চিঠির দিন, চিঠির অর্থনীতি

১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশের ডাকঘরগুলোয় প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার সাধারণ নিবন্ধিত চিঠি বুক হয়েছিল। একই বছরে মানি অর্ডার বুক হয় প্রায় ৩৪ লাখ ২৬ হাজার। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে সাধারণ নিবন্ধিত চিঠির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার এবং মানি অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ ৮২ হাজার। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নিবন্ধিত চিঠির সংখ্যা নেমে ৫ কোটিতে ঠেকে

একসময় দূরে থাকা স্বজনের সংবাদ আসত খামে ভরে। খামের ওপর সযত্নে বসানো থাকত ডাকটিকিট, ভেতরে প্রিয়জনের হাতের লেখা। পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টি ছিল প্রিয়জনের ডাকের মতো মধুর, অপেক্ষা থাকত দূরদেশে থাকা স্বজনের চিঠির। ই-মেইল, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং ও ডিজিটাল চ্যাটিংয়ের যুগে এ দৃশ্য এখন অনেকটাই নস্টালজিয়ার অংশ, সাহিত্যের অনুসঙ্গ। অথচ এ আবেগের আড়ালে ছিল বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা—চিঠিকে ঘিরে ছিল বিস্তৃত ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি।

বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত চিঠি শুধু যোগাযোগের মাধ্যম ছিল না; এর সঙ্গে যুক্ত ছিল কাগজ, খাম, ছাপাখানা, স্টেশনারি, ডাক পরিবহন ও নানা ধরনের সেবার একটি দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল। প্রাপকের হাতে পৌঁছানোর আগে একটি চিঠি পেরিয়ে যেত বহু মানুষের হাত।

পুরান ঢাকার বাংলাবাজার, চকবাজার ও আশপাশের এলাকাও একসময় এ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল। চিঠির খাম, প্যাড, লেটারহেডসহ নানা ধরনের কাগজপণ্য তৈরিতে কাজ করত ছোট ছোট প্রেস। কাটিং, ডাইস, ভাঁজ ও আঠা দিয়ে খাম তৈরির কাজেও যুক্ত ছিলেন বহু শ্রমিক। ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে এসব এলাকায় চিঠির খাম ও কাগজপণ্য তৈরি ঘিরে গড়ে উঠেছিল ক্ষুদ্র শিল্পখাত।

খাম ছিল এ বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। সাধারণ বাদামি বা সাদা খাম থেকে শুরু করে অফিসের লেটারহেড, রঙিন খাম কিংবা একসময় জনপ্রিয় এয়ারমেইল খাম—ব্যবহারভেদে ছিল নানা ধরন। প্রতিটি খামের লাভ হয়তো ছিল সামান্য, কিন্তু চিঠির বিপুল ব্যবহারের কারণে সে সামান্য লেনদেনই তৈরি করেছিল বড় বাজার। শহর ও গ্রামের স্টেশনারি দোকানগুলোর দৈনিক নগদ প্রবাহেও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ছিল।

‘‌চিঠি অর্থনীতি’র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল ডাকটিকিট। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম আটটি ডাকটিকিট প্রকাশিত হয় ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই। কলকাতায় আটটি ডাকটিকিটের একটি মিন্ট সেটের মূল্য ছিল ২১ টাকা ৮০ পয়সা; যুক্তরাজ্যে সেটটি বিক্রি হয়েছিল ১ দশমিক ০৯ পাউন্ডে। প্রথম দিনেই যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি ডাকটিকিট বিক্রি ছিল ২৩ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি।

ডাকটিকিটের গুরুত্ব অবশ্য ডাকমাশুলে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিটগুলোর নকশায় দেশের মানচিত্র, মুক্তিযুদ্ধ, গণহত্যা, জাতীয় পতাকাসহ স্বাধীনতা সংগ্রামের নানা প্রতীক উঠে আসে। ফলে এগুলো ধীরে ধীরে ইতিহাসের দলিল ও সংগ্রহের সামগ্রীতে পরিণত হয়। এর সঙ্গে গড়ে ওঠে সংগ্রাহক ও ফিলাটেলিস্টদের আলাদা একটি অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক। একই সঙ্গে ডাকটিকিট, পোস্টকার্ড ও খাম বিক্রি ছিল ডাক বিভাগের আয়ের প্রত্যক্ষ উৎস। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ডাক বিভাগের মোট আয়ের বড় অংশই এ ধরনের ডাকসামগ্রী বিক্রি থেকে আসত।

চিঠির ব্যবহার কতটা বিস্তৃত ছিল, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর স্ট্যাটিসটিকস ইয়ারবুক অব বাংলাদেশ ২০১০ থেকে। ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরে দেশের ডাকঘরগুলোয় প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার সাধারণ নিবন্ধিত চিঠি বুক হয়েছিল। একই বছরে মানি অর্ডার বুক হয় প্রায় ৩৪ লাখ ২৬ হাজার। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে সাধারণ নিবন্ধিত চিঠির সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৪৯ লাখ ৪৫ হাজার এবং মানি অর্ডারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ ৮২ হাজার। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে নিবন্ধিত চিঠির সংখ্যা নেমে ৫ কোটিতে ঠেকে। বর্তমান পরিস্থিতির জীবন্ত উদাহরণ আমাদের লেখা চিঠির সংখ্যা!

সত্তরের দশক থেকে নব্বই দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যপ্রবাসী কিংবা শহরে কাজ করা মানুষদের গ্রামের বাড়িতে টাকা পাঠানোর প্রধান বৈধ মাধ্যমগুলোর একটি ছিল ডাক মানি অর্ডার। এ সেবা থেকে ডাক বিভাগ ১ দশমিক ৫ থেকে ২ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন মাশুল পেত, যা ছিল ডাক বিভাগের অন্যতম বড় আয়ের উৎস। গ্রামে পাঠানো এ অর্থ স্থানীয় বাজারে খাদ্য, পোশাক, শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা মেটাতে ব্যবহৃত হতো। ফলে ডাকঘরের মাধ্যমে প্রেরিত মানি অর্ডারের সঙ্গে যুক্ত ছিল স্থানীয় অর্থনীতির নিয়মিত ক্যাশ-ফ্লো।

চিঠির অর্থনীতির সামাজিক ও অর্থনৈতিক চিত্র দেখা যেত গ্রামীণ হাট-বাজার ও পোস্ট অফিসের বারান্দায়। যাদের নিজের হাতে চিঠি লেখার সুযোগ ছিল না, তাদের হয়ে লিখে দিতেন পেশাদার চিঠি লেখকেরা বা কাতিবরা। কেউ প্রিয়জনের কাছে খবর পাঠাতেন, কেউ চাকরির আবেদন লিখিয়ে নিতেন, আবার কেউ বিদেশে থাকা স্বজনকে জানাতেন পরিবারের খবর। ডাকঘরের বাইরে কাঠের বাক্স, মোড়া বা ছোট টেবিল পেতে বসা এসব মানুষ ছিলেন এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক সেবাখাতের কর্মী।

আশ্চর্যের বিষয়, আধুনিক যুগেও পেশাটি পুরোপুরি ইতিহাসও হয়ে যায়নি। ডাক বিভাগের বর্তমান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও ‘লেটার রাইটার’ সেবার উল্লেখ রয়েছে। দরখাস্ত, আবেদন ও সরকারি চিঠিপত্র লেখার জন্য প্রশিক্ষিত লেটার রাইটারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। অর্থাৎ চিঠির ব্যবহার কমে গেলেও এ পেশার প্রয়োজনের কিছু অংশ এখনো টিকে আছে।

তবে নব্বইয়ের দশকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে থাকে। ই-মেইল ও এসএমএস যোগাযোগের ধরন পাল্টে দেয়। পরে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় মানি অর্ডারের প্রয়োজনও কমে যায়। এর ফলে চিঠি ও মানি অর্ডারনির্ভর রাজস্ব আয় ৯০ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান পাওয়া গেছে। একসময় উদ্বৃত্ত আয় করা প্রতিষ্ঠান ডাক বিভাগও পরবর্তী সময়ে পরিচালন ঘাটতির মুখে পড়ে।

এর প্রভাব শুধু খাম, কাগজ বা স্টেশনারির বাজারেই পড়েনি; বদলে গেছে ডাক বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মীদের কাজের ধরনও। একসময় পোস্ট অফিসের দৈনন্দিন ব্যস্ততার বড় অংশজুড়ে থাকত চিঠি বাছাই, নথিভুক্ত করা, ডাকপিয়নের মাধ্যমে নির্দিষ্ট ঠিকানায় পৌঁছে দেয়া এবং পোস্টমাস্টারের নেতৃত্বে পুরো ডাক কার্যক্রম পরিচালনা। চিঠির সংখ্যা কমার সঙ্গে সঙ্গে ডাকপিয়নের হাতে পৌঁছানো চিঠির বান্ডিলও ছোট হতে থাকে। অনেক জায়গায় ডাকপিয়নের ঐতিহ্যগত চিঠি বিলির কাজের পরিমাণ কমে যায়, আর পোস্ট অফিসগুলোকে ধীরে ধীরে পার্সেল, ডাক সঞ্চয়, সরকারি সেবা ও অন্যান্য নতুন ধরনের কার্যক্রমের দিকে যেতে হয়। ফলে ‘চিঠি বিলি করা ডাকপিয়ন’ কিংবা চিঠিকেন্দ্রিক পোস্টমাস্টারের পরিচিত কর্মজগতও ক্রমে হারিয়ে যেতে থাকে।

এ পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল চিঠিকে ঘিরে থাকা ছোট ছোট পেশায়। খাম তৈরির কারিগর, কাগজ ও স্টেশনারি বিক্রেতা, ছোট প্রেসের শ্রমিক কিংবা ডাকঘরের আশপাশে বসা কাতিব—অনেকের কাজের জায়গা বদলে যায়। কেউ অন্য পেশায় চলে যান, কেউ ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেন। কেউ হয়তো একই জায়গায় বসে দেখেছেন, ক্রেতার হাতে কাগজের বদলে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে মোবাইল ফোন।

তবে অর্থনীতির নিয়মে একটি বাজার হারিয়ে গেলে তার জায়গায় আরেকটি বাজার তৈরি হয়। চিঠির জায়গা অনেকটাই নিয়েছে ই-কমার্স লজিস্টিকস, কুরিয়ার ও পার্সেল ডেলিভারি সার্ভিস। যোগাযোগের কাগজ বদলে গেছে ডিজিটাল বার্তায়, টাকা পাঠানোর খাম বদলে গেছে মোবাইল লেনদেনে। কিন্তু কাগজ, কালি, খাম, ডাকটিকিট ও পোস্ট অফিসকে কেন্দ্র করে যে ক্ষুদ্র অর্থনীতি একসময় শহর ও গ্রামের হাজারো মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন তা কেবলই গল্প।

আরও