ইতিহাসের অনেক বড় গল্প কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে খুব ছোট কোনো বস্তুতে। একটি মুদ্রা, ভাঙা মাটির পাত্র, পাথরের টুকরো কিংবা ক্ষুদ্র কোনো ভাস্কর্য—এসবের মধ্যেই হাজার বছরের পুরোনো মানুষের জীবন, রুচি, প্রযুক্তি ও সমাজের আভাস পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার মোহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া তেমনই এক বিস্ময়কর নিদর্শন ‘ড্যান্সিং গার্ল’ বা নৃত্যরত তরুণীর ব্রোঞ্জমূর্তি। উচ্চতায় মাত্র ১০ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। অথচ ছোট্ট এ ভাস্কর্য প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে মানুষের কৌতূহলকে বাঁচিয়ে রেখেছে—সে আসলে কে? সত্যিই কি নৃত্যশিল্পী? নাকি তার পরিচয় সম্পর্কে আমরা শুরু থেকেই ভুল ধারণা পোষণ করে আসছি?
ভাস্কর্যটি আবিষ্কৃত হয় ১৯২৬ সালে, মোহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক খননে। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে অবস্থিত মোহেঞ্জোদারো ছিল প্রাচীন সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম প্রধান নগর। সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা, উন্নত স্থাপত্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য যে সভ্যতা আজও বিস্ময়ের জন্ম দেয়; সে সভ্যতার শিল্পদক্ষতার অন্যতম পরিচয় হয়ে আছে এ ব্রোঞ্জমূর্তি। এটি আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৭০০ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে নির্মিত বলে ধরা হয়। বর্তমানে ভাস্কর্যটি ভারতের নয়াদিল্লির জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রথম দেখায় ভাস্কর্যটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় তার শরীরী ভঙ্গি। দুই পা সামান্য ফাঁক করে দাঁড়িয়ে থাকা তরুণীর শরীরের ভার সমানভাবে দুই পায়ে নেই। একটি পায়ের ওপর ভর বেশি। এক হাত কোমরের কাছে ভাঁজ করা, অন্য হাত নিচের দিকে নেমে এসেছে। মাথা সামান্য উঁচু, মুখে যেন এক ধরনের নির্ভার আত্মবিশ্বাস। দীর্ঘ চুল ঘাড়ের কাছে গুছিয়ে বাঁধা। দুই হাতে রয়েছে চুড়ি, তবে অলংকারের বিন্যাসও অসম। বাম হাতে রয়েছে অনেক বেশি চুড়ি, ডান হাতে তুলনামূলক কম। গলায়ও আছে অলংকার।
সমসাময়িক গবেষক ও শিল্প-ইতিহাসবিদদের একটি অংশ সেই পুরোনো ব্যাখ্যাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, শুধু শরীরের অবস্থান দেখে তাকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা খুব সরলীকৃত ব্যাখ্যা হতে পারে। কেউ কেউ তার দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গির কারণে তাকে যোদ্ধা হিসেবেও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আবার অলংকার, বয়স, সামাজিক অবস্থান কিংবা পরিচয়ের সঙ্গে তার ভিন্ন কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হয়
আর এ ভঙ্গিই তাকে ‘ড্যান্সিং গার্ল’ নামে পরিচিতি দিয়েছে। ভাস্কর্যটি আবিষ্কারের পর এর দেহভঙ্গিকে নৃত্যের সঙ্গে তুলনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘নৃত্যরত তরুণী’ পরিচয়টি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে, আজ এটি শিল্পকর্মটির স্থায়ী নাম হয়ে গেছে। কিন্তু এখানেই রয়েছে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—একটি ভাস্কর্যের ভঙ্গি দেখে কি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব, সে নাচছে?
সমসাময়িক গবেষক ও শিল্প-ইতিহাসবিদদের একটি অংশ সেই পুরোনো ব্যাখ্যাকে নতুন করে ভাবতে শুরু করেছেন। তাদের মতে, শুধু শরীরের অবস্থান দেখে তাকে নৃত্যশিল্পী হিসেবে চিহ্নিত করা খুব সরলীকৃত ব্যাখ্যা হতে পারে। কেউ কেউ তার দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গির কারণে তাকে যোদ্ধা হিসেবেও ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন। আবার অলংকার, বয়স, সামাজিক অবস্থান কিংবা পরিচয়ের সঙ্গে তার ভিন্ন কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হয়। অর্থাৎ ‘ড্যান্সিং গার্ল’ নামটি পরিচিত হলেও, সে আসলে কে ছিল তার কোনো চূড়ান্ত জবাব এখনো নেই।
এ অনিশ্চয়তার সবচেয়ে বড় কারণ সিন্ধু সভ্যতার ভাষা ও লিপি। হরপ্পা সভ্যতার বহু সিলমোহর ও নিদর্শনে চিহ্ন পাওয়া গেলেও সে লিপি এখনো পুরোপুরি পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে ভাস্কর্যটির পাশে এমন কোনো লেখা নেই, যেখানে বলা আছে—সে একজন নৃত্যশিল্পী, কোনো ধর্মীয় চরিত্র কিংবা সমাজের বিশেষ কোনো শ্রেণীর প্রতিনিধি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের তাই ভাস্কর্যটির উপাদান, ভঙ্গি, অলংকার এবং একই সময়ের অন্য নিদর্শনের সঙ্গে তুলনা করেই তার পরিচয় সম্পর্কে ধারণা তৈরি করতে হয়েছে।
তবে পরিচয় নিয়ে বিতর্কের বাইরেও ‘ডান্সিং গার্ল’-এর গুরুত্বপূর্ণ অন্য একটি কারণে, এর নির্মাণপ্রযুক্তি। এটি ব্রোঞ্জের তৈরি এবং নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘লস্ট-ওয়াক্স’ বা মোম গলিয়ে ছাঁচ তৈরির কৌশল। এ পদ্ধতিতে প্রথমে মোম দিয়ে তৈরি করা হয় কাঙ্ক্ষিত অবয়ব। পরে সেটিকে মাটির আবরণে ঢেকে উত্তপ্ত করা হয়। তাপে ভেতরের মোম গলে বেরিয়ে গেলে সেখানে তৈরি হয় একটি ফাঁপা ছাঁচ। এরপর সেই ছাঁচে গলিত ধাতু ঢালা হয়। সেটি ঠান্ডা ও শক্ত হয়ে গেলে বাইরের মাটির আবরণ ভেঙে বেরিয়ে আসে চূড়ান্ত ভাস্কর্য।
ভাস্কর্যটি আবিষ্কৃত হয় ১৯২৬ সালে, মোহেঞ্জোদারোর প্রত্নতাত্ত্বিক খননে। বর্তমানে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে অবস্থিত মোহেঞ্জোদারো ছিল প্রাচীন সিন্ধু বা হরপ্পা সভ্যতার অন্যতম প্রধান নগর। সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা, উন্নত স্থাপত্য ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য যে সভ্যতা আজও বিস্ময়ের জন্ম দেয়; সে সভ্যতার শিল্পদক্ষতার অন্যতম পরিচয় হয়ে আছে এ ব্রোঞ্জমূর্তি
শুনতে সহজ মনে হলেও কয়েক হাজার বছর আগে এ প্রযুক্তি ছিল অত্যন্ত জটিল। এর জন্য প্রয়োজন ছিল ধাতু গলানোর দক্ষতা, উপযুক্ত সংকর ধাতু তৈরির জ্ঞান এবং ছাঁচ তৈরির সূক্ষ্ম কারিগরি। সিন্ধু সভ্যতার ধাতুশিল্পীরা তামার সঙ্গে টিন মিশিয়ে ব্রোঞ্জ তৈরি করতেন। বিভিন্ন নিদর্শন থেকে এটাও বোঝা যায়, ধাতুর বৈশিষ্ট্য পরিবর্তনে বিভিন্ন উপাদানের ব্যবহার সম্পর্কে তাদের বাস্তব জ্ঞান ছিল। ফলে ‘ড্যান্সিং গার্ল’ শুধু শিল্পের নিদর্শন নয়, এটি প্রাচীন দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
ভাস্কর্যটির শিল্পমূল্যও এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সিন্ধু সভ্যতা থেকে পাওয়া অধিকাংশ মানবাকৃতির ভাস্কর্য বা মূর্তি সাধারণত পোড়ামাটির। ধাতব মানবমূর্তি তুলনামূলক বিরল। আবার নারী ভাস্কর্যগুলোর অনেকগুলোয় পোশাক বা কোমরবন্ধের উপস্থিতি দেখা গেলেও ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর অবয়ব আলাদা। তার দীর্ঘ হাত-পা, নগ্ন দেহ এবং স্বাভাবিক শরীরী ভঙ্গি তাকে অন্যগুলো থেকে পৃথক করেছে। এ পার্থক্যের অর্থ কী, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। নগ্নতা কি যৌবনের প্রতীক? নাকি সামাজিক অবস্থানের? ধর্মীয় বা আচারসংক্রান্ত কোনো অর্থ ছিল? নাকি শিল্পীর কাছে এটি ছিল কেবল মানবদেহকে উপস্থাপনের একটি নান্দনিক পদ্ধতি? প্রমাণের সীমাবদ্ধতায় এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনুমানের মধ্যেই রয়ে গেছে।
অলংকারও ভাস্কর্যটির রহস্যকে আরো গভীর করে। বাম হাতজুড়ে চুড়ির আধিক্য এবং ডান হাতে তুলনামূলক কম অলংকার হয়তো কেবল সৌন্দর্যের জন্য ছিল না। এটি সামাজিক মর্যাদা, পেশা, পরিচয় বা কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক রীতির ইঙ্গিতও হতে পারে। কিন্তু নিশ্চিতভাবে কিছু বলার সুযোগ নেই। কারণ প্রত্নতত্ত্বে পাওয়া একটি বস্তু কখনো কখনো যতটা তথ্য দেয়, তার চেয়েও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।
এ প্রশ্নগুলোর কারণেই হয়তো ‘ড্যান্সিং গার্ল’ এত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কোনো রাজা বা বিজয়ীর ভাস্কর্য নয়। কোনো বিশাল মন্দিরের অংশও নয়। মাত্র কয়েক ইঞ্চি উচ্চতার একটি মানবমূর্তি। তবু তার মধ্যে ধরা আছে এক প্রাচীন নগরসভ্যতার শিল্পবোধ। তার শরীরের ভঙ্গিতে রয়েছে চলনের ইঙ্গিত, অলংকারে রয়েছে রুচির প্রকাশ এবং ব্রোঞ্জের গঠনে রয়েছে উন্নত প্রযুক্তির সাক্ষ্য।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, চার হাজার বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সে তরুণী যেন আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই। আমরা তার নাম জানি না। জানি না তার বয়স, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান। এমনকি নিশ্চিত নই, সে সত্যিই নাচছিল কিনা। কিন্তু তার অজানা পরিচয়ই হয়তো তাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সে এক হারানো সভ্যতার নীরব কণ্ঠস্বর—যে সভ্যতার ভাষা আমরা এখনো পুরোপুরি পড়তে পারিনি, কিন্তু যার শিল্প আমাদের সঙ্গে হাজার বছর পরও কথা বলে চলেছে।