এশিয়ার অন্যতম জনবহুল ও কোলাহলপূর্ণ শহর ম্যানিলা। জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ। এ ব্যস্ত মহানগরীতেই মাত্র ১০ মাইল দূরত্বে দাঁড়িয়ে আছে দুটি সমাধিক্ষেত্র, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, আত্মত্যাগ আর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।
এর একটি জায়গায় গেলে দেখা যায় সারি সারি কবর, প্রতিটি সমাধিতে খোদাই করা আছে নাম, বয়স আর ব্যক্তিগত গল্প। অন্যটিতে আছে মাত্র একটি সাদা ক্রস, তার নিচে অচিহ্নিত এক গণকবর। যেখানে শুয়ে আছেন প্রায় ৬০০ ফিলিপিনো ও মার্কিন নাগরিক। যাদের শেষ দিনগুলো কেটেছিল নির্যাতন আর অনাহারে।
ফিলিপাইনের আধুনিক বাণিজ্যিক এলাকা বনিফাসিও গ্লোবাল সিটির আকাশচুম্বী ভবন থেকে কয়েক কদম দূরেই ম্যানিলা আমেরিকান সিমেট্রি। শহরের যানজট আর হর্নের শব্দ পেছনে ফেলে ফটক পেরোলেই এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে এখানে।
১৫২ একর জুড়ে সবুজ ঘাসের ওপর নিখুঁত সারিতে সাজানো ১৭ হাজার ১১১টি সমাধি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৯৩৮টি ল্যাটিন ক্রস আর ১৭৫টি স্টার অব ডেভিড। যুদ্ধের মাঠে নিহত মার্কিন সেনাদের শেষ ঠিকানা এটি। প্রায় ৩ হাজার সমাধিতে লেখা, ‘আ কমরেড ইন আর্মস নোন বাট টু গড’—অর্থাৎ, ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ যাকে চেনে না।
এ সমাধিক্ষেত্রটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় একক কবরস্থান। একটি সমাধিতে চোখে পড়ে প্রাইভেট ফার্স্ট ক্লাস আলফ্রেড ড্যাভেনপোর্টের নাম। উত্তর ক্যারোলিনার এক কৃষ্ণাঙ্গ তরুণ, বয়স মাত্র ২০। ১৯৪৪ সালে প্রশান্ত মহাসাগরের বুগেনভিল দ্বীপে আহত হয়ে মারা যান তিনি। তখন মার্কিন সেনাবাহিনীতে বর্ণভিত্তিক বিভাজন ছিল। কিন্তু মৃত্যুর পরে এখানে জাতি, ধর্ম, র্যাঙ্কের ভেদাভেদ নেই, সবাই পাশাপাশি শুয়ে আছেন।
যারা আর ফেরেনি
সমাধিক্ষেত্রের চূড়ায় আছে একটি বৃত্তাকার স্মৃতিসৌধ। এখানে পাথরের ফলকে খোদাই করা ৩৬ হাজারের বেশি নাম। যুদ্ধের পর যাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। এদের মধ্যে আছে আইওয়ার পাঁচ ভাই—জর্জ, ফ্রান্সিস, জোসেফ, ম্যাডিসন আর অ্যালবার্ট সালিভান। ১৯৪২ সালে গুয়াডালক্যানালের যুদ্ধে তাদের জাহাজ ইউএসএস জুনো ডুবে গেলে সবাই একসঙ্গে মারা যান। মার্কিন সামরিক ইতিহাসে এক পরিবারের সবচেয়ে বড় ক্ষতির ঘটনা এটি।
ইতিহাসের পাঠশালা
এ কবরস্থান শুধু শোকের জায়গা নয়, এক ধরনের জীবন্ত ইতিহাস। স্মৃতিসৌধের দেয়ালে রঙিন মোজাইক মানচিত্রে দেখানো হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় যুদ্ধ—মিডওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াই, সাবমেরিন অভিযানের পথ, এমনকি যে ৪৯টি সাবমেরিন আর ফিরে আসেনি, তাদের নামও।
একটি আধুনিক ভিজিটর সেন্টারেও রাখা আছে যুদ্ধের স্মারক, ব্যক্তিগত গল্প ও প্রদর্শনী। আগ্রহীরা বিনামূল্যে গাইডেড ট্যুরও নিতে পারেন।
নির্যাতনের গুহা: ফোর্ট সান্তিয়াগো
সমাধিক্ষেত্র থেকে প্রায় ৯ মাইল দূরে, ইন্ট্রামুরোস এলাকায় অবস্থিত ফোর্ট সান্তিয়াগো। ১৬শ শতকে স্প্যানিশরা তৈরি করেছিল এই পাথরের দুর্গ। পরে ব্রিটিশ, আমেরিকান ও জাপানিদের দখলেও ছিল এটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম ভয়াবহ জায়গাটির অবস্থান এখানে। ফোর্টেল পাশেই রয়েছে বিশালাকার একটি সাদা ক্রস, আর তার নিচে অবস্থিত অন্ধকার ডানজিয়ন। প্রায় ৬০০ মানুষের গণকবর রয়েছে এখানে। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে, ম্যানিলা যুদ্ধের শেষ দিকে, জাপানি বাহিনী বন্দিদের এ ডানজিয়নে আটকে রেখে চলে যায়। পানি, খাবার আর বাতাসের অভাবে মারা যান বন্দিরা। পরে মার্কিন সেনারা দুর্গটি পুনরুদ্ধার করে স্তরে স্তরে লাশ উদ্ধার করে।
ভেতরে ঢুকলে আজও গুমোট, স্যাঁতসেঁতে আর অস্বস্তিকর লাগে। দেয়ালে টাঙানো মুক্তির সময় তোলা বাস্তব ছবি আর ভাস্কর্য সে বিভীষিকার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আতঙ্ক আর আত্মার গল্প
স্থানীয়দের বিশ্বাস, ফোর্ট সান্তিয়াগো আর ডানজিয়নে এখনও আত্মারা ঘোরাফেরা করে। কেউ কেউ বলেন, হঠাৎ ঠান্ডা বাতাস লাগে, ফিসফিস শব্দ শোনা যায়, এমনকি কারও স্পর্শও অনুভূত হয়। দুর্গ থেকে একটু দূরে আছে ‘মেমোরারে ম্যানিলা ১৯৪৫’ স্মৃতিস্তম্ভ। এখানে শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে সেই এক লাখ বেসামরিক মানুষকে, যারা ১৯৪৫ সালের এক মাসব্যাপী যুদ্ধে জাপানি বাহিনীর নৃশংসতা আর মার্কিন গোলাবর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারান।
সিএনএন অবলম্বনে