কবিতা, প্রবন্ধ, উপন্যাস, অনুবাদ—কোনো একটি ঘরানার মধ্যে তাকে আটকে রাখা কঠিন। কখনো আড়াই হাজার বছরের পুরোনো গ্রিক পুরাণকে তুলে আনেন আধুনিক প্রেমের গল্পে, কখনো কবিতার ভেতরে ঢুকিয়ে দেন প্রবন্ধ, নাটক কিংবা সংলাপ। আবার কখনো প্রাচীন গ্রিক ট্র্যাজেডির চরিত্রের পাশে দাঁড় করান আধুনিক সময়ের পরিচিত কোনো মুখকে। সাহিত্যের প্রচলিত ঘরানাগুলোর সীমানা বারবার ভেঙে নতুন কাঠামো তৈরির এই প্রবণতাই কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক ও ধ্রুপদি সাহিত্যের গবেষক অ্যান কারসনকে আলাদা করেছে সমকালীন লেখকদের ভিড়ে। সেই অ্যান কারসনই পেলেন ২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সুইডিশ একাডেমি তার নাম ঘোষণা করে বলেছে, ‘ধ্রুপদি ঐতিহ্যের সঙ্গে কৌতুকপূর্ণ সংলাপের মধ্য দিয়ে সমকালীন সাহিত্যের জন্য নতুন নতুন রূপ সৃষ্টি করা তার সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের জন্য’ তাকে এ পুরস্কার দেয়া হয়েছে।
পুরস্কার ঘোষণার সময় ৭৬ বছর বয়সী কারসন ছিলেন আইসল্যান্ডে। সুইডিশ একাডেমির পার্মানেন্ট সেক্রেটারি ইনগ্রিড কার্লবার্গ জানিয়েছেন, পুরস্কারের খবর জানাতে যখন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়, তখন তিনি আইসল্যান্ডে ‘বাতাসের শব্দ শুনছিলেন’।
অ্যান প্যাট্রিসিয়া কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন কানাডার টরন্টোয়। শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে কানাডার বিভিন্ন ছোট শহরে। স্কুলজীবনেই এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা পরে তার পুরো সাহিত্যজীবনের ভিত্তি হয়ে ওঠে।
হাইস্কুলে পড়ার সময় লাতিন ভাষার এক শিক্ষক তাকে প্রাচীন গ্রিক ভাষা শেখাতে শুরু করেন। মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে শিক্ষকটির কাছ থেকে গ্রিক শেখার সেই অভিজ্ঞতাই তাকে ধীরে ধীরে গ্রিক সাহিত্য, পুরাণ ও দর্শনের দিকে নিয়ে যায়। পরে এই ধ্রুপদি জগতই হয়ে ওঠে তার সাহিত্যকর্মের অন্যতম প্রধান উৎস।
একসময় একটি বইয়ের দোকানে গ্রিক কবি স্যাফোর কবিতার দ্বিভাষিক সংস্করণ হাতে পেয়েছিলেন কারসন। এক পাশে গ্রিক ভাষার লেখা, অন্য পাশে তার অনুবাদ। পরবর্তী সময়ে তিনি বলেছেন, দুর্বোধ্য হলেও গ্রিক অক্ষরের দৃশ্যমান সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতাও প্রাচীন গ্রিক ভাষার প্রতি তার আগ্রহকে আরো গভীর করে।
ইউনিভার্সিটি অব টরন্টো থেকে ১৯৭৪ সালে স্নাতক, ১৯৭৫ সালে স্নাতকোত্তর এবং ১৯৮১ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজেও গ্রিক ছন্দ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন।
এরপর দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব মিশিগান, নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ও প্রিন্সটনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়িয়েছেন তিনি।
অ্যান কারসন কবি, কিন্তু তার কবিতার ভেতরে থাকে প্রবন্ধ। তিনি প্রাবন্ধিক, কিন্তু সেই প্রবন্ধ কখনো কবিতার ছন্দে ভেঙে যায়। তার কোনো বই দেখতে উপন্যাসের মতো, কিন্তু লেখা হয় পদ্যে। কোথাও নাটকের সংলাপ, কোথাও ক্লাসিক্যাল টেক্সটের অনুবাদ, কোথাও আবার ব্যক্তিগত শোক, প্রেম কিংবা আকাঙ্ক্ষার গল্পের সঙ্গে মিশে যায় গ্রিক পুরাণ।
পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন কারসনের সাহিত্যজীবনকে শ্রেণিবদ্ধ করা কঠিন বলে বর্ণনা করেছে। কবিতা, প্রবন্ধ, লিব্রেটো, সাহিত্যসমালোচনা, গদ্য—সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন তিনি। তার লেখায় প্রেম, আকাঙ্ক্ষা, যৌনতা, বিচ্ছেদ, হতাশা ও শোকের মতো গভীর মানবিক অনুভূতির পাশে প্রায়ই দেখা যায় প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের অনুসন্ধান।
কারসনের সবচেয়ে আলোচিত বইগুলোর একটি ‘অটোবায়োগ্রাফি অব রেড’। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত বইটিকে তিনি নির্মাণ করেছেন প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের গেরিয়ন পুরাণকে ভিত্তি করে। মূল পুরাণে গেরিয়ন এক লাল ডানাওয়ালা দানব, যাকে হত্যা করেন হেরাক্লিস। কিন্তু কারসন সেই গল্প সম্পূর্ণ বদলে দেন। তার গেরিয়ন আধুনিক সময়ের এক সংবেদনশীল তরুণ। হেরাক্লিসের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়, প্রেম আসে, তারপর আসে হৃদয়ভাঙা অভিজ্ঞতা।
পরবর্তীতে ‘রেড ডক’ বইয়ে গেরিয়নের গল্পে আবার ফিরে যান তিনি।
কারসনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বইগুলোর একটি ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট: অ্যান এসে’। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত বইটিতে প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও দর্শনের আলোকে প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অনুপস্থিতির সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন তিনি। তার অন্যান্য গ্রন্থগুলো হলো গ্লাস, আয়রনি, অ্যান্ড গড, প্লেইনওয়াটার, মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স, দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড, ডিক্রিয়েশন, নক্স প্রভৃতি।
২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড: আ ফিকশনাল এসে ইন ২৯ ট্যাঙ্গোস’ গ্রন্থের জন্য টি এস এলিয়ট প্রাইজ পান। এছাড়া তার পুরস্কার ও সম্মাননার তালিকায় রয়েছে ম্যাকআর্থার ফেলোশিপ, গুগেনহাইম ফেলোশিপ, গ্রিফিন পোয়েট্রি প্রাইজ, ল্যানান লিটারারি অ্যাওয়ার্ড।
বেশ কয়েক বছর ধরেই সম্ভাব্য নোবেলজয়ী হিসেবে সাহিত্য মহলে তার নাম উচ্চারিত হচ্ছিল। চলতি বছর পুরস্কার ঘোষণার আগের দিনও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বেটিং প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয়দের একজন। শেষ পর্যন্ত সুইডিশ একাডেমির সিদ্ধান্তও গেল তার পক্ষেই।
গার্ডিয়ান, পোয়েট্রি ফাউন্ডেশন, একাডেমি অব আমেরিকান পোয়েটস অবলম্বনে