ফিফা বিশ্বকাপ বনাম বাবা ভাঙ্গার পূর্বাভাস, সত্যিটা কী?

১৯৯৬ সালে তার মৃত্যু হয়। সাধারণত এখানেই একটি মানুষের গল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাবা ভাঙ্গার ক্ষেত্রে ঘটল ঠিক উল্টোটা। মৃত্যুর পর যেন আরো বড় হয়ে উঠল তার কিংবদন্তি। পৃথিবীতে যখনই কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে, তখনই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে তার নাম

এই মুহূর্তে ফুটবলপ্রেমীরা ব্যস্ত নিজে দলের হিসাব-নিকাশে। কে হবে চ্যাম্পিয়ন? কোন দল চমকে দেবে? কোন তারকা লিখবেন নতুন ইতিহাস? প্রত্যেক বিশ্বকাপের আগে ঠিক এমন সময়ে ইন্টারনেটে ঝড় তুলতে থাকে আরেকটি আলোচনা।

আলোচনা লিওনেল মেসিকে নিয়ে নয়। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকেও নিয়ে নয়। দল, কোচ বা ফুটবলারকেও নিয়ে নয়। বরং এমন একজন নারীকে নিয়ে, যিনি প্রায় তিন দশক আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। অনেকের দাবি তিনি নাকি অনেক আগেই বিশ্বকাপ সম্পর্কে কিছু বলে গিয়েছিলেন। ফিফা ছাড়াও তিনি আরো বলেছিলেন, কিছুদিনের মধ্যে মানবজাতি এমন কিছুর মুখোমুখি হবে, যা বদলে দিতে পারে ইতিহাসের গতিপথ। আর এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন একজন অন্ধ নারী। তার নাম বাবা ভাঙ্গা।

গল্পের শুরু অবশ্য ফুটবল দিয়ে নয়। গল্পের শুরু বুলগেরিয়ার একটি ছোট্ট গ্রামে। সাল ১৯১১। সেখানেই জন্ম নিয়েছিলেন ভ্যাঙ্গেলিয়া পানদেভা গুশতেরোভা। পরবর্তীতে যাকে পুরো পৃথিবী চিনেছে বাবা ভাঙ্গা নামে। শৈশবে তিনি ছিলেন আর দশজন সাধারণ শিশুর মতোই। কিন্তু তারপর এক ঘটনা তার জীবনকে চিরদিনের জন্য বদলে দেয়। জনশ্রুতি আছে, এক ভয়ংকর ঝড়ে তিনি ছিটকে পড়েন অনেক দূরে। পরে তাকে উদ্ধার করা হলেও তার চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন দৃষ্টিশক্তি। আর সেখান থেকেই শুরু হয় রহস্য।

চারদিকে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে, চোখের আলো হারানোর পর তিনি নাকি পেয়েছেন অন্য এক ক্ষমতা। ভবিষ্যৎ দেখার ক্ষমতা। প্রথমে বিষয়টি ছিল স্থানীয় কৌতূহল। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা অঞ্চলে। তারপর পুরো দেশে। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসতে শুরু করল তার কাছে। কেউ জানতে চায় নিজের ভাগ্য। কেউ জানতে চায় সন্তানের ভবিষ্যৎ। কেউ জানতে চায় আগামীকাল কী ঘটবে। ধীরে ধীরে বাবা ভাঙ্গা পরিণত হলেন পূর্ব ইউরোপের সবচেয়ে আলোচিত রহস্যময় ব্যক্তিত্বদের একজন।

১৯৯৬ সালে তার মৃত্যু হয়। সাধারণত এখানেই একটি মানুষের গল্প শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাবা ভাঙ্গার ক্ষেত্রে ঘটল ঠিক উল্টোটা। মৃত্যুর পর যেন আরো বড় হয়ে উঠল তার কিংবদন্তি। পৃথিবীতে যখনই কোনো বড় ঘটনা ঘটেছে, তখনই যেন নতুন করে ফিরে এসেছে তার নাম।

রাশিয়ার কুরস্ক সাবমেরিন ডুবে গেল— অনেকে বলল, বাবা ভাঙ্গা নাকি আগেই বলেছিলেন।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভারতের হোটেল তাজে হামলার পরও ওঠে আসে তার নাম। বারাক ওবামার উত্থান? সেখানেও নাকি ছিল তার ভবিষ্যদ্বাণী। একসময় এমন অবস্থা দাঁড়াল যে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় ঘটনার সঙ্গেই জুড়ে যেতে লাগল একটি পরিচিত বাক্য—

‘বাবা ভাঙ্গা এটা আগেই বলে গিয়েছিলেন।’

এরপর একদিন সেই গল্পে প্রবেশ করল ফুটবল। আর ঠিক সেখান থেকেই শুরু হলো নতুন রহস্য। ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে যখন উত্তেজনা ধীরে ধীরে বাড়ছে, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এক অদ্ভুত দাবি। বাবা ভাঙ্গা নাকি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন— একটি বিশাল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজনের সময় ঘটবে অস্বাভাবিক কিছু। আকাশে দেখা যাবে রহস্যময় আলো। পৃথিবী প্রথমবারের মতো ভিনগ্রহের প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানতে পারবে। মানবজাতির সামনে উন্মোচিত হবে এমন এক সত্য, যা বদলে দেবে পৃথিবীকে।

শুরুতে বিষয়টি অনেকের কাছেই হাস্যকর মনে হয়েছিল। কিন্তু এই গল্পের ছিল একটি শক্তিশালী অস্ত্র। একটি প্রশ্ন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আয়োজন কোনটি? ফিফা বিশ্বকাপ। যদি পৃথিবীকে চমকে দেওয়ার মতো কিছু ঘটতেই হয়, তাহলে তার জন্য সবচেয়ে বড় মঞ্চ কোনটি? উত্তর ফিফা বিশ্বকাপ।

কিন্তু তখনই উঠে এল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি। বাবা ভাঙ্গা ঠিক কোথায় এই কথাগুলো বলেছিলেন? সাংবাদিকরা খুঁজতে শুরু করলেন। গবেষকরা খুঁজতে শুরু করলেন। সন্দেহবাদীরাও খুঁজতে শুরু করলেন। কিন্তু তারা যা পেলেন, তা ছিল বিস্ময়কর। আর তা হলো ‘কিছুই না।‘ কোনো নির্ভরযোগ্য দলিল নেই। কোনো যাচাই করা নথি নেই। আর তখনই গল্পটি অন্য দিকে মোড় নেয়। হয়তো আসল গল্প বাবা ভাঙ্গাকে নিয়ে নয়। হয়তো আসল গল্প আমাদের নিয়েই। কারণ মানুষ বরাবরই ভবিষ্যৎ জানতে চেয়েছে। ফুটবলের জন্মের কয়েক হাজার বছর আগেও রাজারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে ভবিষ্যদ্বক্তাদের শরণাপন্ন হতেন। সভ্যতাগুলো ওরাকলের কাছে উত্তর খুঁজত। মানুষ সবসময় জানতে চেয়েছে, আগামীকাল কী ঘটবে? ফুটবল শুধু সেই পুরনো আকাঙ্ক্ষাকে নতুন এক মঞ্চ দিয়েছে।

ভাবুন তো। প্রতিটি বিশ্বকাপেই জন্ম নেয় নতুন নায়ক।প্রতিটি বিশ্বকাপেই ঘটে এমন কিছু, যা কেউ কল্পনাও করেনি। মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’। ব্রাজিলের ৭-১ বিপর্যয়। জিদানের অবিশ্বাস্য হেডবাট। মেসির স্বপ্নপূরণের রাত। বিশ্বকাপের ইতিহাস এমন সব ঘটনার ভাণ্ডার, যা কখনো কখনো বাস্তবের চেয়ে সিনেমার গল্প বলেই বেশি মনে হয়। তাই মানুষ ফিফাকে আরো নাটকীয় করে তুলতে এর সাথে জুড়ে দেয় নানান ঘটনা। এবং সম্ভবত এ কারণেই বাবা ভাঙ্গার বারবার ফিরে আসে।

আরও