষ্ণতা এবং আর্দ্রতা। মেহেদি লাগানোর পরই যে রং গাঢ় হয়ে উঠবে, এমনটা নয়। বরং এর আসল রং ফুটে ওঠে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে। এই সময়টুকুতে মেহেদি ধীরে ধীরে অক্সিডাইজ হয়। তাই যতো বেশি সময় মেহেদি হাতে রাখা যায়, ততই রং গভীর হয়। অনেকেই ২–৩ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলেন, ফলে রং হালকা থেকে যায়। অথচ ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা মেহেদি হাতে রাখলে রং একেবারে ভিন্ন মাত্রা পায়।

তাপমাত্রা তৈরী করে রঙের তারতম্য-

উষ্ণতাও এখানে একটি বড় ভূমিকা রাখে। ঠান্ডা হাতে মেহেদি যতই রাখা হোক, রং ততটা গাঢ় হবে না। শরীরের স্বাভাবিক উষ্ণতা, কিংবা হালকা তাপ, যেমন লবঙ্গের ধোঁয়া, মেহেদির রংকে গাঢ় করে তোলে। কারণ তাপ লসোনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দেয়, ফলে তা ত্বকের সঙ্গে আরও ভালোভাবে যুক্ত হতে পারে।

শুকিয়ে গেলে মিইয়ে যাবে রঙ-

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আর্দ্রতা ধরে রাখা। মেহেদি যদি খুব দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে ফেটে যায়, তাহলে রং ঠিকমতো বসতে পারে না। এ কারণেই লেবু ও চিনি মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়, এটি মেহেদিকে আঠালো ও সামান্য ভেজা রাখে, যাতে তা দীর্ঘসময় ত্বকের সঙ্গে লেগে থাকতে পারে। এই ছোট্ট কৌশলটিই অনেক সময় রংয়ের গভীরতায় বড় পার্থক্য তৈরি করে।

মেহেদি তুলে ফেলার পরও যত্ন নিন-

মেহেদি তুলে ফেলার পরও যত্ন শেষ হয়ে যায় না। বরং তখনই শুরু হয় রং গাঢ় হওয়ার আসল সময়। এই সময়টাতে পানি এড়িয়ে চলা অত্যন্ত জরুরি। পানি রংয়ের অক্সিডেশন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই হাত ধোয়ার বদলে তেল ব্যবহার করা, যেমন নারকেল তেল বা সরিষার তেল, রংকে সুরক্ষিত রাখে এবং আরও গভীর হতে সাহায্য করে।

কোন প্রসাধনী নয়-

অনেকে মেহেদি লাগানোর আগে বা পরে নানা প্রসাধনী ব্যবহার করেন, যা অনেক সময় উল্টো ফল দেয়। ত্বকে আগে থেকে লোশন বা ক্রিম থাকলে মেহেদি ঠিকমতো বসতে পারে না। আবার নিম্নমানের বা রাসায়নিকযুক্ত মেহেদি ব্যবহার করলে রং কখনোই কাঙ্ক্ষিত হয় না। তাই ভালো মানের, টাটকা মেহেদি ব্যবহার করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদের এ আনন্দঘন সময়ে, মেহেদির রং তাই শুধু হাত রাঙায় না, এটা হয়ে ওঠে উৎসবের আনন্দময় অনুভূতির প্রকাশ। রাতভর অপেক্ষার পর সকালে যখন সেই গাঢ় রং ফুটে ওঠে, তখন মনে হয়, এ ছোট্ট রসায়নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ঈদের এক টুকরো জাদু। তবে আজকাল বাজারে মেহেদী পাতা ব্যবহার না করে কেমিক্যাল দিয়ে তৈরী মেহেদী অনেকে বিক্রি করেছে। সেগুলো ব্যবহারের ফলে এ্যলার্জি কিংবা ত্বকে নানা ধরণের ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। তাই প্রাকৃতিক মেহেদি চেনা এবং ব্যবহার করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

আরও