মশার রক্তপ্রীতিতে লুকিয়ে মানুষের প্রাচীন গল্প

মশার রুচি বদল আর হোমো ইরেক্টাসের বসতি

মশাদের এ পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ ছিল সে অঞ্চলে আদি মানুষের উপস্থিতি। আর এ আদি মানুষদের বলা হয় হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus)। এরা হলো প্রায় ২ মিলিয়ন থেকে ১ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের একটি বিলুপ্ত ও প্রাচীন প্রজাতি।

মশা আমাদের কাছে বিরক্তির কারণ হলেও, ছোট্ট এ পতঙ্গটিই মানুষের প্রাচীন ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিচ্ছে। ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মশার খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ভেতর লুকিয়ে আছে মানুষের বিবর্তন ও পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু মশার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা খুঁজে দেখেছেন, কবে থেকে মশা মানুষের রক্ত খাওয়া শুরু করে। গবেষণাটি গত মাসে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ম্যালেরিয়া বহনকারী কিছু মশা প্রায় ২৯ থেকে ১৬ লক্ষ বছর আগে তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলায়।

মশাদের এ পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ ছিল সে অঞ্চলে আদি মানুষের উপস্থিতি। আর এ আদি মানুষদের বলা হয় হোমো ইরেক্টাস (Homo erectus)। এরা হলো প্রায় ২ মিলিয়ন থেকে ১ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীতে বেঁচে থাকা মানুষের একটি বিলুপ্ত ও প্রাচীন প্রজাতি।

মজার বিষয় হলো, মশা কিন্তু শুরু থেকেই মানুষের রক্ত খেয়েই জীবনধারণ করতো না। মানুষের জন্মের অনেক আগে থেকেই পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব ছিল। তখন তারা বেঁচে থাকার জন্য মূলত অন্য প্রাণীর রক্তের ওপরেই নির্ভর করত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পরিবেশ বদলাতে থাকে, আর সে সঙ্গে বদলায় মশার খাদ্যাভ্যাসও।

সাধারণত মানুষের প্রাচীন ইতিহাস জানতে বিজ্ঞানীরা ফসিল বা পুরোনো ডিএনএ ব্যবহার করেন। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো গরম ও আর্দ্র অঞ্চলে এসব দেহাবশেষ খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সেখানে এত প্রাচীন সময়ের তথ্য পাওয়া কঠিন। আর এ জায়গাতেই মশার ডিএনএ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। গবেষকদের মতে, যেখানে মানুষের কোনো চিহ্ন থাকে না, সেখানে মশার ভেতর সেই ইতিহাসের ছাপ রয়ে যায়।

এ গবেষণার মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে, ‘হোমো ইরেক্টাস’ প্রজাতির আদি মানুষ অনেক আগে থেকেই অঞ্চলটিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। তাদের উপস্থিতি এতটাই বেশি ছিল যে তা মশার আচরণ ও বিবর্তনকে প্রভাবিত করেছে।

এদিকে, গবেষণার কাজটিও ছিল চ্যালেঞ্জে ভরপুর। কারণ ১৯৯২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে মশার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এজন্য গবেষকদের নমুনা সংগ্রহ করতে কখনো গাছের ওপর রাত কাটাতে হয়েছে, কখনো বা আবার মানুষের গায়ে ভিড় করা মশা সহজেই ধরা পড়েছে। পরে মোট ৩৮ প্রজাতির মশার ডিএনএ বিশ্লেষণ করে এ ফলাফল পাওয়া গেছে।

প্রায় ২০ লক্ষ বছর আগে জলবায়ুর পরিবর্তনে বন কমে গিয়ে তৃণভূমি তৈরি হতে থাকে। তখন আদি মানুষ এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সঙ্গে মশার সামনে নতুন খাদ্যের উৎস তৈরি হয়। তখন তারা ধীরে ধীরে মানুষের রক্তের দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, শুধু মশাই নয়, মানুষের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য ক্ষুদ্র প্রাণীর ডিএনএতেও লুকিয়ে আছে আমাদের অতীতের গল্প। সেই গল্পগুলো ধীরে ধীরে সামনে আসছে, যা মানুষের বিবর্তন বোঝার নতুন পথ দেখাচ্ছে।

—সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও