প্রতি বছর ঈদুল আজহার আগে দেশের শহর-গ্রাম সব জায়গায় কিছু বদল আসে। দূর গ্রামের খামার থেকে গরুবোঝাই ট্রাক ঢুকে পড়ে শহরের মহাসড়কে। খালি মাঠ, উড়ালসড়কের পাশ কিংবা শহরের প্রান্তে রাতারাতি গড়ে ওঠে অস্থায়ী পশুর হাট। বাতাসে মিশে যায় খড়, কাদা আর বৃষ্টির গন্ধ। রাতভর চলে দরদাম, ডাকাডাকি, হাঁকডাক। বছরের অন্য সময় যাদের দেখা মেলে না, সেই ছুরি ধার দেওয়ার মানুষগুলোও আবার রাস্তায় ফিরে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় বিশাল আকৃতির গরু, হাটের ভিড় আর কোরবানির গল্পে।
সময় বদলালেও অপরিবর্তিত থেকেছে ঈদুল আজহার মূল শিক্ষা, ত্যাগ, আনুগত্য ও মানবিক আবেগের লেনদেন। কিন্তু এই আচারকে ঘিরে সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, নগরজীবন ও মানুষের আচরণ বদলে গেছে নাটকীয়ভাবে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলার ঈদুল আজহা ছিল অনেক বেশি নিরিবিলি ও গ্রামকেন্দ্রিক। সাধারণ পরিবারগুলোয় ছাগল কোরবানি ছিল বেশি প্রচলিত, আর গরু বা মহিষ কোরবানি দিত মূলত সচ্ছল কিংবা জমিদার পরিবারগুলো। পশু তখন কেবল বাজারের পণ্য ছিল না। অনেক পরিবার নিজেরাই মাসের পর মাস গরু লালন-পালন করত। তখনকার কোরবানি ছিল অনেক কম বাণিজ্যিক, কম প্রদর্শনমূলক এবং আন্তরিক।
ইতিহাসবিদদের মতে, মুঘল আমলে বাংলায় মুসলিম উৎসবগুলো ধীরে ধীরে আরো প্রকাশ্য ও আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে ওঠে। ঈদগাহ সংস্কৃতি বিস্তৃত হয়, অভিজাত পরিবারগুলো জনসমক্ষে দান-খয়রাত ও ভোজের আয়োজন করতে শুরু করে। ধর্মীয় তাৎপর্য অটুট থাকলেও, সামাজিক মর্যাদার প্রকাশও উৎসবের অংশ হয়ে ওঠে। আজকের ‘বড় গরু সংস্কৃতি’র শিকড় অনেকটাই সেই পুরোনো অভিজাত প্রদর্শনের ধারাবাহিকতায় খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে নগরায়ণের সঙ্গে।
সত্তর ও আশির দশকে ঢাকার ঈদুল আজহা তুলনামূলকভাবে সরল ছিল। এরপর বদলাতে শুরু করে ঢাকা। গ্রাম থেকে লাখো মানুষ শহরে আসতে থাকলে নগরজীবন ধীরে ধীরে পশুপালনের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। প্রতি বছর অস্থায়ী পশুর হাট আরো বড় হতে থাকে। ঈদের আগে শহরের পুরো অঞ্চল বদলে যেতে থাকে এক অস্থায়ী অর্থনৈতিক অঞ্চলে। একসময়কার ব্যক্তিগত ধর্মীয় আচার ধীরে ধীরে রূপ নেয় নগরজীবনের এক বিশাল দৃশ্যপটে। একই সঙ্গে কোরবানি জড়িয়ে পড়ে জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও।
আজ ঈদুল আজহা বাংলাদেশের অন্যতম বড় মৌসুমি অর্থনৈতিক চক্র। গবাদিপশুর খামার, পরিবহন, চামড়া শিল্প, মৌসুমি শ্রম, মোবাইল ব্যাংকিং, বরফ ও হিমাগার ব্যবসা-সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে এই উৎসবকে ঘিরে সক্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের অনেক গ্রামীণ পরিবারের জন্য কোরবানির গরু পালন এখন শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্য নয়; এটি তাদের বার্ষিক আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এই অর্থনৈতিক পরিবর্তন বদলে দিয়েছে গরুর বাজারের ভূগোলও। বহু বছর ধরে ভারত থেকে আসা গরুর ওপর নির্ভরশীল ছিল বাংলাদেশের কোরবানির বাজার। কিন্তু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার হওয়া এবং স্থানীয় খামার শিল্পে উৎসাহ বাড়ার ফলে দেশীয় গবাদিপশু খাত দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন প্রজন্মের খামারি ও পশু উদ্যোক্তা।
প্রযুক্তি এসে এই পরিবর্তনকে আরো দ্রুত করেছে। একসময় গরু কেনাবেচা মানেই ছিল স্থানীয় হাটে গিয়ে দরদাম করা। এখন মানুষ ফেসবুকে গরু দেখে, লাইভ ভিডিওতে পশু কেনে, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পরিশোধ করে। বড় বড় খামারে এখন ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার, এমনকি ড্রোন ক্যামেরাও ব্যবহৃত হয়। কিছু গরু ঈদের আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তারকা’ হয়ে ওঠে। ফলে কোরবানি ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে প্রদর্শনের সংস্কৃতিতেও।
একসময় গরুর আকার নির্ধারণ করত মূলত সামর্থ্য ও প্রয়োজন। এখন শহুরে সংস্কৃতিতে বড় গরু অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। দামি জাতের গরু, বিশাল আকারের পশু কিংবা ব্যতিক্রমী নাম, সবকিছুই জনআলোচনার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। এই পরিবর্তন নিয়ে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভোগবাদ কোরবানির আধ্যাত্মিক দিককে আড়াল করে দিচ্ছে। আবার অন্যদের মতে, এটি দ্রুত বদলে যাওয়া সমাজের স্বাভাবিক প্রতিফলন-যেখানে ধর্ম, পুঁজিবাদ ও ডিজিটাল সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে গেছে। তবু এই পরিবর্তনের ভেতরেও কোরবানির আবেগী ও মানবিক দিকগুলো এখনো টিকে আছে-প্রতিবেশীদের মধ্যে মাংস বণ্টন, পরিবারের একসঙ্গে সময় কাটানো, কিংবা শিশুদের প্রথম কোরবানি দেখার অভিজ্ঞতার মধ্যে।