এল নিনোর প্রভাব

হঠাৎ উধাও আটলান্টিক মহাসাগরের হ্যারিকেন!

ঝড়ের সংখ্যা, বাতাসের তীব্রতা এবং স্থায়ীত্ব পরিমাপকারী সূচকে আটলান্টিক মহাসাগরের সামগ্রিক ঝড়ের মাত্রা রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত হ্যারিকেন গবেষক ফিল ক্লটজবাখ জানান, চলতি বছরের এ সময় পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড়ের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৫০ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন মাত্রা।

এল নিনোর প্রভাবে আটলান্টিক মহাসাগরে হ্যারিকেন তৈরির অনুকূল পরিবেশ নেই। চলতি বছর এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো হ্যারিকেন তৈরি হয়নি। তৈরি হয়েছে মাত্র পাঁচটি তুলনামূলক দুর্বল ও স্বল্পস্থায়ী গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড়। সাধারণত বছরের এ সময়ে আটলান্টিকে হ্যারিকেনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু এবার ঝড়ের তৎপরতা নেমে গেছে রেকর্ড পরিমাণে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হ্যারিকেন সেন্টারের আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও কর্মকর্তাদের মতে, আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড়ের এই দীর্ঘ নীরবতা তাদের বেশ অবাক করেছে। এই ঘটনা কয়েক দশকের পুরোনো আবহাওয়ার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করে জানিয়েছেন, এল নিনোর প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে সৃষ্ট প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড় তৈরি হতে পারছে না। উপকূলে আঘাত হানার মতো শক্তিশালী হওয়ার আগেই এগুলো ধসে পড়ছে।

আটলান্টিকের রেকর্ড শান্ত আবহাওয়া

আবহাওয়া উপাত্ত পর্যালোচনা করে আবহাওয়াবিদেরা জানিয়েছেন, স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের ইতিহাসে ২০২৬ সাল একটি নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে। বায়ুর গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৪ মাইল বা ১১৯ কিলোমিটারে পৌঁছালে কোনো ঝড়কে সাধারণত হ্যারিকেন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চলতি মৌসুমে এত দীর্ঘ সময় ধরে এমন গতিসম্পন্ন কোনো ঝড় দেখতে পাওয়া যায়নি।

আমেরিকার সরকারি ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের আবহাওয়াবিদ নিক নোভেল্লা জানান, ১৯৫০ সালের আগের কয়েক বছরে অবশ্য এ রকম কিছু ঘটনার তথ্য রয়েছে। তবে সেই সময়ের মহাসাগরীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ ছিল না। ফলে আধুনিক বিজ্ঞানীরা তৎকালীন হিসাবগুলোকে খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে করেন না।

অন্যদিকে, ঝড়ের সংখ্যা, বাতাসের তীব্রতা এবং স্থায়ীত্ব পরিমাপকারী সূচকে আটলান্টিক মহাসাগরের সামগ্রিক ঝড়ের মাত্রা রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটির বিখ্যাত হ্যারিকেন গবেষক ফিল ক্লটজবাখ জানান, চলতি বছরের এ সময় পর্যন্ত আটলান্টিক মহাসাগরে ঝড়ের উপস্থিতি স্বাভাবিক মাত্রার মাত্র ৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ১৯৫০ সালের পর এটিই সর্বনিম্ন মাত্রা।

এল নিনোর প্রভাবে প্রতিকূল পরিবেশ

প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবরেখা অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত উষ্ণ হওয়াকে এল নিনো বলা হয়। জলবায়ুর এ সাময়িক পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে আবহাওয়াকে নতুন রূপ দেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আটলান্টিক মহাসাগর শান্ত থাকার পেছনে মূল কারণ হলো এ শক্তিশালী এল নিনো।

নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবানির বায়ুমণ্ডলীয় বিজ্ঞানের অধ্যাপক ক্রিস্টেন করবোসিয়ারো জানান, বর্তমানে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির মতো কোনো অনুকূল পরিবেশ নেই। তিনি বলেন, এখানে কোনো নিম্নচাপ তৈরি হতে গেলেই তা মূলত তিনটি বাধার মুখে পড়ছে। প্রথমত, শক্তিশালী বাতাস ঝড়ের অগ্রভাগকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত, শুষ্ক বাতাস ঝড়ের আর্দ্রতা শুষে নিচ্ছে। আর তৃতীয়ত, বায়ুমণ্ডলের নিম্নমুখী চাপ ঝড়কে ওপরের দিকে উঠতে দিচ্ছে না।

এল নিনোর কারণে সার্বিয়ার পেট্রোভারাদিনে দানিউব নদীর পানি কমে যাওয়ায় শুকনো ডাঙ্গায় কয়েকটি নৌকা পড়ে আছে।

এসব উপাদানের মধ্যে বাতাসের তীব্রতম তারতম্য বা ‘উইন্ড শেয়ার’ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিকর ভূমিকা রাখছে। এর ফলে নিম্নস্তরে বাতাস একদিকে এবং ওপরের স্তরে অন্যদিকে প্রবাহিত হলে ঝড়ের কাঠামো ভেঙে যায়। ফলে একটি ঝড় শক্তিশালী হওয়ার আগেই দুর্বল হয়ে পড়ে। পশ্চিম আফ্রিকা থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের মধ্যবর্তী যে বিশাল এলাকায় স্বাভাবিক সময়ে শক্তিশালী হ্যারিকেন তৈরি হয়, সেখানে এখন স্বাভাবিকের চেয়ে ঘণ্টায় ৪৫ মাইল বেশি বেগে বাতাস প্রবাহিত হচ্ছে। মায়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ব্রায়ান ম্যাকনোল্ডি বলেন, চরম এ বায়ুমণ্ডলীয় বল বা শক্তি ঝড়গুলোকে তৈরি হওয়ার আগেই একেবারে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।

শুষ্ক বাতাস, ধুলাবালি ও সমুদ্রের তাপমাত্রা

বায়ুপ্রবাহের পাশাপাশি আফ্রিকা থেকে ভেসে আসা ধূলাবালি এবং শুষ্ক বাতাসও ঝড় তৈরির প্রক্রিয়াকে বাধা দিচ্ছে। এর বাইরে আটলান্টিক অঞ্চলের উচ্চ বায়ুমণ্ডলীয় চাপ বাতাসকে নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, ফলে মেঘ তৈরি হয়ে ঝড়ে রূপ নেয়ার প্রক্রিয়া বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে।

গবেষকরা জানান, বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানি টানা ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে রেকর্ড উষ্ণ রয়েছে। সাধারণত সমুদ্রের অতিরিক্ত উষ্ণ পানি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। তবে আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, পানির এ তাপমাত্রাকে পেছনে ফেলে এল নিনোর বায়ুমণ্ডলীয় প্রভাব এখন অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির (এমআইটি) আবহাওয়াবিজ্ঞানের অধ্যাপক কেরি ইমানুয়েল জানান, সমুদ্রের পানি ও ওপরের বাতাসের তাপমাত্রার পার্থক্য ক্রান্তীয় ঝড়ের মূল শক্তি। এল নিনোর প্রভাবে সাগরের পানির তুলনায় ওপরের বাতাস খুব দ্রুত গরম হয়ে উঠেছে। পানির সঙ্গে বাতাসের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ার কারণে বাতাস সমুদ্র থেকে প্রয়োজনীয় তাপ শক্তি সংগ্রহ করতে পারছে না। ফলে আটলান্টিক মহাসাগরে বড় কোনো ঝড়ের দেখা মিলছে না।

প্রশান্ত মহাসাগরে উল্টো চিত্র ও ভবিষ্যতের ঝুঁকি

চলতি মৌসুমে আটলান্টিক মহাসাগর শান্ত থাকলেও আবহাওয়াবিদরা সাধারণ মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটি মাত্র শক্তিশালী হ্যারিকেনও বড় ধরনের ধ্বংস ডেকে আনার জন্য যথেষ্ট। উদাহরণ হিসেবে গবেষকেরা ১৯৯২ সালের কথা মনে করিয়ে দেন, যখন শান্ত একটি মৌসুমের শেষ দিকে এসে টহ্যারিকেন অ্যান্ড্রু’ মার্কিন উপকূলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল।

বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মেক্সিকো উপসাগরের দিকে নজর রাখছেন, কারণ এ অঞ্চলে বাতাসের বিপরীতমুখী প্রভাব আটলান্টিকের চেয়ে কিছুটা কম। শরতের শেষের দিকে এ এলাকায় শক্তিশালী ঝড় তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্যদিকে, গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, আগামী বছর এল নিনোর প্রভাব কমে গেলে আটলান্টিকের উষ্ণ পানি আগের মতোই থেকে যাবে। এর ফলে আগামী বছর আটলান্টিক মহাসাগরে অস্বাভাবিক মাত্রায় হ্যারিকেনের আগমন ঘটতে পারে।

এদিকে প্রশান্ত মহাসাগরে ঠিক এর বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। আর্দ্র বাতাস এবং অনুকূল পরিবেশের কারণে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরির হার স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে ১৬টি এবং মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে ২০টি সামুদ্রিক ঝড়ের নাম দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে দুটি ঝড় সরাসরি আঘাত হেনেছে। বিজ্ঞানীরা আগেই এল নিনোর কারণে আটলান্টিক মহাসাগরে কম ঝড়ের আভাস দিয়েছিলেন, তবে আটলান্টিক মহাসাগর এতটা শান্ত হয়ে পড়বে তা কেউ ধারণা করতে পারেনি।

— এপি অবলম্বনে

আরও