স্টোনহেঞ্জের রহস্যময় পাথরটি কীভাবে এসেছিল, মিলেছে নতুন ব্যাখ্যা

নতুন গবেষণা বলছে, প্রায় ছয় টন ওজনের পাথরটির পুরো যাত্রা মানুষ টেনে বা বহন করে সম্পন্ন করেনি। বরং বরফযুগের হিমবাহ প্রথমে পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে অনেকটা দক্ষিণে নিয়ে এসেছিল, পরে মানুষ সেটিকে স্টোনহেঞ্জে পৌঁছে থাকতে পারে

ইংল্যান্ডের উইল্টশায়ারে অবস্থিত প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো প্রাগৈতিহাসিক পাথুরে স্থাপনা স্টোনহেঞ্জ। বিশাল পাথরের এই বৃত্তাকার স্থাপনাটি কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল এবং এর পাথরগুলো এত দূর থেকে কীভাবে আনা হয়েছিল, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য রয়েছে। এবার স্টোনহেঞ্জের সবচেয়ে রহস্যময় পাথরগুলোর একটি ‘অল্টার স্টোন’ কীভাবে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বর্তমান স্থানে পৌঁছেছিল, তার নতুন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণা বলছে, প্রায় ছয় টন ওজনের পাথরটির পুরো যাত্রা মানুষ টেনে বা বহন করে সম্পন্ন করেনি। বরং বরফযুগের হিমবাহ প্রথমে পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে অনেকটা দক্ষিণে নিয়ে এসেছিল, পরে মানুষ সেটিকে স্টোনহেঞ্জে পৌঁছে থাকতে পারে।

শেফিল্ড হ্যালাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রেমি ভেনেস এবং অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-রসায়নবিদ অ্যান্থনি ক্লার্কের গবেষণায় এ সম্ভাবনা উঠে এসেছে। অল্টার স্টোনের ভূতাত্ত্বিক উৎস উত্তর-পূর্ব স্কটল্যান্ডের অরকেডিয়ান বেসিনে, যা স্টোনহেঞ্জ থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে। পাথরটি প্রায় চার মিটার দীর্ঘ এবং ওজন প্রায় ছয় টন।

স্টোনহেঞ্জের বহু পাথর স্থানীয়ভাবে পাওয়া গেলেও কয়েকটি ‘ব্লুস্টোন’ দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আনা হয়েছিল। অল্টার স্টোন এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে দূর থেকে আসা পাথর। গবেষকদের মূল প্রশ্ন ছিল, চাকা আবিষ্কারের আগের মানুষ এত ভারী একটি পাথর এত দীর্ঘ পথ কীভাবে নিয়ে এসেছিল।

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গবেষকেরা একটি নতুন কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করেন। মডেলটি বরফযুগে হিমবাহ কীভাবে পাথর ও শিলাখণ্ড এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে বহন করত, তা পুনর্গঠন করে। প্রায় ১৫ হাজার বছর আগে শেষ বরফযুগের শেষ দিকে উত্তর ব্রিটেনের বড় অংশ পুরু বরফে ঢাকা ছিল। সেই বরফ ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে বিপুল পাথর ও ধ্বংসাবশেষ বহন করত।

গবেষণার ফল বলছে, অরকেডিয়ান বেসিনের পাথর হিমবাহের সঙ্গে দক্ষিণে সরে গিয়ে বর্তমান উত্তর সাগরের নিচে থাকা ডগার ব্যাংক এলাকায় পৌঁছাতে পারে। বর্তমানে জায়গাটি সমুদ্রের নিচে থাকলেও হাজার হাজার বছর আগে এটি ছিল ডগারল্যান্ড নামের বিস্তৃত স্থলভাগের অংশ।

ডগার ব্যাংক একসময় হিমবাহের বহন করা পাথর জমার বড় এলাকা ছিল। সেখানে হিমবাহের ফেলে যাওয়া বিভিন্ন ধরনের বড় শিলাখণ্ড ছড়িয়ে থাকতে পারে। গবেষকদের ধারণা, নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ এসব অস্বাভাবিক পাথরের মধ্যে অল্টার স্টোনটিকে আলাদাভাবে বেছে নিয়ে থাকতে পারে।

সে সময়ের মানুষ পাথরের ধরন ও ব্যবহার সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান রাখত বলে প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ রয়েছে। তারা বিভিন্ন কাজের জন্য নির্দিষ্ট ধরনের পাথর বেছে নিত। ফলে ডগার ব্যাংকে পৌঁছানো অল্টার স্টোনটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে তাদের নজরে পড়ে থাকতে পারে।

এরপর জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরফ গলতে শুরু করে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে। ডগারল্যান্ড ধীরে ধীরে প্লাবিত হতে থাকে। প্রায় আট থেকে নয় হাজার বছর আগে অঞ্চলটির বড় অংশ পানির নিচে চলে যায়। কোনো কোনো গবেষণা বলছে, কিছু অংশ সাত হাজার বছর আগেও পানির ওপরে থাকতে পারে।

এই প্লাবনও পাথরটি সরানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। ডগারল্যান্ড ডুবে যাওয়ার আগে স্থানীয় মানুষ হয়তো পাথরটিকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছিল। পরে কয়েক ধাপে সেটি ইংল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে পৌঁছায়।

পাথরটি একবার পূর্ব ইংল্যান্ডে পৌঁছে গেলে সেখান থেকে মানুষ সেটিকে বর্তমান স্যালিসবারি সমভূমিতে নিয়ে যেতে পারে। গবেষকেরা বলছেন, এ পথ আগের ধারণার তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত। সে সময় পূর্ব-পশ্চিমমুখী যাতায়াতের জন্য বার্কশায়ার রিজওয়ে নামে পরিচিত একটি প্রাচীন পথ ব্যবহৃত হতো, যা স্যালিসবারি সমভূমির দিকে নিয়ে যায়।

গবেষণাটি তাই অল্টার স্টোনের যাত্রার একটি যৌথ ব্যাখ্যা দিচ্ছে—প্রথম ধাপে প্রকৃতি, দ্বিতীয় ধাপে মানুষ। অর্থাৎ হিমবাহ পাথরটিকে স্কটল্যান্ড থেকে অনেকটা দক্ষিণে নামিয়ে এনে থাকতে পারে, আর পরে নব্যপ্রস্তর যুগের মানুষ সেটিকে কয়েকশ কিলোমিটার সরিয়ে স্টোনহেঞ্জে নিয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, এ ব্যাখ্যা শুধু স্টোনহেঞ্জের নির্মাণ রহস্য নয়, সে সময়ের মানুষের সক্ষমতা সম্পর্কেও নতুন ধারণা দেয়। তারা শুধু বড় পাথর সরানোর মতো সংগঠন ও শ্রমশক্তি রাখত না, পরিবেশের পরিবর্তনও বুঝতে পারত এবং প্রয়োজন হলে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারত।

আরও