একসময় হাজার হাজার সিলশাবকের কোলাহলে মুখর থাকত উপকূল, এখন শুধু মৃতদেহের সারি। অ্যান্টার্কটিকার কাছাকাছি দুটি প্রত্যন্ত দ্বীপের সৈকতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে অসংখ্য সিলশাবকের নিথর দেহ। প্রথমে এই বিপর্যয়ের কারণ নিয়ে ধোঁয়াশা থাকলেও, বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন—এর পেছনে রয়েছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এক প্রাণঘাতী বার্ড ফ্লু ভাইরাস।
গবেষকদের মতে, বার্ড ফ্লুর এ মারাত্মক প্রাদুর্ভাবে প্রায় ১৩ হাজার সিলশাবকের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি পেঙ্গুইন ও বিভিন্ন সামুদ্রিক পাখির মধ্যেও ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।
অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের ড্রোন জরিপে গত অক্টোবর ও জানুয়ারিতে তোলা ছবিতে দেখা গেছে, হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জের ধূসর আগ্নেয় উপকূলে অসংখ্য মৃত সিলশাবকের দেহ পড়ে আছে। সংস্থাটির জ্যেষ্ঠ গবেষক জ্যারড হজসন এসব দৃশ্যকে ‘মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।
অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান এ দ্বীপগুলোর। দীর্ঘদিন ধরে এসব ভূখণ্ড সামুদ্রিক পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত ছিল।
অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামের তথ্যানুযায়ী, দ্বীপগুলোয় জন্ম নেয়া প্রায় ১৭ হাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় এলিফ্যান্ট সিলশাবকের মধ্যে মৃত্যুহার ছিল ৭৬ শতাংশ। একটি এলাকায় এ হার পৌঁছেছিল ৯৭ শতাংশে।
হজসন বলেন, ‘জরিপ থেকে আমরা জানতে পারিনি যে দক্ষিণাঞ্চলীয় এলিফ্যান্ট সিলের প্রজননক্ষম প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর এর প্রভাব কতটা পড়েছে।’
ছবি: অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্টার্কটিক ডিভিশন
জানুয়ারিতে সংগৃহীত তথ্যে এ-ও দেখা গেছে, হার্ড দ্বীপে কয়েকশ প্রাপ্তবয়স্ক কিং পেঙ্গুইনের মৃত্যু হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মৃত্যুর হার স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
জীববিজ্ঞানী জুলি ম্যাকইনেস বলেন, ‘হার্ড ও ম্যাকডোনাল্ড দ্বীপপুঞ্জে এইচ৫ বার্ড ফ্লুর উপস্থিতি অস্ট্রেলিয়ার কোনো বহিঃঅঞ্চলে প্রথম শনাক্তকরণ। এটি দেখাচ্ছে যে ভাইরাসটি সাব-অ্যান্টার্কটিক অঞ্চলজুড়ে পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়া অব্যাহত রেখেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের ফলাফল অন্যান্য সাব-অ্যান্টার্কটিক দ্বীপ, যেমন সাউথ জর্জিয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে মিল রয়েছে, যেখানে এলিফ্যান্ট সিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’
২০২৫ সালের অক্টোবরে হার্ড দ্বীপের ক্যাপসাইজ বিচ এলাকায় দক্ষিণাঞ্চলীয় এলিফ্যান্ট সিলের মধ্যে এইচ৫ বার্ড ফ্লুর ব্যাপক মৃত্যুর ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড ও নিউজিল্যান্ডে এইচ৫এন১ ভাইরাসের কোনো সংক্রমণ শনাক্ত হয়নি। তবে ভাইরাসটি এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে পাখিদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এবং কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণীকেও আক্রান্ত করেছে।
জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকরা ধারণা করছেন, ভাইরাসটি সম্ভবত ক্রোজেট দ্বীপপুঞ্জ থেকে আসা বন্যপ্রাণীর মাধ্যমে দ্বীপগুলোয় প্রবেশ করে। প্রায় ১ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দূরের ওই দ্বীপপুঞ্জ থেকে এ সংক্রমণ সম্ভবত গত আগস্টের দিকে এখানে পৌঁছায়।
সিএনএন অবলম্বনে