স্ট্রেস কমাতে চুইংগাম: বিজ্ঞাপন নাকি বিজ্ঞান?

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনীর রেশনেও চুইংগাম যুক্ত করা হয়, ক্ষুধা কমানো, দাঁত পরিষ্কার রাখা এবং স্নায়ুচাপ সামলানোর যুক্তিতে। যুদ্ধ শেষে সৈন্যদের হাত ধরেই এটি পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সংকটগুলোর একটি ছিল ’গ্রেট ডিপ্রেশন’। সে সময় হাজার হাজার ব্যবসা ধ্বংস হয়ে গেলেও একজন উদ্যোক্তার ব্যবসা থামেনি, তিনি ছিলেন উইলিয়াম উইগলি জুনিয়র। তার প্রতিষ্ঠিত চুইংগাম সাম্রাজ্য থেকেই জন্ম নেয় জনপ্রিয় ব্র্যান্ড যেমন ‘জ্যুসি ফ্রুট’ এবং ‘স্পেয়ারমিন্ট’।

বিশ শতকের শুরুতে চুইংগাম শুধু মুখের দুর্গন্ধ দূর করার উপকরণই ছিল না, বরং বিজ্ঞাপনে একে তুলে ধরা হতো মানসিক প্রশান্তির উপায় হিসেবেও। ১৯১৮ সালের এক বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছিল, চুইংগাম স্নায়ুকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। তখন অনেকেই এটিকে এক ধরনের সহজ 'মনের ওষুধ' হিসেবে ভাবতে শুরু করেছিলেন।

সময়ের সঙ্গে সেই ধারণা হারিয়ে যায়নি। চুইংগাম শুধু মুখের জন্য নয়, মনের জন্যও উপকারী হতে পারে। মজার বিষয় হলো ১৯১৮ সালের দিকে, উইগলির বিজ্ঞাপনগুলো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল না। কিন্তু আধুনিক গবেষণা বলছে, তার ধারণায় কিছু সত্যতা ছিল। বিভিন্ন পরীক্ষায় দেখা গেছে, নিয়মিত চুইংগাম চিবানো মানুষের মনোযোগ ও সতর্কতা কিছুটা বাড়াতে পারে এবং চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

চুইংগামের ইতিহাস বিস্ময়করভাবে প্রাচীন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় প্রায় আট হাজার বছর পুরনো বার্চ গাছের রস দিয়ে তৈরি চিবানোর বস্তু খুঁজে পেয়েছেন। প্রাচীন গ্রিক, মায়া ও আমেরিকার আদিবাসীরাও গাছের রস থেকে তৈরি আঠালো পদার্থ চিবাতেন। আধুনিক চুইংগামের পথচলা শুরু হয় উনিশ শতকের মাঝামাঝি, যখন মেক্সিকোর এক নির্বাসিত রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে আনা ‘চিকল’ নামের গাছের রস দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে চুইংগাম তৈরি শুরু হয়।

চুইংগামকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলতে বড় ভূমিকা রাখে যুদ্ধও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মার্কিন সেনাবাহিনীর রেশনেও চুইংগাম যুক্ত করা হয়, ক্ষুধা কমানো, দাঁত পরিষ্কার রাখা এবং স্নায়ুচাপ সামলানোর যুক্তিতে। যুদ্ধ শেষে সৈন্যদের হাত ধরেই এটি পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

আধুনিক বিজ্ঞানীরা এখনো খুঁজে দেখছেন, চুইংগাম কীভাবে মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। একটি ব্যাখ্যা হলো, চিবানোর সময় মুখের পেশি সক্রিয় হয় এবং মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কিছুটা বাড়তে পারে, যা মনোযোগ ধরে রাখতে সাহায্য করে। অন্য একটি ধারণা হলো, এই পুনরাবৃত্তিমূলক ক্রিয়া মানুষের মনকে বাইরের চাপ বা উদ্বেগ থেকে সাময়িকভাবে সরিয়ে রাখে।

আরও একটি আকর্ষণীয় দৃষ্টিভঙ্গি হলো “ফিজেটিং”, অর্থাৎ অজান্তে বারবার ছোট কোনো নড়াচড়া করা। যেমন অনেকেই চিন্তা করার সময় পা নাচান, কলম টোকান বা স্ট্রেস বল চাপেন। চুইংগাম সেই একই প্রবণতারই একটি রূপ, যা মনোযোগ ধরে রাখতে বা চাপ কমাতে সাহায্য করে।

চুইংগাম হয়তো কোনো অলৌকিক ওষুধ নয়। কিন্তু ছোট্ট একটি অভ্যাস হিসেবে এটি মানুষের মনকে সামান্য হলেও সতেজ ও স্থির রাখতে পারে। হাজার বছরের ইতিহাস পেরিয়ে আজও তাই চুইংগাম মানুষের জীবনে টিকে আছে।

আরও