বিশ্ব কফি দিবস

চায়ের দেশে কফির বাজার

কফির এ ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশীয় অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক কাঠামোয়। কফিকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের এক নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণী। ফলে ক্যাফে ব্যবসার পরিধি আর কেবল এক কাপ কফি বিক্রির মধ্যে আটকে নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কফি বিন আমদানি, রোস্টিং, গ্রাইন্ডিং, দামি মেশিনারি বাণিজ্য ও বারিস্তাদের কর্মসংস্থানের এক নতুন বাজার

এক কাপ চা আর একঝুড়ি গল্প—বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আড্ডার এই চেনা ছবি দীর্ঘদিনের। পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, অফিসের ক্যান্টিন থেকে টং দোকানে চায়ের কাপকে কেন্দ্র করেই জমে উঠত প্রেম, রাজনীতি, সমাজনীতি আর বন্ধুত্বের অন্তহীন হিসাব-নিকাশ। কিন্তু গত এক দশকে শহুরে জীবনযাপনের সেই চেনা ফ্রেমে যুক্ত হয়েছে নতুন এক অনুষঙ্গ। টং দোকানের চায়ের কাপের পাশে জায়গা করে নিয়েছে কফির সিরামিক বা পেপার মগ। আর সেই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আড্ডার ধরন, স্থান এবং নতুন প্রজন্মের সামাজিক মনস্তত্ত্ব।

কফি অবশ্য বাংলাদেশে নতুন কোনো পানীয় নয়। তবে একসময় এর উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত পরিসরে—ঘরে গোলানো কফি কিংবা উচ্চবিত্তের নির্দিষ্ট কিছু অভিজাত রেস্তোরাঁর বিলাসিতায়। এখন সেই রূপরেখা অনেকটাই বদলে গেছে। রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলশান, বনানী ছাড়িয়ে দেশের বড় বড় শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠছে একের পর এক ক্যাফে ও কফিশপ। তবে ফুটপাতের চায়ের টং আর আধুনিক ক্যাফের আড্ডার মধ্যে রয়েছে সূক্ষ্ম তফাত। টং দোকানে কেবল আড্ডাই যেখানে মূল আকর্ষণ, ক্যাফেতে সেখানে পানীয়ের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিরবিলি পরিবেশ, কাজের সুযোগ ও নিজস্ব ব্যক্তিগত পরিসর। মেন্যুতেও রয়েছে পেস্ট্রিসহ নানা ধরনের আইটেম।

এ নতুন জীবনধারার কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষার্থী, তরুণ চাকরিজীবী, ফ্রিল্যান্সার ও উঠতি উদ্যোক্তারা। তাদের কাছে ক্যাফে এখন আর শুধুই কফি পানের স্থান নয়; এটি একইসঙ্গে অফিসের বাইরের বিকল্প কাজের টেবিল, বন্ধুদের জন্য আড্ডাখানা, বই পড়ার নিরিবিলি পরিবেশ কিংবা অনলাইন মিটিংয়ের আধুনিক অনুষঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কফির মগ আর ক্যাফের নান্দনিক সাজসজ্জার ছবি এখন তরুণদের আধুনিক জীবনযাত্রার এক পরিচিত প্রতীক। এর সাথে বদলেছে কফি সম্পর্কিত রুচি ও চাহিদাও। স্রেফ ইনস্ট্যান্ট কফিতে সীমাবদ্ধ না থেকে তরুণরা এখন অভ্যস্থ হয়ে উঠছে এসপ্রেসো, ক্যাপুচিনো, লাতে, আমেরিকানো, মোচা কিংবা কোল্ড কফির ভিন্ন ভিন্ন স্বাদে।

কফির এ ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক জনপ্রিয়তা সরাসরি প্রভাব ফেলছে দেশীয় অর্থনীতি ও ব্যবসায়িক কাঠামোয়। কফিকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের এক নতুন উদ্যোক্তা শ্রেণী। ফলে ক্যাফে ব্যবসার পরিধি আর কেবল এক কাপ কফি বিক্রির মধ্যে আটকে নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কফি বিন আমদানি, রোস্টিং, গ্রাইন্ডিং, দামি মেশিনারি বাণিজ্য ও বারিস্তাদের কর্মসংস্থানের এক নতুন বাজার। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ২ হাজার টন কফির ব্যবহার হয় এবং গত এক দশকে এর বার্ষিক চাহিদা গড়ে প্রায় ৫৬ শতাংশ হারে বেড়েছে।

চাহিদার এ উল্লম্ফন নতুন এক কৃষি সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে—বাংলাদেশেই বাণিজ্যিকভাবে কফি চাষ। বর্তমানে পার্বত্য অঞ্চল বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পাহাড়ি ঢালে রোবস্তা ও অ্যারাবিকা জাতের কফি চাষের বিস্তার ঘটছে। যদিও দেশে বছরে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন মাত্র ২৫ টনের মতো, যা মোট চাহিদার ৫ শতাংশেরও কম। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে কফি চাষের জমির পরিমাণ ছিল ১২২ হেক্টর। তবে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বাড়াতে পারলে শহরের ক্যাফে আর পাহাড়ের কফি বাগানকে একই অর্থনৈতিক সুতোয় গাঁথা সম্ভব।

তবে চায়ের শতবর্ষী ঐতিহ্যকে হটিয়ে কফি একক জায়গা দখল করে নিচ্ছে—বিষয়টি এমন নয়। টংয়ের চা যেমন তার চিরাচরিত আবহে আজও টিকে আছে, তেমনই তার পাশাপাশি শক্ত ভিত্তি তৈরি করেছে কফি সংস্কৃতির এ নতুন শহুরে যাপন। চায়ের দেশে কফির এ বিস্তার তাই কেবল একটি পানীয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ার গল্প নয়; এটি মানুষের অবসর কাটানোর বদলে যাওয়া ধরন, আধুনিক সামাজিকতা এবং পাহাড়ি কৃষি থেকে শহুরে ক্যাফে পর্যন্ত বিস্তৃত এক নতুন অর্থনীতির গল্প।

আরও