বসন্তের মৃদু হাওয়া গায়ে মেখে প্রতি বছর হংকংয়ের মূল ভূখণ্ড ছেড়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটে চলেন এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপে। গন্তব্যটি হলো চিউ চাউ দ্বীপ। উদ্দেশ্য— হংকংয়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বর্ণিল উৎসব ‘চিউ চাউ বান ফেস্টিভ্যাল’ বা ‘দা জিউ উৎসব’ স্বচক্ষে দেখা। ধর্মীয় ঐতিহ্য, উৎসবের আমেজ আর রোমাঞ্চকর প্রতিযোগিতার এমন অপূর্ব মেলবন্ধন বিশ্বের খুব কম উৎসবেই দেখা যায়।
চন্দ্র পঞ্জিকা অনুযায়ী প্রতি বছর বুদ্ধ পূর্ণিমার তিথিতে এ উৎসবের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে এর পেছনে জড়িয়ে আছে কয়েকশ’ বছরের পুরনো এক ইতিহাস।
বানের ওপর লাল রঙের সিল দিয়ে চীনা অক্ষরে লেখা থাকে ‘শান্তি’ । ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
স্থানীয় লোকগাথা অনুযায়ী, ১৮ শতকে কিং রাজবংশের শাসনামলে চিউ চাউ দ্বীপে নেমে এসেছিল জোড়া বিপর্যয়। একদিকে জলদস্যুদের নির্মম তাণ্ডব, অন্যদিকে রহস্যময় প্লেগ মহামারীতে উজাড় হয়ে যাচ্ছিল একের পর এক প্রাণ। নিরুপায় দ্বীপবাসীরা তখন শরণাপন্ন হন রক্ষাকর্তা দেবতা ‘পাক তাই’-এর। মন্দিরে বিশেষ বেদি স্থাপনের পাশাপাশি দেব-দেবীর মূর্তি নিয়ে পুরো দ্বীপের অলিতে-গলিতে শুরু হয় শোভাযাত্রা। অলৌকিকভাবে কেটে যায় মহামারীর কালো মেঘ, দূর হয় অশুভ শক্তি। সেই থেকে দেবতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে এবং মহামারীতে মৃত ও অতৃপ্ত আত্মাদের শান্ত করতে শুরু হয় ‘পিস বান’ বা শান্তির রুটি উৎসর্গের এ উৎসব।
বর্তমানে উৎসবের অন্যতম বড় আকর্ষণ হলো ‘পিউ সিক’ প্যারেড। এ শোভাযাত্রায় খুদে শিশুদের দেব-দেবীর পোশাকে সাজিয়ে স্টিলের কাঠামোর ওপর বসিয়ে উঁচু করে ধরে রাখা হয়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, শিশুরা যেন শূন্যে ভেসে রাস্তা চলেছে! রঙিন এ প্যারেড দেখতে রাস্তার দুপাশে ভিড় জমায় হাজারো পর্যটক।
শোভাযাত্রায় দেব-দেবীর সাজে শিশুরা । ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
উৎসবের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ছোট্ট মিষ্টি খাবার— ‘পিং অন বাও’ বা পিস বান। ময়দা, চিনি আর ইস্ট দিয়ে ভাপে সেদ্ধ করা এ কোমল বানের ওপর লাল রঙের সিল দিয়ে চীনা অক্ষরে লেখা থাকে ‘শান্তি’। ঐতিহ্যগতভাবে এর ভেতরে থাকে লাল শিম, পদ্মবীজ কিংবা তিলের মিষ্টি পুর।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, উৎসবের নির্দিষ্ট দিনগুলোয় পুরো চিউ চাউ দ্বীপ পুরোপুরি নিরামিষ হয়ে যায়। দ্বীপের সাধারণ সামুদ্রিক খাবারের রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে বিশ্বখ্যাত চেইন শপ ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ পর্যন্ত তাদের মেন্যু থেকে মাংস বাদ দিয়ে শুধু নিরামিষ খাবার বিক্রি করে। এ পিস বান তৈরিতেও কোনো প্রাণিজ চর্বি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
উৎসবের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং শ্বাসরুদ্ধকর অংশটি ঘটে একদম শেষ ভাগে— মধ্যরাতে। একে বলা হয় ‘বান স্ক্র্যাম্বলিং কম্পিটিশন’ বা রুটি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা। পাক তাই মন্দিরের সামনে তৈরি করা হয় ৬০ ফুট উঁচু তিনটি বিশাল বাঁশের টাওয়ার, যা হাজার হাজার পিস বান দিয়ে সম্পূর্ণ ঢেকে দেয়া হয়।
পিস বান টাওয়ার থেকে রুটি সংগ্রহের দৃশ্য। ছবি: সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট
ঘড়ির কাঁটায় রাত ১২টা বাজতেই প্রতিযোগীরা ক্ষিপ্র গতিতে সেই টাওয়ার বেয়ে ওপরে উঠতে শুরু করেন। নিয়ম হলো, টাওয়ারের যত উঁচুতে ওঠা যাবে, সেখানকার বানের পয়েন্ট তত বেশি এবং বিশ্বাস করা হয় তা পরিবারের জন্য তত বেশি আশীর্বাদ বয়ে আনবে। অতীতে আসল রুটি ব্যবহার করা হলেও, বর্তমানে নিরাপত্তার স্বার্থে প্লাস্টিকের নকল রুটি ব্যবহার করা হয় এবং কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অ্যাথলেটরাই কেবল এতে অংশ নেন।
কালক্রমে চিউ চাউ দ্বীপের পিস বান উৎসব হংকংয়ের ‘অনুলিপিকৃত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় বেকারির কারিগরেরা পরম যত্নে টিকিয়ে রেখেছেন পিস বান তৈরির ঐতিহ্য।
সাউথ চায়না মনিং পোস্ট থেকে তথ্য নেয়া