নারীর ভালোবাসা বলতে আমরা সচরাচর বুঝি ‘সমর্পণ’। আমাদের এ আধুনিক সমাজেও প্রচলিত ধারণা তা-ই বলে। কিন্তু আজ জানব এমন এক নারীর গল্প, যাকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু বশ মানানো যায় না। যার কাছে স্বাধীনতা ভালোবাসার বিপরীত নয়, বরং ভালোবাসারি আরেক রূপ। পৌরাণিক চরিত্র লিলিথ সেই নারীরই এক প্রতীক।
বিদ্রোহের শুরুটা যেখানে
লিলিথের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক কিন্তু তার বিদ্রোহ নয়, বরং বিদ্রোহের কারণ। যুগে যুগে লিলিথের গল্প মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়েছে। আধুনিক পাঠে তিনি এমন এক নারী, যিনি সম্পর্কের ভেতর অসমতা মেনে নিতে অস্বীকার করেন। তার ‘না’ তাই নিছক অবাধ্যতা নয়, এটি নিজের অবস্থান, ইচ্ছা ও পরিচয়ের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি।
এ জায়গাতেই লিলিথ একটি বৃহত্তর প্রতীকে পরিণত হন। কারণ নারীর স্বাধীনতার ইতিহাসে সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি সবসময় ছিল-‘একজন নারী নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত কতটা নিজে নিতে পারবেন?’
সমাজ তাকে নানা পরিচয় দিয়েছে—কন্যা, স্ত্রী, মা, সঙ্গী। কিন্তু সেই পরিচয়গুলোর বাইরে তিনি কে, সেই প্রশ্নটি বহুদিন অবহেলিত থেকেছে। লিলিথের বিদ্রোহ সেই প্রশ্নটিই সামনে আনে- 'কাউকে ভালোবাসার আগে একজন নারী কি নিজের কাছে স্বাধীনভাবে একজন মানুষ হতে পারবেন না?'
ভালোবাসা বনাম অধিকার
লিলিথকে শুধু বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে দেখলে তার সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক দিকটি বাদ পড়ে যায়-তা হলো ভালোবাসা। অনেকেই মনে করেন বিদ্রোহী নারী মানেই ভালোবাসার বিপরীত। কিন্তু লিলিথ ছিলেন ভালোবাসার নামে আধিপত্যের বিপরীত। আধুনিক সম্পর্কেও পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ আর ‘তাই তোমার ওপর আমার অধিকার আছে’-দুটি বাক্যের মধ্যে একটি বিপজ্জনক দূরত্ব রয়েছে।
নারীর স্বাধীনতা কি একা হয়ে যাওয়া?
এখানে লিলিথের আধুনিক ব্যাখ্যায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। বিদ্রোহ মানেই সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান নয়। স্বাধীনতা মানেই একা থাকা নয়। বরং একজন নারী একই সঙ্গে স্বাধীন এবং ভালোবাসাপ্রবণ হতে পারেন। আধুনিক নারীর সামনে তাই আসল দ্বন্দ্ব ‘সম্পর্ক না স্বাধীনতা’ নয়। দ্বন্দ্ব হলো— সম্পর্কের ভেতর থেকেও স্বাধীন থাকা যায় কিনা।
একজন নারী কাউকে গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেন, তার ওপর নির্ভরও করতে পারেন, অথচ নিজের সিদ্ধান্ত, স্বপ্ন, বন্ধুত্ব, পেশা কিংবা ব্যক্তিসত্তার ওপর অধিকার ধরে রাখতে পারেন। লিলিথও ঠিক তাই বলেছিল- দুজন মানুষ পরস্পরের জীবনের অংশ হবেন, কিন্তু কেউ কারও সম্পূর্ণ পরিচয় হয়ে উঠবেন না।
লিলিথের বিদ্রোহ আজ কোথায়?
আজকের নারী যখন নিজের পেশাকে গুরুত্ব দেন, নিজের শরীর ও পোশাক নিয়ে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন, অসম্মানজনক সম্পর্ক প্রত্যাখ্যান করেন, ‘না’ বলতে শেখেন কিংবা ভালোবাসার মধ্যেও নিজের ব্যক্তিগত পরিসর দাবি করেন— সেখানে লিলিথের প্রতীকী উত্তরাধিকারকে নতুনভাবে পড়া যায়। তবে এটিকে সরাসরি ‘লিলিথের প্রভাব’ বলা ইতিহাসগতভাবে সরলীকরণ হবে। বরং বলা যায়, লিলিথের মতো সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলো সময়ের সঙ্গে নতুন অর্থ।
লিলিথ: একাকীত্বের নয়, আত্মমর্যাদার প্রতীক
লিলিথের গল্প তাই আজকের নারীর কাছে কেবল বিদ্রোহের গল্প নয়। এটি ভালোবাসার ভেতর নিজের অস্তিত্ব রক্ষার গল্প। তিনি বারবার মনে করিয়ে দেন-একজন নারীকে শক্তিশালী হতে ভালোবাসাহীন হতে হয় না। তাকে একা হতে হয় না। তাকে কাউকে প্রত্যাখ্যান করতেই হবে, এমনও নয়। বরং সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানটি হল— ভালোবাসব, কিন্তু নিজেকে হারাব না। সম্পর্কে থাকব, কিন্তু নিজের সত্তা বিসর্জন দেব না। তোমাকে বেছে নেব, কিন্তু নিজের বিরুদ্ধে গিয়ে নয়। কারণ শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা মানে একা থাকা নয়। স্বাধীনতা হলো, কাউকে ভালোবেসেও নিজের ওপর নিজের অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা।