রিভিউ

পরিণত স্পাইডার-ম্যানকে ফিরিয়ে এনেও ক্লান্তিকর ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’

‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর শেষে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ এমন এক জাদু করেছিলেন, যাতে এমজে ও নেডসহ সবাই পিটারকে ভুলে যায়। সেটিই ছিল মাল্টিভার্সকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়। তারা যখন আবার মুখোমুখি হয়, পিটারকে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ হিসেবে দেখে এমজে ও নেড। অন্যদিকে, পিটারের প্রিয় আন্ট মে (মারিসা টোমেই) আগের ছবিতেই মারা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পিটার যেন ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর সেই নিঃসঙ্গ, অন্ধকারাচ্ছন্ন নায়কে পরিণত হয়েছেন

সুপারহিরোরা সাধারণত একা থাকে না। দল গড়ে, জোট বাঁধে— কিংবা অন্তত একজন ঘনিষ্ঠ সঙ্গী তো থাকেই। শহরের নানা প্রান্তে তাদের ভক্ত থাকে, থাকে প্রিয় মানুষও। এমনকি নৈরাশ্যবাদী প্রতিশোধপরায়ণ ব্যাটম্যানও শেষ পর্যন্ত সামাজিক ব্রুস ওয়েনে ফিরে যান।

কিন্তু ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’-তে পিটার পার্কার (টম হল্যান্ড) হয়ে উঠেছে এক কাজপাগল অপরাধদমনকারী। অদম্য, কিন্তু নিঃসঙ্গ। শুরুতেই দেখা যায়, নিখুঁতভাবে জাল ছুঁড়ে একের পর এক অপরাধীকে ধরছে পিটার। তারপর ফিরে যাচ্ছে নিউইয়র্কের ছোট্ট জীর্ণ বাসায়, যেখানে প্রায় সন্ন্যাসীর মতো থাকে। চারপাশে কম্পিউটার স্ক্রিন, আর নিজের ক্ষমতা আরো শাণিত করতে নানা বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক যন্ত্র নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়।

এ লড়াই ভীষণ একাকী। পিটার আর স্কুলের ছাত্র নয়, এমআইটিতে ভর্তির স্বপ্নও দেখছে না। টম হল্যান্ড এখন ৩০ বছর বয়সী, অভিনেতা হিসেবেও অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী ও পরিণত। আর পর্দার পিটার সারাক্ষণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালোবাসার মানুষ এমজে (জেনডায়া) এবং বেস্ট ফ্রেন্ড নেডের (জেসন বাটালন) ভিডিওই দেখে চলে।

‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’-এর শেষে ডক্টর স্ট্রেঞ্জ এমন এক জাদু করেছিলেন, যাতে এমজে ও নেডসহ সবাই পিটারকে ভুলে যায়। সেটিই ছিল মাল্টিভার্সকে বাঁচানোর একমাত্র উপায়। তারা যখন আবার মুখোমুখি হয়, পিটারকে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষ হিসেবে দেখে এমজে ও নেড। অন্যদিকে, পিটারের প্রিয় আন্ট মে (মারিসা টোমেই) আগের ছবিতেই মারা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে পিটার যেন ‘ট্যাক্সি ড্রাইভার’-এর সেই নিঃসঙ্গ, অন্ধকারাচ্ছন্ন নায়কে পরিণত হয়েছেন।

গল্পের কাঠামোতে সুপারহিরো চলচ্চিত্রের প্রায় সব উপাদানই রয়েছে। বিস্ফোরক ও মাথা ঘুরিয়ে দেয়া অ্যাকশন— বিশেষ করে আকাশচুম্বী ভবনের ভেতর-বাইরে হাল্ককে (মার্ক রাফালো) নিয়ে দীর্ঘ একটি দৃশ্য দারুণভাবে নির্মিত। হাল্ক এখানে আপাতত অন্ধকার পক্ষের হয়ে কাজ করলেও, মূলত দর্শকদের কিছু ‘হাল্ক মুহূর্ত’ উপহার দিতেই তার উপস্থিতি

২০২১ সালে ‘নো ওয়ে হোম’ শুধু উত্তর আমেরিকায় ৮০ কোটি ডলারের বেশি আয় করেছিল। বিশ্বব্যাপী ছবিটির আয় ছিল প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এত বিপুল দর্শকপ্রিয়তার পর অনেকে বলতে পারেন, এত মানুষ ভুল হতে পারে না। কিন্তু আমার নিজের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। তিন স্পাইডার-ম্যান তথা টম হল্যান্ড, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড ও টোবি মাগুয়ারের জটিল সমন্বয়ে তৈরি সেই গল্প ছিল স্মৃতিকাতরতার ওপর দাঁড়ানো অত্যন্ত চতুর বিপণন কৌশল, যা শেষ পর্যন্ত আমাকে প্রবল মাথাব্যথাই উপহার দিয়েছিল।

সেই ছবির পর ‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ কিছু মুহূর্তে যেন শান্ত, মননশীলতার অনুভূতি দেয়। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন, যিনি স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, পরে ‘শাং-চি অ্যান্ড দ্য লেজেন্ড অব দ্য টেন রিংস’ দিয়ে মার্ভেলের জগতে প্রবেশ করেন।

স্পষ্ট বোঝা যায়, ক্রেটন এমন একটি কমিকস-ভিত্তিক চলচ্চিত্র বানাতে চেয়েছেন, যা হবে চিন্তাশীল, মানবিক ও ‘পরিণত’। কিন্তু সমস্যা হলো, দর্শক খুব স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেন চলচ্চিত্রটি যতই এসব গুণ অর্জনের চেষ্টা করছে, সেই প্রচেষ্টাই উল্টো ছবির প্রভাব কমিয়ে দেয়।

গল্পের কাঠামোতে সুপারহিরো চলচ্চিত্রের প্রায় সব উপাদানই রয়েছে। বিস্ফোরক ও মাথা ঘুরিয়ে দেয়া অ্যাকশন— বিশেষ করে আকাশচুম্বী ভবনের ভেতর-বাইরে হাল্ককে (মার্ক রাফালো) নিয়ে দীর্ঘ একটি দৃশ্য দারুণভাবে নির্মিত। হাল্ক এখানে আপাতত অন্ধকার পক্ষের হয়ে কাজ করলেও, মূলত দর্শকদের কিছু ‘হাল্ক মুহূর্ত’ উপহার দিতেই তার উপস্থিতি।

পিটারের অন্তর্দ্বন্দ্বও রয়েছে, আছে জন বার্নথালের অভিনয়ে খানিক বিরক্ত কিন্তু আকর্ষণীয় পানিশার, আর প্রতিপক্ষও নিছক কার্টুনধর্মী খলনায়ক নয়। কিন্তু ছবিটি যতটা উপভোগ্য, তার চেয়ে বেশি পরিশ্রমসাপেক্ষ। ছবিটি অনেকটা দীর্ঘ। গল্পটাও খাপছাড়া লাগে, আর আবেগের বদলে গাম্ভীর্য ও ব্যস্ততাই বেশি চোখে পড়ে।

ছবির বড় দুর্বলতাগুলোর একটি স্মৃতিভ্রংশের গল্প। শুরুতে এমজের সঙ্গে পিটারের দেখা হওয়ার দৃশ্যগুলো একই সঙ্গে মজার ও হৃদয়স্পর্শী। বাস্তব জীবনে টম হল্যান্ড ও জেনডায়ার এ বছরের বিয়ের কারণে দৃশ্যগুলোয় বাড়তি এক মাত্রাও যোগ হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর এই পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে হতাশাজনক হয়ে ওঠে। দর্শক চান পিটার ও এমজের সম্পর্ক এগিয়ে যাক, কিন্তু ছবিটি সেটিকে দুঃখের এক স্থির অবস্থায় আটকে রাখে।

‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ নিশ্চিতভাবেই বিপুল অর্থ আয় করবে। কারণ লাল-নীল পোশাক পরা, জাল ছোড়া, প্রেমিক পিটার পার্কারের আদিম আকর্ষণ এখনো অটুট। নির্মাতারা অন্তত একই পুরনো ‘মাল্টিভার্স’ গল্পের পুনরাবৃত্তি না করে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন—এটুকু প্রশংসার দাবিদার

চিত্রনাট্য লিখেছেন মার্ভেলের অভিজ্ঞ দুই লেখক ক্রিস ম্যাককেনা ও এরিক সমার্স। চিত্রনাট্যটি ধারাবাহিকভাবে এগোনোর বদলে একের পর এক নতুন ধারণা সামনে আনে।

শুরুর দিকে দেখা যায়, পিটার তার ক্ষমতা হারাতে শুরু করেছেন। আসলে অতিরিক্ত মাকড়সার ডিএনএর প্রভাবে তার ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। তখন মনে হয়, হয়তো ‘সুপারম্যান টু’-এর মতো গভীর মানসিক সংকটের গল্প দেখা যাবে। কিন্তু না। শুধু একটি রূপালি ‘ইনহিবিটর’ ঘাড়ের পেছনে লাগিয়ে নিলে ক্ষমতা আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। যদি এই দ্বন্দ্বই গল্পের অংশ হতো, তবে সেটিকে শেষ পর্যন্ত টেনে নেয়া উচিত ছিল। কিন্তু এটি যেন হঠাৎ শুরু হয়ে হঠাৎই শেষ হয়ে যায়।

প্রথম দিকে খলনায়কটি বেশ রহস্যময় মনে হয়। সে স্পাইডার-ম্যান ছাড়া অন্য যে কারো মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে। ফলে একের পর এক মানুষ তার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। স্পাইডার-ম্যান কারো সঙ্গে কথা বলছেন, হঠাৎই সেই ব্যক্তি ভয়ংকর কিছু বলে ওঠে, আর বোঝা যায় খলনায়ক তার মাধ্যমে কথা বলছে। ধারণাটি শুনতে আকর্ষণীয় হলেও একে যতটা অর্থবহ ভাবা হচ্ছে, ছবিতে ততটা নয়। বরং এটি যেন মাঝারি মানের কোনো হরর ছবির ধারণা।

শেষ পর্যন্ত জানা যায়, খলনায়ক আসলে পুরোপুরি খলনায়ক নয়। তার উদ্দেশ্য সম্মানজনক, এমনকি সহানুভূতি পাওয়ার মতো। স্যাডি সিঙ্ক চরিত্রটিকে আন্তরিকতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছেন। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—যে চূড়ান্ত সংঘর্ষ শেষ পর্যন্ত ভালোবাসা আর বোঝাপড়ায় রূপ নেয়, তার নাটকীয় তাৎপর্য কী? মনে হয়, ছবিটি যেন কমিকসের খলনায়কদেরও এমন এক গোষ্ঠী হিসেবে দেখাতে চাইছে, যাদেরও ‘উদ্ধার’ প্রয়োজন।

ডেস্টিন ড্যানিয়েল ক্রেটন স্পাইডার-ম্যানের অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দক্ষতা ও চমৎকার ভিজ্যুয়াল মহিমায় নির্মাণ করেছেন। ফলে যেসব দর্শক চলচ্চিত্রে এমন অ্যাকশন প্রত্যাশা করেন, তা তারা পাবেন।

‘ব্র্যান্ড নিউ ডে’ নিশ্চিতভাবেই বিপুল অর্থ আয় করবে। কারণ লাল-নীল পোশাক পরা, জাল ছোড়া, প্রেমিক পিটার পার্কারের আদিম আকর্ষণ এখনো অটুট। নির্মাতারা অন্তত একই পুরনো ‘মাল্টিভার্স’ গল্পের পুনরাবৃত্তি না করে নতুন কিছু করার চেষ্টা করেছেন—এটুকু প্রশংসার দাবিদার।

তবে শেষ পর্যন্ত ‘স্পাইডার-ম্যান: ব্র্যান্ড নিউ ডে’ এমন একটি চলচ্চিত্র, যা দেখা যায় ঠিকই, কিন্তু মনকে পুরোপুরি আলোড়িত করতে পারে না।

ভ্যারাইটি অবলম্বনে

আরও