১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পুয়ের্তো রিকোতে হঠাৎ এক অদ্ভুত অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাম থেকে গ্রামে গুজব ছড়ায়—রাতের গা-ছমছমে অন্ধকারে অচেনা এক ছায়া ঘুরে বেড়ায়, খামারের ছাগল-ভেড়া রহস্যজনক ক্ষতচিহ্নসহ মৃত পড়ে থাকে, তার উপস্থিতিকে না দেখেও তার ভয়ানক অস্তিত্ব টের পায় মানুষ। এইভাবেই বিশ্ব পরিচিত হয় এক নতুন দানবের সঙ্গে। এর নাম চুপাকাব্রা, 'গোট-সাকার' বা ছাগলখেকো নামে কুখ্যাত সেই কথিত প্রাণী, রক্তই যার একমাত্র মেটানোর হাতিয়ার।
চারদিকে আগুনের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এ কিংবদন্তি। পুয়ের্তো রিকো থেকে মেক্সিকো, আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, এমনকি চীন, সবখানে ছড়িয়ে পড়ে এক রহস্যময় আতঙ্ক। স্থানীয়দের দাবি, এটি কুকুর বা নেকড়ে সদৃশ কোনো জন্তু, যা গৃহপালিত পশুর রক্ত চুষে খায়। কিন্তু বিজ্ঞানীরা পরে আবিষ্কার করেন, এ রহস্যের চাবিকাঠি আসলে লুকিয়ে আছে বিজ্ঞানের ভেতরেই।
১৯৯৫ থেকে ২০২৩ সাল, পুরো সময়জুড়ে যেসব 'চুপাকাব্রা' ধরা পড়েছে বা দেখা গেছে, পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষায় প্রায় সবক্ষেত্রেই বেরিয়ে আসে, তারা আসলে ম্যাঞ্জে আক্রান্ত নেকড়েবিশেষ প্রাণী। ম্যাঞ্জ রোগটি ছড়ায় সার্কপটিস স্ক্যাবিআই নামের এক অতি সূক্ষ্ম কিন্তু মারাত্মক পরজীবীর কারণে। এতে কুকুরজাতীয় প্রাণীর লোম ঝরে যায়, চামড়া শক্ত হয় এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের এনটোমোলজিস্ট ব্যারি ও’কনর বহু বছর ধরে এ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মন্তব্য, চুপাকাব্রা নিয়ে আর কোনো রহস্যের জায়গা নেই। এ ম্যাঞ্জই পুরো ঘটনা ব্যাখ্যা করে।
মানুষের শরীরে এ পরজীবী কেবল স্কেবিস বা চুলকানি সৃষ্টি করে, কিন্তু কোয়োট বা শেয়ালের শরীর এর বিরুদ্ধে প্রায় লড়াই করতে পারে না। ফলে তাদের শরীরে রোগটি ভয়ংকর রূপ নেয়।
ও’কনরের ধারণা, এ পরজীবীর উৎস মানুষই। মানুষ থেকে কুকুরে, আর সেখান থেকে বুনো প্রাণীতে ছড়িয়েছে। মানুষের শরীর প্রজন্ম ধরে এ পরজীবীর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিলেও বন্য প্রজাতিগুলো সে ক্ষমতা অর্জন করেনি। আর এ দুর্বল, লোমহীন, কঙ্কালসার প্রাণীদেরই অনেকেই চুপাকাব্রা হিসেবে শনাক্ত করেছেন। অসুস্থতার কারণে শিকার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বন্য প্রাণীর পরিবর্তে তারা বেছে নেয় গৃহপালিত পশুদের। কারণ তাদের ধরা অনেকটাই সহজ। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় 'রক্তচোষা দানবে'র গল্প। লোককাহিনীতে প্রচলিত আছে, চুপাকাব্রা নাকি শিকারের দেহ থেকে শেষ রক্তবিন্দুও শুষে নেয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সম্পূর্ণ অতিরঞ্জিত কল্পকাহিনী; বাস্তবে এর কোনো প্রমাণ নেই।
তবে চুপাকাব্রাকে ঘিরে রহস্য সেখানেই থেমে নেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিপ্টোজুলজি মিউজিয়ামের পরিচালক লরেন কোলম্যান বলেন, ১৯৯৫ সালের পুয়ের্তো রিকোর যে প্রাণীর বর্ণনা পাওয়া গিয়েছিল, তার আকৃতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামবাসীদের বর্ণনায় দানবটি ছিল দুই পায়ে দাঁড়ানো, তিন ফুট লম্বা, ধূসর লোমে ঢাকা এবং পিঠজুড়ে ধারালো কাঁটায় ভরা, একেবারে এলিয়েন সদৃশ একটি অবয়ব।
কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যে সংবাদমাধ্যম ও জনমনে সেই বর্ণনা বদলে যেতে থাকে। ধীরে ধীরে চুপাকাব্রাকে বর্ণনা করা হয় চার পায়ে হাঁটা কুকুর-সদৃশ প্রাণী হিসেবে। কোলম্যানের মতে, এটি বড় ভুল; প্রথম বর্ণনার সেই ভয়ঙ্কর, অদ্ভুত প্রাণী প্রায় হারিয়েই গেছে—তার জায়গা দখল করেছে ম্যাঞ্জে আক্রান্ত কুকুর।
চুপাকাব্রা মিথের পেছনে সাংস্কৃতিক প্রভাবও কম নয়। ১৯৯৫ সালে পুয়ের্তো রিকোতে মুক্তি পায় 'স্পিসিস' (Species) নামে একটি এলিয়েন-হরর চলচ্চিত্র। বলা হয়ে থাকে, সিনেমার চরিত্র “সিল”-এর পিঠের লম্বা কাঁটা প্রথম চুপাকাব্রার বর্ণনার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মিলে যায়। মানুষের ভয়, সিনেমা ও লোককথা একত্র হয়ে বাস্তবেও জন্ম দিয়েছে এক কাল্পনিক দানবের রূপ।
বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন নমুনা, ডিএনএ পরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে সিদ্ধান্তে এসেছেন, চুপাকাব্রা বলে যাকে ধরা হয়েছে, তারা আসলে ম্যাঞ্জে আক্রান্ত নেকড়েবিশেষ প্রাণী। কিন্তু ক্রিপ্টোজুলজিস্টরা এখনো বলেন, পুরনো বর্ণনা, স্থানীয় মানুষের আতঙ্ক ও সাংস্কৃতিক প্রভাব মিলিয়ে এ রহস্য এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।