নরওয়ে ফুটবল টিমের স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড ফুটবল থেকে অবসর নেয়ার পর গরুর খামার দিতে চান বলে জানিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি নতুন করে আলোচনায় আসে। তবে এর পেছনে তার স্বপ্ন মূল কারণ নয়। বরং অধিকাংশ তরুণের মতো একজন তারকা ফুটবলারও যে খামারি হওয়ার স্বপ্ন দেখেন সেটি হালান্ডের বক্তব্যকে আলোচনায় এনেছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যত ভাইরাল রিলস, মিমস দেখা যায়, তার মধ্যে একটি থাকে গরুর খামার দেয়া ঘিরে; তরুণ বয়সে সবাই একটা গরুর খামার দিতে চায়। বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুর দিকে সবার একটি ‘ফ্রেন্ড সার্কেল’ গড়ে ওঠে। এসব সার্কেলে কখনো না কখনো সবাই মিলে কোনো কাজ করার পরিকল্পনা করা হয়। আর এ সংক্রান্ত আলাপে বেশিরভাগ সময় চলে আসে গরুর খামার দেয়ার কথা। কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে অল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করে ভালো মুনাফার আশা থেকেই এ আগ্রহ দেখা যায়। কালক্রমে বিষয়টি এতটাই পরিচিত হয়ে উঠেছে বর্তমানে এটা একটা প্রজন্মের রসিকতার বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
দেশে মুরগি, গরু, ছাগল এসব প্রাণীর খামার প্রচলিত। কিন্তু পৃথিবীতে এগুলোর বাইরেও বর্তমানে এক প্রাণীর খামার বিস্তৃত ও লাভজনক হয়ে উঠছে। সেটি হলো সাপের খামার। শুনতে অবাক লাগলেও চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ভারতের মতো দেশে সাপের খামার এখন প্রতিষ্ঠিত ও লাভজনক ব্যবসা।
সাপের খামার যেভাবে লাভজনক হচ্ছে
২০১৩ সালে সংবাদমাধ্যম বিবিসি চীনের একটি গ্রাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে গ্রামটিকে ‘সাপের গ্রাম’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেটি হলো চীনের জিসিকিয়াও গ্রাম। চীনে এ গ্রামকে সাপ পালনের আদিকেন্দ্র বলা হয়। ইয়াং হোঙচাঙ নামের এক বাসিন্দা সাপ পালন শুরু করেন। সেটা একসময় লাভজনক হলে পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে এবং সবাই মিলে সাপের ব্যবসা শুরু করেন।
চীনের কিছু অংশে সাপের মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এমনকি চীন থেকে বিভিন্ন দেশে সাপ রফতানিও করা হয়। শুধু তাই নয়, সাপকে ওষুধ শিল্পেও কাজে লাগানো হচ্ছে, বিশেষ করে বর্তমানে চাইনিজ মেডিসিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সাপ। অর্থাৎ কেবল বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় প্রাণী থেকে অর্থনৈতিক ও প্রাণরক্ষাকারী প্রাণীও হয়ে উঠেছে। কালক্রমে এভাবে সাপ পালনকে ঘিরে যে অর্থনীতি গড়ে উঠেছে, তার মূল ভিত্তি মোটাদাগে চারটি খাত।
বিষ ও ওষুধশিল্প: সাপের বিষ থেকে তৈরি হয় প্রাণরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম। পাশাপাশি রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ, রক্ত জমাট বাঁধা প্রতিরোধ এবং ব্যথানাশক ওষুধ তৈরিতেও সাপের বিষ ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে এক পাউন্ড বিষের দাম প্রায় ৮ কোটি টাকা।
চামড়া ও ফ্যাশন শিল্প: পাইথনসহ বিভিন্ন সাপের চামড়া ব্যাগ, জুতা, বেল্টসহ বিলাসবহুল ফ্যাশন পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়, যার আন্তর্জাতিক বাজার বিশাল। গুচি, লুই ভিতোঁর মতো বড় বড় ফ্যাশন ব্র্যান্ড সাপের চামড়া ব্যবহার করে উচ্চ মূল্যের পণ্য তৈরি করে।
খাদ্য ও পুষ্টিপণ্য: চীনে সাপের মাংসের স্যুপ জনপ্রিয় খাবার। এছাড়া সাপের পিত্তথলি-যকৃৎ ব্যবহৃত হয় পুষ্টিসম্পূরক তৈরিতে।
পর্যটন ও গবেষণা: থাইল্যান্ডের মতো দেশে সাপের খামার একইসঙ্গে পর্যটন আকর্ষণ, যেখানে দর্শনার্থীরা টিকিট কেটে সাপ দেখতে ও বিষ সংগ্রহ প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতে আসেন। পাশের দেশ ভারতেও স্নেক পার্কও গড়ে তোলা হয়েছে।
এরূপ বহুমুখী আয়ের উৎস থাকার কারণেই সাপের খামারকে তুলনামূলক কম জায়গায়, কম প্রাণী দিয়েও অধিক লাভজনক করে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন খামার-অর্থনীতির বিশেষজ্ঞরা।
দেশে সাপের খামারের সম্ভাবনা
বাংলাদেশের আবহাওয়া ও জীববৈচিত্র্য সাপ পালনের জন্য বেশ উপযোগী বলে মনে করা হয়। দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ রয়েছে, যার মধ্যে কিং কোবরা, গোখরা, চন্দ্রবোড়া (রাসেল ভাইপারের) মতো বিষধর প্রজাতিও আছে। সম্প্রতি রাসেল ভাইপারের বিস্তার ও সাপের কামড়ে মৃত্যুর হার বেড়ে যাওয়ায় দেশে অ্যান্টিভেনমের চাহিদাও ক্রমেই বাড়ছে—অথচ দেশীয় উৎপাদন প্রায় নেই বললেই চলে, ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনমের ওপর নির্ভর করতে হয়, যার দামও তুলনামূলক বেশি। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দেশে নিয়ন্ত্রিত উপায়ে সাপের খামার গড়ে তোলা গেলে দেশীয়ভাবে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের পথ সুগম হতে পারে। এতে আমদানিনির্ভরতা কমবে এবং রফতানি আয়ের সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
দেশে অনুমোদনপ্রাপ্ত সাপের খামার
বাংলাদেশে সাপের খামার নিয়ে আলোচনায় বারবার উঠে আসে পটুয়াখালীর সদর উপজেলার নন্দিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাসের নাম। ২০০০ সালে বিদেশ থেকে ফিরে একটি কিং কোবরা ও ২০টি ডিম দিয়ে ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’" নামে তার খামারের যাত্রা শুরু হয়। লক্ষ্য ছিল সরকারি অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে সাপের বিষ সংগ্রহ ও বিক্রি করে দেশের প্রথম সারির সাপ-উদ্যোক্তা হওয়া। দীর্ঘ ২৬ বছর নানা আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা কাটিয়ে সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের নিবন্ধন পেয়েছে খামারটি। ফলে বৈধভাবে বিষধর সাপ থেকে ভেনম সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
চ্যালেঞ্জ
খামারি আব্দুর রাজ্জাকের অভিজ্ঞতাই স্পষ্ট করে দেয়, বাংলাদেশে সাপের খামারের সম্ভাবনা যতটা রয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতাও ততটাই বেশি। এছাড়া সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতিও রয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা গেলে দেশে সাপের বাণিজ্যের প্রসার সম্ভব। এমনকি বিদেশে রফতানিও করা যেতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পষ্ট নীতিমালা, নিরাপত্তা মান ও তদারকি ব্যবস্থা তৈরি করে যদি এ খাতকে বৈধতা দেয়া যায়, তাহলে গরুর খামারের মতো প্রচলিত উদ্যোগের পাশাপাশি সাপের খামারও একদিন হয়ে উঠতে পারে দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত।