‘ক্লিন ইন্টারনেট’ অভিযান

তিব্বতের বন্যার তথ্য গোপন করছে চীন!

গবেষকরা জানান, বন্যার পরপরই চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। উইচ্যাট ও ওয়েইবোর মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্মগুলোতে বিষয়টি দ্রুত ট্রেন্ডিং হয়ে ওঠে। তবে রিয়েল-টাইমে মন্তব্য ও পোস্ট মুছে ফেলার কারণে আলোচনার সেই ঝড় দ্রুতই মিলিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের পোস্ট রিয়েল-টাইমে মুছে ফেলা হয়

দক্ষিণ ভারতে নির্বাসিত ৪৬ বছর বয়সী তিব্বতি শেরিং ফুটসোক দূর থেকেই নেপাল-তিব্বতের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার নানা খবরাখবর রাখছেন। সীমান্তের দুই পারে থাকা তার স্বজনরা এখনো নিখোঁজ। তবে নেপাল প্রান্তে নিখোঁজ স্বজনদের নাম অন্তত সরকারি তালিকায় থাকলেও তিব্বত অংশে কী ঘটেছে বা তার পরিবারের সদস্যরা কেমন আছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো তথ্যই পাচ্ছেন না।

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে ফুটসোক বলেন, ‘আমি এখন হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর জন্য প্রার্থনা শুরু করেছি। মেনেই নিয়েছি যে তারা আর ফিরে আসবেন না।’

ফুটসোকের এ অভিজ্ঞতা কোনো একক ঘটনা নয়, বরং তিব্বতের বর্তমান পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র বলে মনে করেন অনেকে। মানবাধিকার সংস্থা ও দ্য গার্ডিয়ানসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো স্পর্শকাতর এসময়ে তথ্য নিয়ন্ত্রণে ‘চীনের রাষ্ট্রীয় দমনপীড়ন’ আরো তীব্র হচ্ছে। দেশটির জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের পরিচালিত ‘ক্লিন ইন্টারনেট ২০২৬’ অভিযানটি আগে সাইবার অপরাধ ও হ্যাকিং দমনে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন তা নিরপেক্ষ তথ্য ও বন্যা সম্পর্কিত বেসরকারি বিবরণ গোপন বা সেন্সর করার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিব্বত ও নেপাল সীমান্তে গত ২৬ আগস্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। নেপাল অংশে উদ্ধার তৎপরতা ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা উন্মুক্ত রাখা হলেও তিব্বতের অংশে চীনা কর্তৃপক্ষ খুবই কঠোরভাবে সম্পূর্ণ তথ্যাদির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। দুর্যোগের পরপরই চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো সরকারের ত্রাণ তৎপরতার সাফল্য তুলে ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, অন্যদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট সরাতে সক্রিয় ভূমিকা নেয় সেন্সর দল।

গবেষকরা জানান, বন্যার পরপরই চীনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাধারণ মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে তীব্র আগ্রহ দেখা যায়। উইচ্যাট ও ওয়েইবোর মতো জনপ্রিয় প্লাটফর্মগুলোতে বিষয়টি দ্রুত ট্রেন্ডিং হয়ে ওঠে। তবে রিয়েল-টাইমে মন্তব্য ও পোস্ট মুছে ফেলার কারণে আলোচনার সেই ঝড় দ্রুতই মিলিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের পোস্ট রিয়েল-টাইমে মুছে ফেলা হয়। উইচ্যাট ব্যবহারকারীদের অনেকেই পোস্ট সরিয়ে নেয়ার নোটিশ পান, যেখানে কারণ হিসেবে ‘রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়বস্তু’ বা ‘সরকারি নীতি লঙ্ঘন’ কথাটি উল্লেখ করা হয়।

হংকংভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘চায়না মিডিয়া প্রজেক্ট’-এর পরিচালক ডেভিড ব্যান্ডুরস্কি বলেন, ‘এটিকে কেবল “অভিযান” বলা ভুল হবে। এটি কোনো সাময়িক পদক্ষেপ নয়, বরং জনমত নিয়ন্ত্রণ নীতি বাস্তবায়নের একটি ধারাবাহিক ও সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।’

দুর্যোগের চার দিন পর, ৩০ আগস্ট তিব্বত পুলিশ জানায়, বন্যা নিয়ে ‘গুজব’ ছড়ানোর অভিযোগে ক্লিন ইন্টারনেট অভিযানের আওতায় ১০টি মামলা করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, এসব পোস্টের বেশিরভাগেই দাবি করা হয়েছিল বন্যায় ১ হাজারের বেশি মানুষ ভেসে গেছেন। অথচ চীন সরকারের হিসাব অনুযায়ী, তিব্বতে মৃতের সংখ্যা মাত্র ৪৩। তিব্বতি মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, চীনে ক্ষোভ ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা ঢাকার জন্য প্রকৃত মৃত্যুর সংখ্যা গোপন করছে বেইজিং।

পুলিশের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘অননুমোদিত বা ভুল তথ্য জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে এবং ইন্টারনেটের শৃঙ্খলা বিনষ্ট করে। ত্রাণ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করতেই এ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।’ এমনকি বন্যাকবলিত এলাকা থেকে ৩ হাজার কিলোমিটার দূরে জিয়াংশি প্রদেশের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিখোঁজের সংখ্যা ৮২৬ জন বলে পোস্ট করায় তাকেও আইনি ও প্রশাসনিক শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়েছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের সাবেক এক সাংবাদিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সংকটের সময়ে তথ্যের সেন্সরশিপ কেবল পোস্ট মোছার মাধ্যমেই হয় না, তথ্য না দেয়ার মাধ্যমেও করা হয়। সরকারি খবরে রাষ্ট্রের কঠোর পরিশ্রম দেখানো হয়, কিন্তু নিখোঁজ বা উদ্ধারকাজের মৌলিক কোনো তথ্য সেখানে থাকে না।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন ফর তিব্বত’-এর প্রতিনিধি তেনচো গ্যাৎসো বলেন, ‘এ প্রচারাভিযানের দুটি দিক রয়েছে। ডিজিটাল জালিয়াতির মতো প্রকৃত অপরাধ মোকাবেলা এবং এর আড়ালে জনমত নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতির কারণেই এর সমালোচনা করা বেশ জটিল হয়ে ওঠে।’

এ অনলাইন নজরদারি ও শাস্তির ভয়ে নির্বাসনে থাকা তিব্বতিদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের যোগাযোগের শেষ উপায়টুকুও বন্ধ হয়ে গেছে।

নয়াদিল্লিভিত্তিক প্রবীণ তিব্বতি সাংবাদিক কালসাং জিগমে বলেন, ‘অতীতে যেকোনো দুর্যোগের সময় স্থানীয় মানুষ সক্রিয়ভাবে প্রার্থনার আয়োজন করতেন এবং ত্রাণ সামগ্রী পাঠাতেন। কিন্তু এবার কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই যোগাযোগের সব পথও বন্ধ হয়ে গেছে।’

আরও