মার্কিন লেখক হারম্যান মেলভিলের উপন্যাস মবি ডিক- মানুষ বনাম তিমির এক গল্প। এ গল্পের মাধ্যমে মানুষের মনে বিশালাকার তিমি নিয়ে যে চিরাচরিত ভয় ছিল- সেটিকে চ্যালেঞ্জ করেন লেখক। কিন্তু প্রশ্নটা তিমি আর মানুষের সম্পর্ক নিয়ে নয়, প্রশ্নটা ছিল কেন মানুষ এ বিশাল সামুদ্রিক প্রাণীদের নিয়ে এত ভীত ছিল?
বর্তমানে প্রাণীদের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হলেও আগে কালভেদে আমরা প্রাণীদের বন্ধু, সহযোগী, উপদ্রব, দেবতা, প্রতিমা এবং দানব হিসেবে দেখেছি।
একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৭০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা ৭৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবুও একটি প্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে তিমিকে সামুদ্রিক দানব এবং শয়তানের সঙ্গে মিলিয়ে ফেললেও, এখন এ প্রাণীকেই অনেকেই রক্ষা করতে চান।
তিমির প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয় আজ থেকে ১৭৫ বছর আগে, হারম্যান মেলভিলের মবি ডিক প্রকাশের মাধ্যমে। মানুষ বনাম তিমির এক মহাকাব্যিক গল্প, যার ট্র্যাজিক নায়ক ক্যাপ্টেন আহাবের সাদা তিমির প্রতি আচ্ছন্নতা তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়।
আমরা গল্পটি শুনতে পাই ইশমায়েলের মুখে, যিনি আহাবের সঙ্গে তিমি শিকারের সেই অভিযানে যোগ দেন। জাহাজে ওঠার পর, আহাব জানান প্রতিশোধ নেবেন। তিনি মবি ডিককে (একটি তিমি) তাড়া করে হত্যা করতে চান, যে আগের এক সমুদ্রযাত্রায় তার পা কামড়ে ছিঁড়ে নিয়েছিল।
কিন্তু মেলিভিল এ প্রতিশোধের বাহিরে গিয়ে পাঠকদের ভাবতে বাধ্য করেন, দানবীয় প্রাণীদের প্রতি মানুষের ভয় আসে কোথা থেকে।
মবি ডিককে অনুপ্রাণিত করা প্রকৃত গল্প
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মেলভিল যখন মবি ডিক প্রকাশ করেন, ততদিনে তিমি শিকার বা হোয়েলিং একটি বড় বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত হয়েছিল। শিকারীরা তিমি হত্যা এবং তাদের চর্বি সংগ্রহের জন্য বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় বের হতেন । এই চর্বি থেকে তৈরি ট্রেন অয়েল সে সময় যন্ত্রপাতি সচল রাখতে এবং ক্রমবর্ধমান শহরগুলোর ল্যাম্প জ্বালাতে ব্যবহৃত হতো।
মবি ডিক শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলীয় শহর ম্যাসাচুসেটসের ন্যান্টাকেটে। জায়গায়টি সে সময় তিমি শিকারের রাজধানী হয়ে উঠেছিল। এমনকি এ অঞ্চলকে সবাই 'দ্য সিটি দ্যাট লিট দ্য ওয়ার্ল্ড' বলে ডাকত।
১৮২০ সালের ২০ নভেম্বর, দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে এসেক্স নামের একটি জাহাজকে ডুবিয়ে দেয় একটি তিমি। সেই জাহাজটি ছিল তিমি শিকার করার জাহাজ। জাহাজের ২০ জন নাবিক তিনটি নৌকায় পালাতে সক্ষম হন। তারা প্রায় তিন মাস সমুদ্রে টিকে থাকেন। অনাহার ও পানিশূন্যতায় তারা শেষ পর্যন্ত মানুষের মাংস খেতে বাধ্য হন। শেষ পর্যন্ত এ যাত্রায় জীবন নিয়ে যারা ফেরেন তাদের মধ্যে ছিলেন সিনিয়র ক্রু সদস্য ওয়েন চেজ। এ ঘটনা পরবর্তী সময়ে লিখিত আকারে প্রকাশ করেন তিনি। আর সেখান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মবি ডিক লেখে মেলভিল।
ইশমায়েল বর্ণনা করেন, ক্যাপ্টেন আহাবের অযৌক্তিকতার কোনো সীমা নেই—তিনি সেই তিমির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে চান যে তাকে এত বড় আঘাত দিয়েছে। তিনি ঘোষণা করেন, বিশ্বজুড়ে মবি ডিককে তাড়া করতে হবে।
বাস্তবে হয়তো তিমির প্রতি মানুষের যে ভীতি ছিল তা তার নিজের দুর্বলতা সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত ছিল। এসেক্সকে আঘাতকারী তিমি সম্পর্কে ওয়েন চেজ লিখেছিলেন, আমি ঘুরে দাঁড়ালাম, এবং তাকে দেখলাম... সে স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেগে ছুটে আসছিল এবং সেই মুহূর্তে আমার কাছে মনে হয়েছিল, তার চেহারায় দশগুণ ক্রোধ ও প্রতিশোধস্পৃহা ছিল।
তিমিটি কীসের প্রতিনিধিত্ব করে সে ব্যাপারে ইশমায়েল আহাব নিশ্চিত না হলেও ইশমায়েল তিমিকে বাইবেলের সামুদ্রিক দানব 'লেভিয়াথানের' সঙ্গে তুলনা করেন। লেভিয়াথান হলো বাইবেলে বর্ণিত এক ধরনের প্রাণী, যাকে ঈশ্বর তার নিজের খেলার জন্য সৃষ্টি করেছেন। ত্রয়োদশ শতকের দার্শনিক থমাস অ্যাকুইনাসের মতো আরো অনেকে লেভিয়াথানকে তিমি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিলেন।
মেলভিল আমাদের এক দানব দেখিয়েছিলেন, কিন্তু একইসঙ্গে বহু পুরনো কাঠামোকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছিলেন। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে আহাবের কাছে, সাদা তিমি বিশৃঙ্খলা, উদাসীনতা এবং নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি হয়ে ওঠে।
তিনি তিমির শারীরিক অস্তিত্বকে একটি মুখোশ হিসেবে দেখিয়েছেন, যার পেছনে লুকিয়ে আছে আরো অনেক বড় এক শক্তি। আহাব মবি ডিকের মুখোশের বাইরে সেই দুর্বোধ্য বস্তুকে ধ্বংস করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। তার মতে এ দুর্বোধ্য বস্তু হলো, প্রাকৃতিক অশুভ শক্তি—তাকে শয়তান, ঈশ্বর অথবা নিয়তি যা-ই বলা হোক না কেন।
তিমি শিকারী জে রস ব্রাউন তার বই 'এচিংস অব অ্যা হোয়েলিং ক্রুজ'-এ লিখেছিলেন, কিছু শিকারী তিমিদের দানব বলে উল্লেখ করতেন; অন্যরা পর্যবেক্ষণের করে সহানুভূতি বা কৌতূহল গড়ে তুলতেন। সমুদ্রের এ বিশাল প্রাণীকে হত্যার চেয়ে খারাপ ও ভয়ংকর আর কিছু কল্পনা করা যায় না।
আধুনিক সময়ে মানুষ ও তিমির সম্পর্ক
তিমি এখন মানুষের কাছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রাণী। মবি ডিক পড়ার সময়, অনেক সমসাময়িক পাঠক তিমি শিকারীর নয়, তিমির পক্ষে থাকেন।
গত শতাব্দীতে বাণিজ্যিকভাবে তিমি শিকার কমে এলেও এখনো এটি পুরোপুরি শেষ হয়নি। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও নরওয়ে, আইসল্যান্ড ও জাপান এখনও মুনাফার জন্য তিমি শিকার করে।
মানুষ তিমিকে ভিন্ন রূপে দেখতে শুরু করে ১৯৬৭ সাল থেকে, যখন মার্কিন জীববিজ্ঞানী রজার পেইন তিমির গান রেকর্ড করেছিলেন এবং মানুষ তা শুনে অভিভূত হয়েছিল। তখন থেকেই ক্রমবর্ধমান গবেষণা দেখায় যে তিমিরা জটিল যোগাযোগে সক্ষম, যা একসময় শুধু মানুষের মধ্যেই আছে বলে বিশ্বাস করা হতো।
মেলভিল আমাদের দেখিয়েছিলেন, কীভাবে নিজেদের ভেতরে চাপা দেয়া ভয় ও অপরাধবোধ থেকে আমরা দানব তৈরি করি।
বিবিসি অবলম্বনে