ঈদের সকালে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে এক চিরায়ত ছবি দেখা যায়। কোথাও কড়াইভর্তি লালচে তেল ওঠা ঝাল ভুনা, কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা কষিয়ে কালচে হয়ে যাওয়া কালা ভুনা। একদল বলে, ‘এটাই আসল স্বাদ।’ আরেক দল মনে করে, ‘ভুনা মানেই কালা ভুনা।’ কিন্তু এই দুই নামের পেছনে শুধু স্বাদের পার্থক্য নয়, আছে ইতিহাস, অঞ্চল, বন্দরনগরীর মসলার বৈচিত্র্য আর বাঙালির ঈদের আবেগও।
দক্ষিণ এশীয় রান্না সংস্কৃতিতে ‘ভুনা’ শব্দটির শিকড় বহু পুরোনো। মূলত ধীরে ধীরে মসলা কষিয়ে, মাংসকে কম পানিতে দীর্ঘসময় রান্না করে ঘন ও তীব্র স্বাদ তৈরি করার যে পদ্ধতি, সেটিই ভুনা। মুঘল রান্না, পারস্যঘেঁষা মসলার ব্যবহার আর বাংলার নিজস্ব রান্নার ধারা মিলেমিশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই ‘ভুনা’ কৌশলকে গড়ে তুলেছে। ভুনা রান্নার এক বিশেষ দর্শন। ধীরে, ধৈর্য নিয়ে, আগুনের সঙ্গে লড়াই করে স্বাদ বের করে আনার শিল্প।
এই ভুনা থেকেই পরে জন্ম নেয় ‘কালা ভুনা’। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের এই রান্না সেখানকার মানুষের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। নামের মধ্যেই তার পরিচয়, দীর্ঘসময় কষাতে কষাতে পেঁয়াজ গাঢ় বাদামি হয়ে যায়, মসলাগুলো তেল ছেড়ে আরো গাঢ় হয়, আর মাংসের রঙ ধীরে ধীরে কালচে-বাদামি রূপ নেয়। সেই থেকেই নাম ‘কালা ভুনা’।
তবে কালা ভুনার ইতিহাস শুধু রান্নাঘরের না, চট্টগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে। শত শত বছর ধরে চট্টগ্রাম ছিল বন্দরনগরী। আরব বণিক, পারস্যের ব্যবসায়ী, মুঘল প্রভাব, সমুদ্রপথের মসলা বাণিজ্য-সবকিছুর মিলনস্থল। এই অঞ্চলের খাবারও তাই হয়ে ওঠে বেশি মসলাদার, ধীরে রান্না করা এবং মাংসভিত্তিক। কালা ভুনার ভেতর সেই বন্দরনগরীর গন্ধ আজও টিকে আছে।
চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবান। ছবি: সংগৃহীত
চট্টগ্রামের ‘মেজবান’ সংস্কৃতি কালা ভুনাকে আরো কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে। মেজবান মানে শুধু খাওয়াদাওয়া নয়; এটি এক ধরনের সামাজিক আয়োজন, যেখানে শত শত মানুষকে একসঙ্গে খাওয়ানো হয়। বিশাল ডেকচিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রান্না হওয়া গরুর মাংস, ধোঁয়া, মসলা আর মানুষের ভিড়, এই পুরো সংস্কৃতির কেন্দ্রে ছিল কালা ভুনা। অনেকের কাছে এটি কেবল খাবার নয়, আতিথেয়তার প্রতীক।
অন্যদিকে ‘লাল ভুনা’র গল্প ভিন্ন। কালা ভুনার মতো এটি নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলের ঐতিহাসিক স্বাক্ষর নয়। বরং এটি বাংলাদেশের বহু ঘরের পরিচিত এক রান্নার ধরন। তেল আর মরিচের লালচে রঙ, ঝাল-মসলার ঘন স্বাদ, আর গরম গরম ভাত, এই আবেগ থেকেই ‘লাল ভুনা’ নামটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর রঙ আসে মূলত শুকনো মরিচ, মরিচের গুঁড়া, হলুদ আর ওপরে ভেসে ওঠা লালচে তেল থেকে। কালা ভুনার মতো অতটা গভীর ক্যারামেলাইজেশন এখানে হয় না। বরং এটি বেশি উজ্জ্বল, ঝাল এবং ঘরোয়া।
তাই ঈদের টেবিলে ‘লাল ভুনা নাকি কালা ভুনা’, এই বিতর্ক আসলে স্বাদের চেয়ে বড় কিছু। এটি বাংলাদেশের ভেতরের ছোট ছোট সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গল্প। চট্টগ্রামের মানুষ কালা ভুনা নিয়ে গর্ব করে, যেমন ঢাকার বা গ্রামের অসংখ্য পরিবার তাদের নিজস্ব লাল ভুনার রেসিপিকে মনে করে ‘ঈদের আসল স্বাদ’।
কালা ভুনা আমাদের ইতিহাসের স্বাদ মনে করিয়ে দেয়, আর লাল ভুনা মনে করিয়ে দেয় বাড়ির রান্নাঘর, ঈদের দুপুর আর পরিবারের ভিড়। একটিতে আছে বন্দরনগরীর শত বছরের মসলার স্মৃতি, আরেকটিতে আছে বাঙালির ঘরের উষ্ণতা।