ফোবিয়া

কুকুর দেখলেই বুক ধড়ফড়? স্বাভাবিক ভীতি নাকি সাইনোফোবিয়া?

রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ একটি কুকুরের ঘেউ ঘেউ শব্দে আমাদের অনেকেরই বুক একটু কেঁপে ওঠে। কিন্তু কারো কারো ক্ষেত্রে এই সামান্য ভয় রূপ নেয় চরম আতঙ্কে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় সাইনোফোবিয়া (Cynophobia) । এটি কেবল সাধারণ কোনো ভয় নয়, বরং একটি জটিল মানসিক অবস্থা যা একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দিতে পারে।

সাইনোফোবিয়া কী?

সাইনোফোবিয়া হলো কুকুরের প্রতি তীব্র ভয়। এই ফোবিয়ার নামটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘cyno’ থেকে, যার অর্থ কুকুর। এটি এমন এক ধরণের অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার বা উদ্বেগজনিত ব্যাধি, যেখানে কুকুর দেখলে, কুকুরের কথা চিন্তা করলে, এমনকি কুকুরের ডাক শুনলেও মানুষ প্রচণ্ড আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। এসব পরিস্থিতিতে তীব্র উদ্বেগ বা পূর্ণাঙ্গ প্যানিক অ্যাটাকও হতে পারে।

সাইনোফোবিয়া কতটা সাধারণ?

পরিসংখ্যান বলছে, প্রাণীদের প্রতি যাদের ‘স্পেসিফিক ফোবিয়া’ আছে, তাদের প্রতি ৩ জনের মধ্যে ১ জনই কুকুরের প্রতি চরম ভীতিতে ভোগেন। যে কেউ এই সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন, তবে নারীদের মধ্যে এর হার তুলনামূলক বেশি।

সাইনোফোবিয়ার কারণ ও কারা ঝুঁকিতে?

এই সমস্যা সাধারণত শিশুদের মধ্যে দেখা যায়, তবে যেকোনো বয়সেই সাইনোফোবিয়া হতে পারে। অটিজম এবং সংবেদনশীল বা বুদ্ধিবৃত্তিক পার্থক্য রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। যদি বিষণ্নতা, জেনারালাইজড অ্যানজাইটি ডিসঅর্ডার (GAD), মানসিক অসুস্থতার ইতিহাস, অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD), প্যানিক অ্যাটাক বা প্যানিক ডিসঅর্ডার, অন্য কোনো ফোবিয়া বা পরিবারে ফোবিয়ার ইতিহাস, মাদকাসক্তি সংক্রান্ত সমস্যা থাকে তবে সাইনোফোবিয়ার ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

যাঁরা কুকুরের সঙ্গে ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন, তাঁদের মধ্যেও এই ফোবিয়া হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কুকুর কামড় না দিলেও তাড়া করা বা হুমকির মুখে পড়া সাইনোফোবিয়া তৈরি করতে পারে। এই ফোবিয়া পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD)-এর অংশ হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।

লক্ষণগুলো চিনে রাখা জরুরি

সাইনোফোবিয়া আক্রান্ত ব্যক্তি যখন কোনো কুকুরের মুখোমুখি হন বা সেটি নিয়ে ভাবেন, তখন তার শরীরে বেশ কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়:

১. তীব্র শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় করা, বুকব্যথা ।

২. অতিরিক্ত ঘাম (হাইপারহাইড্রোসিস), মাথা ঘোরা, মাথাব্যথা, মুখ শুকিয়ে যাওয়া ।

৩. বমিভাব, বমি ও ডায়রিয়া।

৪. প্যানিক অ্যাটাক বা চিৎকার করে কেঁদে ওঠা।

৫. অজানা আশঙ্কা, ভয়ে কোনো কাজ করতে না পারা বা কুঁকড়ে যাওয়া।

সাইনোফোবিয়ার ট্রিগার পয়েন্ট

এই সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের সব সময় কুকুরের সংস্পর্শে আসতেই হবে—এমন নয়। নিচের বিষয়গুলোও তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে:

১. কুকুর দেখা, এমনকি কুকুরটি লিশে বাঁধা বা খাঁচায় থাকলেও

২. কুকুরের ঘেউঘেউ বা গর্জন শোনা

৩. কুকুরের ছবি দেখা বা কুকুর আছে এমন সিনেমা দেখা

৪. কুকুরের কথা ভাবা বা এমন জায়গায় যাওয়ার কথা ভাবা যেখানে কুকুর থাকতে পারে

সাইনোফোবিয়ার চিকিৎসা কী?

সাইনোফোবিয়ার প্রধান চিকিৎসা হলো থেরাপি ও ওষুধ। কুকুরের প্রতি তীব্র ভয় কমাতে যে থেরাপিগুলো কার্যকর, সেগুলো হলো:

এক্সপোজার থেরাপি: চিকিৎসক ধীরে ধীরে আক্রন্ত ব্যক্তিকে কুকুরের সংস্পর্শে আনেন। কিছু ক্ষেত্রে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি থেরাপিও ব্যবহার করা হয়। সময়ের সঙ্গে কুকুরের প্রতি সংবেদনশীলতা কমে এবং ভয় হ্রাস পায়। এই থেরাপিতে থাকতে পারে:

১. চোখ বন্ধ করে কুকুরের সঙ্গে সাক্ষাতের কল্পনা করা

২. কুকুরের ছবি বা ভিডিও দেখা

৩. খেলনা কুকুর হাতে নেওয়া

৪. দূর থেকে কুকুর খেলতে দেখা এবং ধীরে ধীরে কাছে যাওয়া

৫. লিশে বাঁধা কুকুরকে আদর করা

৬. লিশ ছাড়া কুকুরের সঙ্গে সময় কাটানো

কগনিটিভ বিহেভিয়ার থেরাপি (CBT): এর মাধ্যমে রোগীর চিন্তার ধরন পরিবর্তন করা হয়, যাতে তিনি কুকুরকে বিপদের উৎস হিসেবে না দেখে স্বাভাবিক প্রাণী হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।

হিপনোথেরাপি ও সাইকোথেরাপি: গভীর শিথিল অবস্থায় পরিচালিত থেরাপি, যা ভয় ও উদ্বেগে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে। ভয় বুঝতে সাহায্য করার জন্য সাইকোথেরাপি, বা টক থেরাপি।

ওষুধ: বিষন্নতা কমাতে, উদ্বেগ প্রশমিত করতে বা প্যানিক অ্যাটাক নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় ডাক্তার ওষুধের পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

জীবনযাপনে পরিবর্তন: মাইন্ডফুলনেস, যোগব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম ও ধ্যান উদ্বেগ কমাতে দারুণ সাহায্য করে।

কুকুরভীতিতে আক্রান্ত অধিকাংশ মানুষ থেরাপির মাধ্যমে ভালো হন। তবে ফলাফল নির্ভর করে ফোবিয়ার তীব্রতা ও ব্যক্তির সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি থেরাপি বা একাধিক থেরাপির সমন্বয় (যেমন CBT ও এক্সপোজার থেরাপি) প্রয়োজন হতে পারে।

সাইনোফোবিয়ার জটিলতা কী?

চিকিৎসা না করলে গুরুতর সাইনোফোবিয়া মানুষকে কুকুর থাকতে পারে এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে বাধ্য করে। পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে থাকা, বাইরে হাঁটতে না যাওয়া—এমনকি আগোরাফোবিয়া (জনসমাগম বা উন্মুক্ত স্থানে যাওয়ার ভয়) তৈরি হয়ে পুরোপুরি ঘরবন্দি হয়ে পড়ার ঝুঁকিও থাকে। এতে সম্পর্কের ক্ষতি এবং চাকরি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। একাকিত্ব, উদ্বেগ ও বিষন্নতা বাড়তে পারে।

ভয় পাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার, কিন্তু সেই ভয় যখন জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখন সাহায্যের প্রয়োজন হয়। আপনার বা আপনার সন্তানের যদি কুকুরের প্রতি এমন অস্বাভাবিক ভীতি থাকে, তবে তা অবহেলা না করে একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, সচেতনতা এবং সঠিক থেরাপি আপনাকে একটি দুশ্চিন্তামুক্ত ও আত্মবিশ্বাসী জীবন ফিরিয়ে দিতে পারে।

[ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের সহায়তায় লেখা]

আরও