শিল্প জগতের ইতিহাসে বিড়াল নিয়ে আঁকা সবচেয়ে আলোচিত চিত্রকর্মগুলোর একটি “মাই ওয়াইফ’স লাভার্স”। ১৮৯১ সালে ছবিটি আঁকেন অস্ট্রিয়ান শিল্পী কার্ল কাহলার। ক্যানভাসে রয়েছে ৪২টি অ্যাঙ্গরা ও পার্সিয়ান জাতের বিড়াল। কাজটির পেছনের গল্পও কম চমকপ্রদ নয়। চিত্রকর্মটি আঁকতে বিড়ালের সঙ্গে তিন বছর কাটান কাহলার।
মাই ওয়াইফ’স লাভার্সের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর কোটিপতি কেট বার্ডসল জনসন। বিড়ালের প্রতি এ নারীর ভালোবাসা ছিল প্রবল। নিজের পছন্দের বিড়ালগুলোর স্মৃতি ধরে রাখতেই তিনি কাহলারকে ছবিটি আঁকার দায়িত্ব দেন। যদিও জনসনের কতগুলো বিড়াল ছিল, তা নিয়ে মতভেদ আছে। কেউ বলেন, তিনি তিন শতাধিক বিড়াল পালতেন। আবার কারো মতে, এ সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫০টি। তবে চিত্রকর্মটির এ নামকরণের পেছেনের কারণ এখনো অজানাই রয়ে গেছে।
জনসনের ছিল বিশাল এক প্রাসাদ। নাম বুয়েনা ভিস্তা ক্যাসল। গোল্ডেন গেটের উত্তরে তখন এটিকে সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত সম্পত্তি বলা হতো। ৪০ কক্ষের ভিক্টোরিয়ান বাড়িটিতে বিড়ালদের জন্য ছিল একটি পুরো তলা। তাদের দেখাশোনার জন্য ছিল আলাদা কর্মী। বিড়ালের পাশাপাশি জনসনের সংগ্রহে ছিল কুকুর, ঘোড়া ও গবাদিপশু। ছিল কাকাতুয়া, টিয়া ও ক্যানারির মতো নানা পাখিও।
বিশাল এ প্রাণীসম্ভারের মধ্যেই তিন বছর কাটান শিল্পী কাহলার। তখন পর্যন্ত তিনি মূলত ঘোড়দৌড়ের ছবি আঁকার জন্য পরিচিত ছিলেন। অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেয়া এ শিল্পী কাজ করেছেন অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে। প্রকৃতির ছবি আঁকার উদ্দেশ্যে সান ফ্রান্সিসকো হয়ে ইয়োসেমাইট যাওয়ার পথে জনসনের সঙ্গে তার পরিচয়। এরপরই কাহলারের জীবনের মোড় ঘুরে যায়।
কাহলার আগে কখনো বিড়ালের ছবি আঁকেননি। তাই জনসনের প্রাসাদে থেকে তিনি বিড়ালগুলোর স্বভাব ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন। একে একে তাদের স্কেচ করেন। তিন বছর পর তৈরি হয় বিশাল ক্যানভাসের সেই ছবি।
ছবিটির উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট। প্রস্থ সাড়ে ৮ ফুট। ওজন ২০০ পাউন্ডের বেশি। এতে ৪২টি বিড়ালকে সিঁড়িতে বিছানো মসৃণ সিল্ক কাপড়ের ওপর বিভিন্ন ভঙ্গিতে দেখানো হয়েছে। কেউ বিশ্রাম নিচ্ছে। কেউ খেলছে। কেউ আবার একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ছবির নিচের বাঁ দিকে কয়েকটি বিড়ালকে একটি মথের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়।
ছবির কেন্দ্রে রয়েছে ‘সুলতান’ নামের একটি বড় বিড়াল। সবুজ চোখের বিড়ালটির সাদা লোমে দেখা যায় বাদামি ও হলুদ দাগ। জনসন প্যারিস সফরের সময় প্রায় ৩ হাজার ডলারে সুলতানকে কিনেছিলেন বলে জানা যায়। এর পাশে রয়েছে নীল চোখের সাদা অ্যাঙ্গোরা বিড়াল ‘হিজ হাইনেস’।
কাহলার ছবিটির জন্য প্রায় ৫ হাজার ডলার পারিশ্রমিক পেয়েছিলেন। বর্তমান মূল্যে যা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ডলারের সমান।
অনেক বছর পার করে ২০১৬ সালে ছবিটি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। এক দশক আগে সদবি’স নিলামে ৮ লাখ ২৬ হাজার ডলারে বিক্রি হয় চিত্রকর্মটি। নিলামের আগে সর্বোচ্চ দাম ধরা হয়েছিল ৩ লাখ ডলার।
বর্তমানে ছবিটি উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় রয়েছে। নিলামে প্রতিযোগিতা করে ছবিটি কিনে নেন জন ও হিদার মোজার্ট। তাদের সংগ্রহে মাজোলিকা, পর্তুগিজ ঔপনিবেশিক আসবাব থেকে শুরু করে এলভিস প্রিসলির স্মারকও রয়েছে।
শত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ছবিটির জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে এটি ছড়িয়ে পড়েছে। ‘#meowsterpiece’-এর মতো হ্যাশট্যাগে আলোচনা চলছে ছবিটি নিয়ে।
আর্টনেট অবলম্বনে