সমুদ্রে উষ্ণতা বৃদ্ধির তথ্য দিচ্ছে কোষ্ঠকাঠিন্যে ভোগা কচ্ছপটি

লজারহেড কচ্ছপ পৃথিবীর সাতটি সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজাতির একটি এবং অনেক অঞ্চলে এটি বিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। এরা প্রায় ৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে, দৈর্ঘ্যে ১ দশমিক ২ মিটার পর্যন্ত বড় হয় এবং ওজন ১৮০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত জীবনের অনেক বছর সমুদ্রে কাটিয়ে পরে জন্মস্থানে ফিরে এসে ডিম পাড়ে

ভীষণ ক্লান্ত অবস্থায় সিডনির টারোঙ্গা চিড়িয়াখানায় পৌঁছায় বুলওয়াল বিলিমা (বিবি)। গুরুতর কোষ্ঠকাঠিন্য ও পানিশূন্যতায় ভুগছিল ছোট্ট কচ্ছপটি। ইউইন জনগোষ্ঠীর ধুরগা ভাষায় বুলওয়াল বিলিমার অর্থ ‘মজবুত কচ্ছপ’। মাত্র ১১০ গ্রাম ওজনের লজারহেড হ্যাচলিংটি আকার ছিল সাবানের টুকরোর মতো ছোট। বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছিল। আর খুদে প্রাণিটি হয়ে উঠেছে সামুদ্রিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও এর প্রভাব পরিমাণের এক নমুনা।

গত বছরের এপ্রিলে অস্ট্রেলিয়ার বোদেরি ন্যাশনাল পার্ক থেকে কচ্ছপ ছানাটিকে উদ্ধার করা হয়। এলাকাটি লজারহেড কচ্ছপের স্বাভাবিক ডিম ফোটার অঞ্চল থেকে অনেক দক্ষিণে। ধারণা করা হচ্ছে, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী স্রোতের কারণে এটি পথ হারিয়ে এত দক্ষিণে চলে এসেছিল। ঠাণ্ডা পানিতে খাবারের অভাব ও দুর্বলতার কারণে কচ্ছপটি অসুস্থ হয়ে পড়ে।

উদ্ধারের পর কয়েকদিন স্কুইড, সার্ডিন ও সামুদ্রিক ভিটামিন খাওয়ানোর পর বিবি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠে। শীতকালে উপকূলীয় পানি খুব ঠাণ্ডা থাকায় তাকে হিটেড পুনর্বাসন পুলে রাখা হয়।

একটি স্যাটেলাইট ট্র্যাকার বসিয়ে গত মাসে সিডনির প্রায় ৭০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত লর্ড হো আইল্যান্ড থেকে বিবিকে আবার সমুদ্রে ছেড়ে দেয়া হয়।

সংরক্ষণবিদদের কাছে এটি শুধু একটি কচ্ছপকে বাঁচানোর ঘটনা নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঘটনাটি দেখাচ্ছে যে সমুদ্র উষ্ণ হয়ে উঠলে সামুদ্রিক প্রাণীরা তাদের স্বাভাবিক বিচরণ এলাকা বদলে ফেলতে পারে।

গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ইস্ট অস্ট্রেলিয়ান কারেন্ট ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে এবং উষ্ণ জল দক্ষিণ দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ফলে এতদিন কুইন্সল্যান্ড অঞ্চলে বেশি দেখা গেলেও লজারহেড কচ্ছপসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রাণী এখন নিউ সাউথ ওয়েলস উপকূলে বেশি দেখা যাচ্ছে।

এ পরিবর্তন বোঝার জন্য টারোঙ্গা চিড়িয়াখানার বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং ও নতুন ট্যাগিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। পুনর্বাসিত এবং বন্য কচ্ছপের গতিপথ রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করে তারা জানতে চাইছেন, ভবিষ্যতে কচ্ছপরা কোন পথে চলাচল করবে এবং নতুন কোন অভিবাসন পথ সংরক্ষণের প্রয়োজন হতে পারে।

লজারহেড কচ্ছপ পৃথিবীর সাতটি সামুদ্রিক কচ্ছপ প্রজাতির একটি এবং অনেক অঞ্চলে এটি বিপন্ন হিসেবে বিবেচিত। এরা প্রায় ৮০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে, দৈর্ঘ্যে ১ দশমিক ২ মিটার পর্যন্ত বড় হয় এবং ওজন ১৮০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে। সাধারণত জীবনের অনেক বছর সমুদ্রে কাটিয়ে পরে জন্মস্থানে ফিরে এসে ডিম পাড়ে।

সমুদ্রে অবমুক্ত হচ্ছে বিবি। ছবি: টারোঙ্গা কনজারভেশন সোসাইটি

টারোঙ্গার সংরক্ষণ কর্মকর্তা ফিবি মিয়াঘার বলেন, দক্ষিণ দিকে এ স্থানান্তর নতুন সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। নিউ সাউথ ওয়েলসে এখন অনেক কচ্ছপ ডিম পাড়ছে, যা আগে খুব কম দেখা যেত। ভবিষ্যতে কচ্ছপ সংরক্ষণের পরিকল্পনায় এ পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ।

কচ্ছপের ডিম থেকে বাচ্চা পুরুষ না স্ত্রী হবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করে বালির তাপমাত্রার ওপর—ঠান্ডা বালিতে সাধারণত পুরুষ এবং গরম বালিতে স্ত্রী কচ্ছপ জন্মায়। তাই নতুন এলাকায় গেলে বালি ও সমুদ্রের তাপমাত্রার পার্থক্য লিঙ্গের ভারসাম্য ও বেঁচে থাকার হারকে প্রভাবিত করতে পারে।

এছাড়া সমুদ্রের স্রোত পরিবর্তিত হলে কচ্ছপ নতুন আবাসস্থলে চলে যেতে পারে, যেখানে নতুন রোগের ঝুঁকি বা মানুষের কর্মকাণ্ডের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।

বিবির পুনর্বাসনের সময় টারোঙ্গা ওয়াইল্ডলাইফ হসপিটালের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা কিম্বার্লি ভিনেট হারিন সমুদ্রের তাপমাত্রা ও খাবারের অবস্থা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।

তার ভাষায়, ‘আমরা বিবিকে খুব ঠান্ডা পানিতে ছেড়ে দিতে চাইনি। কচ্ছপের জন্য সাধারণত ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা দরকার, যাতে তারা ভালোভাবে টিকে থাকতে পারে।’

বর্তমানে নিউ সাউথ ওয়েলস উপকূলে প্রায় ২১টি কচ্ছপকে ট্র্যাক করছেন টারোঙ্গার গবেষকরা। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট তথ্য বলছে, সমুদ্রে ছাড়ার পর বিবি পূর্ব অস্ট্রেলীয় স্রোতে ঢুকে পড়েছে এবং উত্তর–দক্ষিণে চলাচল শুরু করেছে।

বিজ্ঞানীদের আশা, এসব তথ্য ভবিষ্যতে সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকা নির্ধারণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কচ্ছপের অভিবাসন বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও