অনুরাগ ও বিনিয়োগ

চীনা তরুণদের স্বর্ণের গয়নার প্রতি ঝোঁক বাড়ছে

চীনে প্রিয় চরিত্র বা সিরিজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে ভক্তদের পণ্য কেনার সংস্কৃতি দ্রুত বেড়েছে। ‘তংবাও’ নামে পরিচিত থিমভিত্তিক পণ্যভর্তি ব্যাগের জনপ্রিয়তার পর এখন এসেছে ‘তংজিন’ বা ‘ক্রিঞ্জি গোল্ড’ অর্থাৎ ভক্তদের জন্য তৈরি থিমভিত্তিক স্বর্ণের গয়না

অনিশ্চিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে স্বর্ণের দাম এখন আকাশছোঁয়া। শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই নয়, সাধারণ ভোক্তারাও এ মূল্যবান ধাতু কিনে জমাচ্ছেন। চীনে প্রবণতা অনুরাগ ও বিনিয়োগ দুই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাড়ছে। বিশেষ করে দেশটির তরুণদের স্বর্ণের গয়নার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। খবর নিক্কেই এশিয়া।

চীনে প্রিয় চরিত্র বা সিরিজের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে ভক্তদের পণ্য কেনার সংস্কৃতি দ্রুত বেড়েছে। ‘তংবাও’ নামে পরিচিত থিমভিত্তিক পণ্যভর্তি ব্যাগের জনপ্রিয়তার পর এখন এসেছে ‘তংজিন’ বা ‘ক্রিঞ্জি গোল্ড’ অর্থাৎ ভক্তদের জন্য তৈরি থিমভিত্তিক স্বর্ণের গয়না।

চৌ তাই ফুক জুয়েলারি গ্রুপ জাপানের জনপ্রিয় চরিত্র ‘চিয়িকাওয়া’ভিত্তিক গয়না বাজারে এনেছে। অন্যদিকে লাওমিয়াও চীনের জনপ্রিয় সিরিজ ‘হেভেন অফিসিয়ালস ব্লেসিং’-এর সঙ্গে যৌথভাবে নকশাকৃত গয়না বিক্রি করছে।

সাংহাইয়ের ৪০ বছর বয়সী বীমা কর্মী সানের হাতে পরেছেন ‘হ্যালো কিটি’ অলংকৃত একটি ব্রেসলেট ও চার্ম। এগুলো হ্যালো কিটির প্যারেন্ট সানরিওর সঙ্গে একটি বড় গয়না বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে তৈরি করেছে। চন্দ্র নববর্ষের ঠিক আগে প্রতিষ্ঠানটি ‘ইয়ার অব দ্য হর্স’ উদযাপন করতে ঘোড়ায় চড়া জনপ্রিয় জাপানি চরিত্রের একটি চার্মও বাজারে আনে।

সান বলেন, ‘আমি হ্যালো কিটি আর দোকানের বিজ্ঞাপনে থাকা আইডলদের পছন্দ করি। তাই এগুলো কিনেছি।’

অবশ্য পুরোটাই প্রিয় চরিত্রের প্রতি ভালোবাসা নয় একে বিনিয়োগ হিসেবেও দেখেন সান। তিনি বলেন, ‘স্বর্ণের দাম বাড়ছে, তাই এগুলোর মূল্যও বাড়তে পারে।’

আন্তর্জাতিক বাজারে চলতি বছরে প্রথমবারের মতো স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে, একসময় প্রায় ৫ হাজার ৬০০ ডলারের কাছাকাছিও পৌঁছায়। বাজারে স্বল্পমেয়াদি অস্থিরতা থাকলেও গত দুই বছরে স্বর্ণের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।

সাধারণত নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয় স্বর্ণ। ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের ওপর রাজনৈতিক চাপ সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করেছে। পাশাপাশি ভেনেজুয়েলায় মার্কিন সামরিক অভিযান এবং গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে ট্রাম্পের উদ্যোগ বিদ্যমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ও অনিশ্চয়তা আরো বাড়িয়েছে।

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্যানুযায়ী, চীনের পিপলস ব্যাংক জানুয়ারিতে টানা ১৫তম মাসের মতো তাদের স্বর্ণের মজুদ বাড়িয়েছে।

জাপান বুলিয়ন মার্কেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান পরিচালক ব্রুস ইকেমিজু বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রকাশ্যে স্বর্ণ কিনে যেতে থাকায় চীনের ব্যক্তি পর্যায়ের বিনিয়োগকারীরাও স্বর্ণ কিনতে বেশি স্বস্তি বোধ করছেন।’

চীন বিশ্বে স্বর্ণের গয়নার বড় ক্রেতা, ফলে সেখানকার প্রবণতা বৈশ্বিক চাহিদায় বড় প্রভাব ফেলে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে চীনে স্বর্ণের গয়নার চাহিদা প্রায় ৩৬০ টনে দাঁড়ায়, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম। তবে মূল্যের হিসাবে তা ৮ শতাংশ বেড়ে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।

তরুণ চীনা ভোক্তাদের মধ্যে চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৯ সালে ১৮-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ৩৭ শতাংশের কাছে স্বর্ণের গয়না ছিল; ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে, ফলে বয়স্ক প্রজন্মের সঙ্গে ব্যবধান অনেকটাই কমেছে।

চীনা গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে আলিবাবা গ্রুপ হোল্ডিংয়ের তাওবাও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে ফ্যানডম স্বর্ণের গয়নার বিক্রি প্রায় চারগুণ বেড়েছে। বিভাগটি সাইটের শীর্ষ ১০ জনপ্রিয় পণ্যের তালিকায়ও জায়গা করে নেয়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের এশিয়া-প্যাসিফিক (ভারত ব্যতীত) অঞ্চলের গবেষণা প্রধান রে জিয়া বলেন, এসব নির্দিষ্ট পণ্য কেমন বিক্রি হয় সেই তথ্য আলাদাভাবে সীমিত। তবে তিনি যোগ করেন, ‘তরুণ প্রজন্ম স্বর্ণের মূল্য বুঝছে এটি উৎসাহব্যঞ্জক। এ তংজিন পণ্যগুলো তাদের সঙ্গে স্বর্ণের গয়নার একটি আবেগগত সম্পর্কও তৈরি করেছে।’

আরও