‘কিস অব ডেথ’: লিপস্টিকের রঙিন ইতিহাসে বিষের ছায়া

উজ্জ্বল বেগুনি বা গাঢ় লাল আভা আনতে সে সময়ের কিছু লিপস্টিকে ব্যবহার করা হতো ব্রোমিন, আয়োডিন ও সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান। তখন কেউ জানত না, এসব ধাতু ধীরে ধীরে শরীরে জমে মারাত্মক অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই ইতিহাসে সেই লিপস্টিকই পরিচিতি পায় ‘কিস অব ডেথ’—মৃত্যুর চুম্বন নামে

ঠোঁটে একটুখানি রঙ। কখনও টকটকে লাল, কখনও হালকা গোলাপি, কখনও বা গাঢ় বাদামি। সাজগোজের জগতে লিপস্টিক শুধু একটি প্রসাধনী নয়; অনেকের কাছে এটি আত্মবিশ্বাস, ব্যক্তিত্ব আর নিজেকে প্রকাশের অন্যতম ভাষা। অথচ ইতিহাসের একসময় এ লিপস্টিকই পরিচিত ছিল ‘কিস অব ডেথ’ বা ‘মৃত্যুর চুম্বন’ নামে।

লিপস্টিকের ইতিহাস খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হয় প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগের মেসোপটেমিয়ায়। প্রাচীন উর নগরের প্রভাবশালী শাসক কুইন পু-আবি ঠোঁট রাঙাতেন সাদা সিসা ও গুঁড়া করা লাল পাথরের মিশ্রণে তৈরি এক ধরনের ওষ্ঠরঞ্জক দিয়ে। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে তার সমাধিসহ বহু সুমেরীয় অভিজাতের কবর থেকে ককল নামে পরিচিত সামুদ্রিক ঝিনুকের খোলসে সংরক্ষিত ঠোঁটের রঙ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ ঠোঁটের রঙ শুধু দৈনন্দিন সাজের অনুষঙ্গ ছিল না, মৃত্যুর পরের জীবনেও প্রয়োজন হবে—এমন বিশ্বাসও ছিল তাদের।

পরবর্তী সময়ে মেসোপটেমিয়ার নারীরা মূল্যবান রত্ন গুঁড়া করে ঠোঁট রাঙাতে শুরু করেন। এতে লিপস্টিক সাধারণ প্রসাধনী থেকে বিলাসিতা ও সামাজিক মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়। এ সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে প্রাচীন মিশরে। রঙ দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী রাখতে লাল অকার নামের খনিজ রঞ্জক কখনো একা, কখনো রেজিন বা আঠালো পদার্থের সঙ্গে মিশিয়ে ঠোঁটে লাগানো হতো। শুধু লাল নয়, কমলা, ম্যাজেন্টা, নীল ও কালো ঠোঁটের রঙও সে সময় জনপ্রিয় ছিল।

কিন্তু সৌন্দর্যের এ ইতিহাসের আছে অন্ধকার অধ্যায়ও। উজ্জ্বল বেগুনি বা গাঢ় লাল আভা আনতে সে সময়ের কিছু লিপস্টিকে ব্যবহার করা হতো ব্রোমিন, আয়োডিন ও সিসার মতো বিষাক্ত উপাদান। তখন কেউ জানত না, এসব ধাতু ধীরে ধীরে শরীরে জমে মারাত্মক অসুস্থতা এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তাই ইতিহাসে সেই লিপস্টিকই পরিচিতি পায় ‘কিস অব ডেথ’—মৃত্যুর চুম্বন নামে।

এ সময়েই মিসরের কিংবদন্তি রানি ক্লিওপেট্রা তুলনামূলক নিরাপদ ও আরো আকর্ষণীয় লাল রঙের সন্ধান শুরু করেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি কারমাইন রঞ্জক ব্যবহার করতেন এবং ঠোঁটে ঝিলমিল আভা আনতে কখনো মাছের আঁশও মিশিয়ে নিতেন।

আধুনিক যুগেও অবশ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ‘‌ক্যাম্পেইন ফর সেফ কসমেটিকস’ কয়েকটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের লিপস্টিকে সিসার উপস্থিতির তথ্য প্রকাশ করে। পরে ২০১১ সালে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন প্রায় ৪০০টি লিপস্টিক পরীক্ষা করে বিভিন্ন মাত্রায় সিসার অস্তিত্ব খুঁজে পান। যদিও সংস্থাটি জানিয়েছিল, ওই মাত্রা স্বাভাবিক ব্যবহারে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে না।

তবে গবেষকদের উদ্বেগ সেখানেই শেষ হয়নি।ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ক্যাথারিন হ্যামন্ডের নেতৃত্বে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় শুধু সিসাই নয়, ক্যাডমিয়াম, অ্যালুমিনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ক্রোমিয়াম, কোবাল্ট, কপার ও নিকেলের মতো আরো কয়েকটি ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে আসে। গবেষকদের ভাষ্য, লিপস্টিক ব্যবহারে তাৎক্ষণিক কোনো বিপদ না থাকলেও প্রতিদিন বহুবার ব্যবহার করলে অল্প অল্প করে এসব ধাতু শরীরে জমতে পারে। বিশেষ করে যারা দিনে ১৫-২০ বার বা তারও বেশি লিপস্টিক ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে আরো গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

অবশ্য প্রসাধনী শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, এসব ধাতুর পরিমাণ খুবই কম এবং অনেক ক্ষেত্রেই এগুলো কাঁচামালের স্বাভাবিক দূষণ হিসেবে আসে। তবু বিজ্ঞানীদের মতে, যেহেতু কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম ধাতুযুক্ত পণ্য তৈরি করতে পারছে, তাই ভবিষ্যতে আরো নিরাপদ উৎপাদন সম্ভব।

এ কারণে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও খুব সাধারণ। শিশুদের খেলনা হিসেবে লিপস্টিক ব্যবহার করতে না দেয়া, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বারবার ব্যবহার না করা এবং মানসম্মত ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের প্রসাধনী বেছে নেয়াই সবচেয়ে নিরাপদ অভ্যাস।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিবিএস নিউজ থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও