আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস

শকুন কি সত্যিই মৃত্যুর দূত?

দেশে শকুনের বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সাদা-পিঠ শকুনকে জাতীয় ও বৈশ্বিক উভয় পর্যায়েই 'মহাবিপন্ন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি গবেষণা উপস্থাপনায় বাংলাদেশে এ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২৬০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরু-ঠোঁট শকুনও মহাবিপন্ন। অন্যদিকে লালমাথা শকুনের সাম্প্রতিক কোনো রেকর্ড নেই এবং প্রজাতিটিকে দেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পশুর মৃতদেহ ঘিরে চারপাশে বসে আছে একদল শকুন। আকাশে চক্কর দিচ্ছে আরো কয়েকটি। এমন দৃশ্যকে যে কেউই এড়িয়ে চলতে চায়। কারণ যুগের পর যুগ পাখিটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা কুসংস্কার। মানুষের কল্পনায় শকুন হয়ে উঠেছে অশুভের প্রতীক—মৃত্যুর আগাম বার্তাবাহক।

প্রকৃতির গল্প কিন্তু একেবারেই উল্টো। মৃত্যুর পর প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার কাজে এ পাখির ভূমিকাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মৃত প্রাণীর দেহ দ্রুত সরিয়ে দিয়ে পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখা, রোগজীবাণুর বিস্তার কমানো এবং বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় পাখিটি কাজ করে যায় নীরবে। অর্থাৎ শকুন যেখানে নামে, সেখানে কেবল মৃত্যুই থাকে না; থাকে প্রকৃতিকে সুস্থ রাখার এক অসাধারণ প্রক্রিয়াও।

এক সময় দেশের গ্রামাঞ্চল, বনাঞ্চল ও খোলা প্রান্তরে শকুনের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু কয়েক দশকের ব্যবধানে এ পরিচিত দৃশ্য প্রায় হারিয়ে গেছে। শকুনের এ দ্রুত পতন শুধু একটি পাখির বিলুপ্তির আশঙ্কা তৈরি করেনি; বরং এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং রোগ সংক্রমণের ঝুঁকির প্রশ্নও।

প্রায় এক যুগ আগেই বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন, দেশে শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়া মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুতর হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ শকুন না থাকলে মৃত ও সংক্রমিত প্রাণীর দেহ অন্য প্রাণী ও পাখির খাদ্যে পরিণত হয়। কুকুর, ইঁদুর ও কাকের মতো প্রাণী এসব মৃতদেহ খেলে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। সম্প্রতি অ্যানথ্রাক্স ও জলাতঙ্কের মতো রোগ প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার যে ঘটনা, তার সঙ্গে শকুনের অনুপস্থিতির সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

কোনো প্রাণী মারা যাওয়ার পর তার দেহ দ্রুত সরিয়ে ফেলা বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মৃতদেহ দীর্ঘ সময় খোলা পরিবেশে পড়ে থাকলে সেখানে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও অন্য রোগজীবাণু বিস্তার লাভ করতে পারে। শকুনের খাদ্যাভ্যাস এ ক্ষেত্রে প্রকৃতির একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। তারা দ্রুত মৃত প্রাণীর দেহ খেয়ে ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শকুন পচনশীল মৃতদেহ খাওয়ার ক্ষেত্রে অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় বিশেষভাবে সক্ষম। এ কারণেই শকুনকে কেবল একটি বন্য পাখি হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এরা প্রকৃতির স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশও।

দক্ষিণ এশিয়ায় শকুনের সংখ্যা কমে যাওয়ার ঘটনা বিশ্বের অন্যতম বড় বন্যপ্রাণী বিপর্যয়ের একটি। গবেষণায় দেখা যায়, ১৫ বছরেরও কম সময়ে ভারতীয় উপমহাদেশে সাদা-পিঠ শকুনের সংখ্যা ৯৫ শতাংশের বেশি কমে যায়। আর এটি ধীরে ধীরে কোনো প্রজাতি হারিয়ে যাওয়ার ঘটনা নয়; বরং অত্যন্ত দ্রুত ঘটে যাওয়া এক পরিবেশগত বিপর্যয়। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম শনিবার আন্তর্জাতিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হয়। দিবসটির উদ্দেশ্য, শকুন রক্ষা এবং প্রকৃতিতে এদের অপরিহার্য ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা।

বাংলাদেশে শকুনের বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতির তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে সাদা-পিঠ শকুনকে জাতীয় ও বৈশ্বিক উভয় পর্যায়েই 'মহাবিপন্ন' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একটি গবেষণা উপস্থাপনায় বাংলাদেশে এ প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ২৬০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরু-ঠোঁট শকুনও মহাবিপন্ন। অন্যদিকে লালমাথা শকুনের সাম্প্রতিক কোনো রেকর্ড নেই এবং প্রজাতিটিকে দেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের আকাশে শকুনের সংকট এখন শুধু সংখ্যা কমে যাওয়ার সমস্যা নয়; কিছু প্রজাতি আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। যে পাখি এক সময় বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দেখা যেত, আজ তার প্রতিটি বাসা, প্রতিটি প্রজননক্ষম জোড়া এবং প্রতিটি নিরাপদ খাদ্য উৎস সংরক্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৪ সালের এক আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশে শকুনের সংখ্যা প্রায় ৫০০-তে নেমে এসেছে। সে সময় তারা সতর্ক করেছিলেন, এ পাখির সংখ্যা কমে যাওয়ার সঙ্গে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদিও এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। ফলে পরবর্তী বছরগুলোয় আরো উদ্বেগজনক হারে শকুন কমেছে।

বন বিভাগের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ২০০৮ সালে শকুনের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৯৭২টি। ২০১৫ সালের জরিপে তা নেমে আসে ২৬০-এ। পরে সংখ্যা আরো কমে আড়াইশর নিচে নেমে যায় বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। অর্থাৎ বাংলাদেশের আকাশ থেকে শকুন হারিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি থামেনি। বর্তমানে সাত প্রজাতির শকুনের উপস্থিতির তথ্য থাকলেও লালমাথা শকুন স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। সাদা-পিঠ ও সরু-ঠোঁট শকুনও এখন অত্যন্ত সংকটাপন্ন।

দক্ষিণ এশিয়ায় শকুন বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ, পশুচিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু ব্যথানাশক ওষুধ। বিশেষ করে ডাইক্লোফেনাক নামের একটি ওষুধ শকুনের জন্য ভয়াবহ বলে প্রমাণিত হয়। গবাদিপশুকে এ ওষুধ দেয়ার পর প্রাণীটি মারা গেলে তার শরীরে এর অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে। পরে সেই প্রাণীর মৃতদেহ শকুন খেলে বিষাক্ত উপাদান তাদের শরীরেও প্রবেশ করে। এতে কিডনি বিকল হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে শকুন। আর একটি মৃত প্রাণীর দেহ খেতে একসঙ্গে অনেক শকুন জড়ো হয়। ফলে মাত্র একটি বিষাক্ত মৃতদেহও একাধিক শকুনের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশে ডাইক্লোফেনাক নিষিদ্ধ করা হলেও বাজারে এর ব্যবহার ও প্রাপ্যতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ ছিল। পরবর্তীতে কেটোপ্রোফেন নামের আরেকটি পশুচিকিৎসার ওষুধও শকুনের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়। ২০২১ সালে দেশে কেটোপ্রোফেন উৎপাদন বন্ধের প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন দেয়। নিরাপদ বিকল্প হিসেবে মেলোক্সিক্যামের ব্যবহার উৎসাহিত করার কথাও বলা হয়।

দেশে শকুনের সংখ্যা কমার সঙ্গে জলাতঙ্ক ও অ্যানথ্রাক্সের মতো জুনোটিক বা প্রাণী থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়া রোগের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন। পাখি বিশেষজ্ঞরা জানান, ভারতে বিভিন্ন গবেষণায় শকুন কমে যাওয়া ও জুনোটিক রোগের ঝুঁকির মধ্যে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। বাংলাদেশে একই ধরনের বিস্তৃত গবেষণা না থাকলেও শকুনের পতনের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সতর্ক থাকার প্রয়োজন।

ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, শুধু একটি ওষুধ নিষিদ্ধ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না; শকুনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে পশুচিকিৎসা, ওষুধবাজার এবং মৃত গবাদিপশুর ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকেই একসঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। এ বাস্তবতা থেকেই জন্ম নেয় ‘ভালচার সেফ জোন’ বা ‘শকুনের জন্য নিরাপদ অঞ্চল’-এর ধারণা। এর মূল দর্শন অত্যন্ত সহজ, শকুনকে শুধু খাঁচা বা নির্দিষ্ট কোনো অভয়ারণ্যে রক্ষা করলে হবে না; তাদের চলাচল, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রজননের জন্য বিস্তৃত একটি অঞ্চলকে নিরাপদ করে তুলতে হবে।

শকুনের জন্য নিরাপদ অঞ্চল হলো এমন একটি ভৌগোলিক এলাকা, যেখানে পাখিটির জন্য ক্ষতিকর পশুচিকিৎসার ওষুধের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হয়, নিরাপদ খাদ্যের ব্যবস্থা করা হয় এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন ও আবাসস্থল সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। দেশে বর্তমানে দুটি বৃহৎ ‘শকুনের জন্য নিরাপদ অঞ্চল’ রয়েছে। প্রথমটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হয়েছে। সিলেট অঞ্চলসহ ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু অংশ নিয়ে গঠিত এ নিরাপদ অঞ্চলের আয়তন প্রায় ১৯ হাজার ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, যা দেশের শকুনের গুরুত্বপূর্ণ প্রজননস্থলগুলোর একটি।

আর দ্বিতীয় নিরাপদ অঞ্চলটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে। খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং ঢাকা বিভাগের কিছু অংশ নিয়ে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলের আয়তন প্রায় ২৭ হাজার ৭১৭ বর্গকিলোমিটার। দুটি অঞ্চল মিলিয়ে প্রায় ৪৬ হাজার বর্গকিলোমিটারেরও বেশি এলাকা শকুন সংরক্ষণের আওতায় এসেছে।

এ উদ্যোগ আন্তর্জাতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশই বিশ্বের প্রথম দেশ, যেখানে সরকারিভাবে শকুন নিরাপদ অঞ্চল অনুমোদনের মাধ্যমে এ ধারণাকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়া হয়। তবে শকুনকে কোনো একটি বন বা অভয়ারণ্যের মধ্যে আটকে রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। খাদ্যের সন্ধানে তারা অনেক দূর পর্যন্ত উড়ে যায়। তাই তাদের চলাচলের বিস্তৃত এলাকাকেই নিরাপদ করার উদ্যোগ নেয়া জরুরি। নিরাপদ হতে হবে এদের খাবারও। পরিবর্তন আনতে হবে আমাদের বিশ্বাসে। মানুষ যেখানে পাখিটিকে মৃত্যুর প্রতীক ভাবে, প্রকৃতি সেখানে তাকে দিয়েছে মৃত্যুর পরের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এদের অনুপস্থিতিতে যে পরিবেশগত শূন্যতা তৈরি হয়, সেটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীরই কাজের একটি মূল্য আছে। তাই আকাশে শকুনের চক্কর কোনো অশুভ সংকেত নয়; বরং সেটি একটি জীবন্ত, ভারসাম্যপূর্ণ প্রকৃতির চিহ্ন। প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার নীরব দূত এরা।

আরও