হলিউডের পর্দায় স্পার্টানদের আমরা দেখি একদল অদম্য যোদ্ধা হিসেবে—হাতে বর্শা, পিঠে ঢাল, চোখে মৃত্যুকে উপহাস করার দৃষ্টি। বিশেষ করে জ্যাক স্নাইডারের 300 মুক্তির পর স্পার্টাকে ঘিরে এক ধরনের পৌরাণিক আবহ গড়ে উঠেছে; যেন তারা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে শক্তিশালী, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং নিখুঁত যোদ্ধা জাতি।
কিন্তু বাস্তবের স্পার্টাদের ইতিহাস পর্দার সেই বীরত্বগাথার চেয়েও বেশ জটিল ছিল। তারা নিঃসন্দেহে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিল, কিন্তু একই সঙ্গে তাদের সমাজ ছিল কঠোর, ভীতিনির্ভর এবং অমানবিক। তাদের বীরত্বের ভিত্তি নির্মিত হয়েছিল শৃঙ্খলা, দমন, দাসপ্রথা এবং মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করার এক নির্মম সামাজিক ব্যবস্থার ওপর।
প্রাচীন গ্রিসের অন্যান্য নগর-রাষ্ট্র যখন শিল্প, দর্শন, সাহিত্য ও বাণিজ্যে নিজেদের সমৃদ্ধ করছিল, স্পার্টা তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পথ বেছে নিয়েছিল। তাদের রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল যুদ্ধের জন্য নিবেদিত এমন এক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে নাগরিকের পরিচয় নির্ধারিত হবে তার যুদ্ধদক্ষতা দিয়ে।
এ লক্ষ্য পূরণের প্রস্তুতি শুরু হতো জন্মের পর থেকেই; অন্তত প্রচলিত বর্ণনা তাই বলে। বহুল প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, কোনও নবজাতককে দুর্বল বা শারীরিকভাবে অক্ষম মনে হলে প্রবীণদের একটি পরিষদ সিদ্ধান্ত নিত তাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে কি না। অনুপযুক্ত বিবেচিত শিশুদের তাইগেতোস পর্বতের পাদদেশে ‘আপোথেটাই’ নামে পরিচিত একটি খাদে ফেলে দেওয়া হতো। তবে এই কাহিনীর ঐতিহাসিক ভিত্তি নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে। এর প্রধান উৎস রোমান যুগের লেখক প্লুটার্ক। তিনি ঘটনাগুলোর প্রায় ছয় থেকে সাত শতাব্দী পরে এই বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। অথচ তার আগে কিংবা সমসাময়িক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদদের—হেরোডোটাস বা থুকিডিডিস—কেউই এমন কোনও প্রথার উল্লেখ করেননি।
প্লুটার্কের আবক্ষ ভাস্কর্য। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স
আরো তাৎপর্যপূর্ণ একটি বিষয় আছে। এথেন্স মেডিকেল ফ্যাকাল্টির নৃতত্ত্ববিদ থিওডোরোস পিতসিওসের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে ওই খাদ থেকে অন্তত ৪৬টি কঙ্কাল উদ্ধার করা হলেও দেখা যায় এর কোনেটিই নবজাতকের নয়। সবগুলোই আঠারো থেকে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের। ফলে অনেক গবেষকের ধারণা, স্থানটি সম্ভবত অপরাধী বা রাষ্ট্রদ্রোহীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য ব্যবহৃত হতো। সে কারণে দুর্বল শিশুকে খাদে নিক্ষেপের গল্পটিকে আধুনিক ইতিহাসবিদদের একটি বড় অংশ কিংবদন্তি বা অতিরঞ্জিত বর্ণনা বলেই মনে করেন।
গল্প সত্য হোক বা না-হোক, যেসব শিশু বড় হয়ে উঠত, তাদের জন্য অপেক্ষা করত আরো কঠোর বাস্তবতা। সাত বছর বয়সে স্পার্টান ছেলেদের পরিবার থেকে আলাদা করে পাঠানো হতো আগোগে নামে পরিচিত রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায়। সেখানে শুধু অস্ত্র চালানো নয়, শেখানো হতো ক্ষুধা সহ্য করা, শীত সহ্য করা, কষ্ট সহ্য করা এবং নিঃশর্তভাবে আদেশ মানা।
প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবেই তাদের ইচ্ছাকৃতভাবে অল্প খাবার দেয়া হতো, যাতে তারা চুরি করতে বাধ্য হয়। কিন্তু ধরা পড়লে শাস্তি ছিল নির্মম। স্পার্টানদের বিচারে চুরি করা অপরাধ নয়, ধরা পড়াটাই অপরাধ। নৈতিক শিক্ষা নয় বরং কৌশল, ধৈর্য ও দক্ষতা বৃদ্ধি করাই ছিল এই প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য।
এই কঠোরতার স্পষ্ট ছাপ তাদের দৈনন্দিন জীবনেও ছিল। শিশুদের ঘুমানোর জন্য নরম বিছানা দেয়া হতো না; নদীর ধারে জন্মানো খড় বা গাছের পাতা দিয়ে তারা নিজেরাই বিছানা বানাত। বছরের পর বছর তাদের খালি পায়ে হাঁটতে হতো, পুরো একটি ঋতু কাটাতে হতো একই পোশাকে। আর্তেমিস অর্থিয়ার মন্দিরে কিশোরদের প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত করার রীতিও প্রচলিত ছিল, যাতে তারা শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করার অভ্যাস অর্জন করে।
‘থ্রি হান্ড্রেড’ সিনেমার দৃশ্য। ছবি: ওনিট
স্পার্টান সমাজে দুর্বলতা ছিল এক ধরনের সামাজিক অপরাধ। সেখানে কান্না, ভয় কিংবা কোমলতার প্রকাশকে অপমানজনক বলে বিবেচনা করা হতো। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের শেখানো হতো—যুদ্ধে মৃত্যু সম্মানের, কিন্তু পালিয়ে বেঁচে ফেরা লজ্জার। এ মানসিকতার প্রতীক হিসেবে একটি বিখ্যাত উক্তি আজও প্রচলিত আছে। বলা হয়, স্পার্টান মায়েরা সন্তানকে যুদ্ধে পাঠানোর সময় বলতেন, ‘ঢাল নিয়ে ফিরে এসো, নয়তো ঢালের ওপর শুয়ে ফিরে এসো।’ তবে এই উক্তির ঐতিহাসিক সত্যতাও প্রশ্নাতীত নয়। এর উৎসও সেই প্লুটার্ক, যিনি ঘটনাগুলোর বহু শতাব্দী পরে লিখেছিলেন। তাই কোনও নির্দিষ্ট স্পার্টান মা সত্যিই এমন কথা বলেছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করে বলার উপায় নেই। সম্ভবত এটি পরবর্তী সময়ে স্পার্টান আদর্শকে প্রতীকীভাবে প্রকাশ করার জন্যই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবু এর মধ্য দিয়ে সেই সমাজের মূল্যবোধ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ব্যক্তির জীবনের চেয়ে রাষ্ট্রের সামরিক গৌরব ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই সামরিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পেছনে আরেকটি বাস্তবতা ছিল, যা জনপ্রিয় কাহিনীতে প্রায়ই আড়াল হয়ে যায়, আর তা হচ্ছে দাসপ্রথা। স্পার্টার অর্থনীতির ভিত্তি ছিল হেলট নামে পরিচিত বিপুলসংখ্যক দাস। তারাই জমিতে চাষ করত, খাদ্য উৎপাদন করত, গৃহস্থালির কাজ সামলাত এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামো সচল রাখত। ফলে স্পার্টান নাগরিকরা জীবিকার চিন্তা ছাড়াই সারাজীবন যুদ্ধবিদ্যার অনুশীলনে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারত। কিন্তু সংখ্যায় হেলটরা স্পার্টানদের চেয়ে অনেক বেশি ছিল বলে বিদ্রোহের আশঙ্কা সবসময় তাদের তাড়া করত। এই ভয় থেকেই জন্ম নেয় ‘ক্রিপ্টেইয়া’ নামের এক ভয়াবহ প্রথা, যেখানে তরুণ স্পার্টানদের রাতের অন্ধকারে পাঠানো হতো সন্দেহভাজন হেলটদের হত্যা করার জন্য—যে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল দাসদের মনে স্থায়ী ভয় জিইয়ে রাখা। প্রাচীন উৎস এই প্রথার কথা বলে গেলেও এটি ঠিক কতটা নিয়মিত বা ব্যাপকভাবে অনুসরণ করা হতো, তা নিয়ে আধুনিক ইতিহাসবিদদের মধ্যেও কিছুটা মতভেদ রয়েছে।
এই একই সামরিক প্রয়োজনীয়তা স্পার্টান নারীদের জীবনেও ছাপ ফেলেছিল। স্পার্টানদের বিশ্বাস ছিল, শক্তিশালী নারীই শক্তিশালী যোদ্ধার জন্ম দিতে পারে। তাই অন্যান্য গ্রিক নগর-রাষ্ট্রের তুলনায় স্পার্টান নারীরা তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা ভোগ করতেন। তারা সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন, খেলাধুলায় অংশ নিতেন, এমনকি প্রকাশ্যেও মতামত দেওয়ার সুযোগ পেতেন। তবে এই স্বাধীনতার ভিত্তি ছিল সামরিক প্রয়োজন, মানবিকতা নয়। রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি বজায় রাখার প্রয়োজন থেকেই নারীদের এই বিশেষ অবস্থান তৈরি হয়েছিল।
স্পার্টার সামরিক খ্যাতির সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রতীক নিঃসন্দেহে থার্মোপাইলির যুদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮০ সালে পারস্য সম্রাট জারক্সেসের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে রাজা লিওনিডাসের নেতৃত্বে ৩০০ স্পার্টান যোদ্ধার আত্মত্যাগ ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। তবে জনপ্রিয় সংস্কৃতির মতো বাস্তব ঘটনাটি এত সরল ছিল না। সেই যুদ্ধে লিওনিডাসের সঙ্গে কেবল ৩০০ স্পার্টানই ছিলেন না; আরও কয়েক হাজার গ্রিক যোদ্ধা এই প্রতিরোধে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু চলচ্চিত্র ও কিংবদন্তির আলোয় তাদের অবদান অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে।
লিওনিদাসের ভাস্কর্য। ছবি: আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম, স্পার্টা
একইভাবে স্পার্টানদের অপরাজেয় ভাবমূর্তিও পুরোপুরি বাস্তবসম্মত নয়। তারা বহু গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে বিজয়ী হলেও পুরোপুরি অজেয় ছিল না। সময়ের পরিক্রমায় একসময় তারা দুর্বল জাতিতে পরিণত হয় যার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সমাজব্যবস্থার অনমনীয়তা। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা, অর্থনৈতিক পরিবর্তন কিংবা সামাজিক রূপান্তরের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তাদের একেবারেই ছিল না।
অন্যদিকে এথেন্সের মতো নগর-রাষ্ট্র শিল্প, দর্শন, গণতন্ত্র, শিক্ষা ও বাণিজ্যের ওপর ভর করে ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। স্পার্টা যুদ্ধ জিততে শিখেছিল, কিন্তু পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে শেখেনি।
আজকের জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে স্পার্টা মূলত এক বীরত্বের প্রতীক। কিন্তু ইতিহাসে স্পার্টানদের সাহস ছিল, সেই সাহসের পাশে ছিল ভয়; শৃঙ্খলা ছিল, কিন্তু তার সঙ্গে ছিল দমন; গৌরব ছিল, কিন্তু সেই গৌরব টিকে ছিল দাসত্ব ও নির্মমতার ওপর।
তাই স্পার্টার ইতিহাসকে শুধু বীরত্বের কাহিনী হিসেবে দেখলে ছবির অর্ধেকটাই দেখা হয়। বাকি অর্ধেক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনও সমাজ যখন শক্তিকে একমাত্র আদর্শে পরিণত করে, তখন তার মূল্য দিতে হয় মানুষের স্বাধীনতা, সহমর্মিতা এবং মানবিকতাকেই।