খাবার মেন্যুর জন্মের আগে ও পরে-রেস্টুরেন্টের আবিষ্কার

১৭৮৯ সালের বসন্তে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে সেই উত্তেজনা বিস্ফোরিত হয়। নাট্যকার লুই-সেবাস্তিয়াঁ মের্সিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, 'রান্নাঘরের বেদি গিলোটিনের পাশেই স্থাপিত ছিল।'

রোজ যেখানে পুষ্টিকে গণমানুষের নাগালে এনেছিলেন, বোভিলিয়ে সেখানে ব্যক্তিগত আভিজাত্যকে জনপরিসরে নিয়ে এলেন। পালিশ করা মেহগনি টেবিল, সমৃদ্ধ আসবাব, ঝাড়বাতির সোনালি আলো, সব মিলিয়ে এটি ছিল এক মঞ্চসজ্জা।

ঢাকা শহরের অলিগলিতে হাঁটলে মনে হয়, রেস্টুরেন্টের ভারে নুয়ে পড়েছে ভবনগুলো। বহু পদে সাজানো ভোজ, মুদ্রিত মেন্যু হাতে নিয়ে পছন্দের খাবার বেছে নেয়া, সবকিছুর শুরুটা কিভাবে হয়েছিল এ প্রশ্ন মনে আসতেই পারে। রেস্টুরেন্টের এই ধারণা আদৌ প্রাচীন নয়। আধুনিক অর্থে ‘রেস্টুরেন্ট’, যেখানে আপনি নিজের মতো করে খাবার বেছে নেবেন, নির্দিষ্ট দামে অর্ডার করবেন, ব্যক্তিগত টেবিলে বসে উপভোগ করবেন, তার জন্ম ১৮শ শতকের শেষভাগে, প্যারিসে। আর সেই জন্মের পেছনে ছিল সামাজিক পরিবর্তন, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোড়ন এবং রাজনৈতিক বিপ্লবের এক জটিল সমাবেশ।

রেস্টুরেন্টের আগে প্যারিসের খাদ্য-বাস্তবতা

১৮শ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্যারিসে বাইরে খাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল নিরানন্দ। ১৭২৭ সালে প্রকাশিত ভ্রমণপুস্তক সে-জুর দ্য পারি’-তে জার্মান পণ্ডিত জোয়াকিম ক্রিস্টোফ নিমেইৎজ লিখেছিলেন, ‘ধনী ও সম্ভ্রান্তরা নিজ নিজ গৃহে ব্যক্তিগত রাঁধুনির হাতে চমৎকার ভোজ উপভোগ করেন। কিন্তু সাধারণ ভ্রমণকারীর কপালে জোটে একঘেয়ে, অনেক সময় সঠিকভাবে রান্না না করা খাবার।‘

তখনকার সাধারণ মানুষের খাদ্যস্থলগুলোর চরিত্র ছিল ভিন্ন। সরাইখানাগুলোয় মানুষ ও ঘোড়া একসঙ্গে খেত। ‘ট্যাভার্ন’ নামক দোকানগুলো ছিল মূলত পানীয়কেন্দ্রিক। ক্যাফেগুলোয় মিলত বরফ ও লিকার, পূর্ণাঙ্গ আহার নয়। হোটেলে পাওয়া যেত কেবল মৌলিক খাবার।

সবচেয়ে বড় অভাব ছিল, পছন্দের স্বাধীনতা। মেন্যু ছিল না, নির্দিষ্ট সময়ে সবার জন্য একই খাবার, প্রায়ই কমিউনাল টেবিলে বসে। আলাদা টেবিলে বসে, তালিকা দেখে নিজের খাবার নির্বাচন, এই ধারণাটিই তখনো জন্মায়নি।

এক বাটি স্যুপ থেকে সূচনা

পরিবর্তনের সূচনা ১৭৬৫ সালে। ল্যুভরের কাছাকাছি র‍্যু দে পুলি সড়কে ফরাসি উদ্যোক্তা মথুরাঁ রোজ দ্য শঁতোয়াজো একটি পরিত্যাক্ত বেকারির ভেতর ছোট ছোট মার্বেল টেবিলে পরিবেশন শুরু করেন পুষ্টিকর স্যুপ, পোলট্রি ও তাজা ডিম দিয়ে তৈরি হালকা ঝোল।

তখন 'রেস্তোরাঁ' শব্দটির অর্থ ছিল এমন খাদ্য যা শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করে। ১৮শ শতকের ফরাসি অভিধানেও এর সংজ্ঞা ছিল 'শক্তি ফিরিয়ে আনে এমন খাদ্য'। ধীরে ধীরে শব্দটি খাদ্যের বদলে স্থানকে বোঝাতে শুরু করে, আর ১৮৩৫ নাগাদ তার আধুনিক অর্থ প্রতিষ্ঠিত হয়।

রোজের সেই রেস্তোরাঁয় নির্দিষ্ট দামে, নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পাওয়া যেত। পৃথক টেবিল, মুদ্রিত দামের তালিকা, থালা-বাসন ও টেবিল ক্লথের ব্যবহার, সবই ছিল নতুন। তার দরজায় ঝুলত একটি বাক্য: 'যাদের পেট ব্যথা করছে, আমার কাছে এসো, আমি তোমাদের আরোগ্য দেব'। বাইবেলের একটি পংক্তির রসিক রূপান্তর।

১৭৬৭ সালের সেপ্টেম্বরে দার্শনিক ডেনি দিদরো সেখানে প্রথম আহার করেন। তিনি মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, 'এটি বিস্ময়কর… সবাই এর প্রশংসা করছে।' তবে এই সূচনা ছিল কেবল প্রথম ধাপ।

পালে-রোয়াল: আভিজাত্যের জনসমাগম

প্রকৃত বিস্তার ঘটে প্রায় দুই দশক পরে, প্যারিসের প্রাণকেন্দ্র পালে-রোয়াল এলাকায়। একসময় এটি ছিল রাজকীয় আবাস। পরে তা রূপ নেয় এক আধা-আবদ্ধ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে, উদ্যান, থিয়েটার, বইয়ের দোকান, জুয়ার আসর, ক্যাফে; যেখানে অভিজাত ও মধ্যবিত্ত একত্রে মিশত।

১৭৮৬ সালে কাউন্ট অব প্রোভঁসের সাবেক রাঁধুনি অঁতোয়ান বোভিলিয়ে সেখানে খুললেন লা গ্রঁদ তাভের্ন দ্য লঁদ্রে। ইতিহাসবিদদের মতে, এটিই প্রথম পূর্ণাঙ্গ আধুনিক রেস্টুরেন্ট।

রোজ যেখানে পুষ্টিকে গণমানুষের নাগালে এনেছিলেন, বোভিলিয়ে সেখানে ব্যক্তিগত আভিজাত্যকে জনপরিসরে নিয়ে এলেন। পালিশ করা মেহগনি টেবিল, সমৃদ্ধ আসবাব, ঝাড়বাতির সোনালি আলো, সব মিলিয়ে এটি ছিল এক মঞ্চসজ্জা।

১৭৯৮ সালে এক ইংরেজ ভ্রমণকারী তার মেন্যুতে ১৭৮টি পদ গণনা করেছিলেন। ১০ প্রকার স্যুপ, ১২টি স্টার্টার, ১০টি মাংসের পদ, ৩৬টি ডেজার্টসহ অসংখ্য বিকল্প। আহার এখানে এক সামাজিক আচার, এক অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে।

বিপ্লবের ছায়ায় রন্ধন

এই আভিজাত্যের আড়ালে জমছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা। পালে-রোয়াল ছিল একই সঙ্গে ভোগের ও বিদ্রোহের কেন্দ্র। গসিপ, স্বাধীনতা ও সমতার ধারণা এখানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল।

১৭৮৯ সালের বসন্তে ফরাসি বিপ্লব শুরু হলে সেই উত্তেজনা বিস্ফোরিত হয়। নাট্যকার লুই-সেবাস্তিয়াঁ মের্সিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, 'রান্নাঘরের বেদি গিলোটিনের পাশেই স্থাপিত ছিল।'

বিপ্লব রেস্টুরেন্টকে ত্বরান্বিত করে। অভিজাত পরিবারগুলো নির্বাসনে গেলে তাদের রাঁধুনিরা কর্মহীন হয়ে পড়েন। অনেকেই নিজস্ব রেস্টুরেন্ট খুলে বসেন, ব্যক্তিগত প্রাসাদের হট কুইজিন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেন। একই সময়ে সংবিধান প্রণয়নের জন্য প্রাদেশিক প্রতিনিধিরা প্যারিসে আসেন, তাদের প্রয়োজন ছিল শান্ত, নিয়ন্ত্রিত আলোচনাস্থল। রেস্টুরেন্ট সেই প্রয়োজন পূরণ করে।

বিস্তার গণতন্ত্রীকরণ

১৭৮৯ সালে প্যারিসে প্রায় ৫০টি রেস্টুরেন্ট তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ১৮০৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০০টিতে। ১৮২৫ সালে প্রায় এক হাজার, আর ১৮৩৪ সালে দুই হাজারেরও অধিক।

মেও, ভেরি, এবং লে ত্রোয়া ফ্রের প্রোভঁসো–এর মতো প্রতিষ্ঠান মধ্যবিত্তদের জন্য আভিজাত্যের স্বাদ এনে দেয়। রেস্টুরেন্ট তখন আর শুধু বিলাসিতা নয়, তা নিম্নবিত্তের নাগালেও পৌঁছাতে শুরু করে।

সীমান্ত পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চে

ফ্রান্সে প্রতিযোগিতা তীব্র হলে অনেক শেফ বিদেশমুখী হন। ইউরোপের অন্যান্য শহরে গড়ে ওঠে ফরাসি ধাঁচের রেস্টুরেন্ট। ১৮৩৭ সালে নিউ ইয়র্কে ডেলমনিকোস প্রতিষ্ঠা হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রেস্টুরেন্ট হিসেবে স্বীকৃত।

রেস্টুরেন্টের জন্ম কেবল রন্ধনপ্রণালীর বিবর্তন নয়। এটি আলোকায়ন যুগের সমতা ও যুক্তিবাদের ধারণা থেকে পুষ্টি পেয়েছে; অভিজাত রুচির পরিশীলনকে জনপরিসরে এনেছে, এবং রাজনৈতিক বিপ্লবের অভিঘাতে দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।

আরও