১০২ ডিগ্রি জ্বর নিয়েও রাত চারটায় স্ত্রীর পরোটা বানানো, কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার কথা প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে বলা, এসব ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলছে, একজন সফল মানুষের পেছনে স্ত্রীর আত্মত্যাগের মাপকাঠি আসলে কোথায়? ভালোবাসার নামে কতটা নিজের জীবন বদলাতে হয় একজন নারীকে? সেই হিসাবের উত্তর খুঁজতেই আজ বলতে চাই আন্তোনেলা রোকুজ্জোর গল্প। নামটা অপরিচিত লাগছে? লিওনেল মেসির স্ত্রী বললে নিশ্চয়ই চিনবেন। মেসির সাফল্যের আলোয় সেই জীবনটিকে আমরা কতটা দেখি?
১৯৮৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম আন্তোনেলার। মেসির সঙ্গে পরিচয় শৈশবে। ১৩ বছর বয়সে ফুটবলের স্বপ্ন নিয়ে মেসি বার্সেলোনায় চলে গেলেও আন্তোনেলা থেকে যান নিজের শহরে। ২০০৭ সালের দিকে তাদের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দুই বছর পর, মাত্র ২১ বছর বয়সে, নিজের শহর, পরিবার আর চেনা পরিবেশ ছেড়ে মেসির সঙ্গে থাকতে বার্সেলোনায় পাড়ি জমান আন্তোনেলা। ভালোবাসার মানুষটির কাছে যাওয়া ছিল তার সিদ্ধান্ত, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের অর্থ ছিল নিজের পরিচিত পৃথিবীটাকে পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন এক জীবনে প্রবেশ করা।
বার্সেলোনায় আসার আগে আন্তোনেলা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলেন। তার পড়াশোনার বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। তাই মেসির জন্য তিনি ঠিক কোন স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে নিজের শহরে তাঁরও ছিল পড়াশোনা, পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং নিজের মতো করে ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সুযোগ। মেসির ক্যারিয়ার যখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটেছে, আন্তোনেলাকেও সেই জীবনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বারবার নিজের পৃথিবী নতুন করে সাজাতে হয়েছে।
এরপর সংসারে এল তিন সন্তান,থিয়াগো, মাতেও ও চিরো। একজন বিশ্বখ্যাত ফুটবলারের সন্তান হওয়া যেমন সুযোগের দরজা খুলে দেয়, তেমনি কেড়ে নিতে পারে সাধারণ শৈশবের স্বাভাবিকতাও। সন্তানদের ব্যক্তিগত জীবন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি নিয়ে আন্তোনেলা সচেতন। তিনি চান, শিশুরা যথাসম্ভব স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে উঠুক, শিখুক বিনয় ও সম্মান। তারকাখ্যাতির আকর্ষণ থেকে সন্তানদের আগলে রাখার এই দায়িত্বের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট সিদ্ধান্ত, যেগুলোর খবর সংবাদ শিরোনামে আসেনি।
পরিবারের ঠিকানাও বদলেছে বারবার। দীর্ঘ বার্সেলোনা-অধ্যায়ের পর ২০২১ সালে প্যারিসে, তারপর ২০২৩ সালে মায়ামিতে নতুন জীবন শুরু করেন তারা। প্রতিটি শহরের সঙ্গে বদলেছে পরিবেশ, পরিচিতি, সন্তানদের দৈনন্দিন রুটিন। মেসি নিজেই জানিয়েছেন, প্যারিসে থাকাকালে তিনি বার্সেলোনার মতো স্বাভাবিক পারিবারিক সময় দিতে পারতেন না। তারকা ফুটবলারের জীবনের এই বাস্তবতা পরিবারের অন্য সদস্যদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। নতুন শহরে সন্তানদের মানিয়ে নেওয়া, সংসারের ছন্দ খুঁজে পাওয়ার সংগ্রামগুলো আন্তোলেনাকে একাই করতে হয়েছে।
মেসির স্ত্রী হওয়ার অর্থ শুধু তার সাফল্য, অর্থবিত্ত কিংবা ট্রফির পাশে দাঁড়ানো নয়। এর অর্থ এমন এক পরিচিতির সঙ্গে বেঁচে থাকা, যেখানে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ আপনার জীবন সম্পর্কে আগ্রহী, অথচ নিজের ব্যক্তিগত পরিসরটুকু রক্ষা করাও কঠিন। আন্তোনেলা 'ভোগ মেক্সিকো'কে জানিয়েছিলেন, মানুষের অতিরিক্ত মনোযোগের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া প্রথমদিকে তার জন্য সহজ ছিল না। তিনি বরাবরই ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যক্তিগত রাখতে চেয়েছেন। অথচ মেসির সঙ্গে সম্পর্কের কারণে তার নিজের জীবনও জনসমক্ষে চলে এসেছে। আজ তিনি পরিচিত মেসির স্ত্রী হিসেবে। অথচ, হয়ত তিনি দায়িত্বকে আপন না করে নিয়ে নিজের আলাদা একটি পরিচয় গড়ে তুলতে পারতেন।
বিশ্ব মেসিকে চেনে তার গোল, রেকর্ড ও ট্রফির জন্য। আন্তোনেলার জীবনের প্রতিটি ত্যাগের হিসাব আমরা জানি না, জানার দাবিও করতে পারি না। কিন্তু এটুকু বোঝা যায়, একজন মহাতারকার পাশে থাকা মানে কেবল আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা নয়, সেই আলোর সঙ্গে বদলে যাওয়া জীবনকেও সামলানো। মেসি মাঠে নিজের ইতিহাস লিখেছেন। আন্তোনেলা লিখছেন অন্য এক ইতিহাস-পরিবারের পাশে থেকে, বারবার নতুন পৃথিবীতে মানিয়ে নিয়ে।