দেবদাস যখন পার্বতীর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছাল, তখন তার প্রাণশক্তির কিছু আর অবশিষ্ট নেই। অথচ অন্দরে যে মেয়েটি তার জন্য অপেক্ষা করছে, সে-ই হয়তো তাকে বাঁচাতে পারত। পার্বতী ছুটে আসতে চায়। কিন্তু দরজা খুলে না। শেষবারের মতোও নয়।
এই বন্ধ দরজাটিই ‘দেবদাস’ উপন্যাসের সবচেয়ে নির্মম চরিত্র। কারণ, এই দরজা শুধু একজন প্রেমিককে ফিরিয়ে দেয় না; উপেক্ষা করে দুটি মানুষের শৈশব থেকে বেড়ে লালন করা ভালোবাসা, তাদের একসঙ্গে বাঁচার সম্ভাবনা, এমনকি মৃত্যুর মুহূর্তে একে অন্যের কাছে পৌঁছানোর অধিকারও।
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ রচনার সময়কাল ১৯০১ সাল। কিন্তু উপন্যাসটি প্রকাশ হয় ১৯১৭ সালে। শরৎচন্দ্র নিজেই একসময় এ রচনাকে অপরিণত বলে মনে করেছিলেন। অথচ সেই অপরিণত বলে মনে করা গল্পের ভেতরেই তিনি এমন এক সমাজকে এঁকেছিলেন, যেখানে প্রেমের পরিণতি নির্ধারিত হয় প্রেমিক-প্রেমিকার হাতে নয়, তাদের সামাজিক অবস্থানে।
দেবদাস ও পার্বতীর যখন বিবাহের প্রশ্নে এসে দাঁড়ায়, তখন ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর নেমে আসে সামাজিক হিসাবের খাতা। দেবদাসের পরিবার ধনী, প্রভাবশালী; পার্বতীর পরিবার তুলনায় কম সম্পদশালী ও নিম্নতর সামাজিক মর্যাদার। ফলে যে সম্পর্ক শৈশবে স্বাভাবিক ছিল, বিবাহের ক্ষেত্রে তা হয়ে ওঠে অসম। এখানেই শরৎচন্দ্রের গল্পটি নিছক প্রেমের গল্প থেকে সমাজের গল্পে পরিণত হয়। পার্বতীকে প্রত্যাখ্যানের মূল কারণ, দুই পরিবারের সামাজিক সমতা নেই।
এই অসমতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, দেবদাস নিজেও সেই সুবিধাভোগী সমাজের সন্তান। সে পার্বতীর চেয়ে বেশি স্বাধীনতা পেয়েছে, বেশি শিক্ষা পেয়েছে, বেশি সামাজিক ক্ষমতা পেয়েছে। কিন্তু সেই ক্ষমতা ব্যবহার করে সে সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না। পার্বতী, যে তুলনায় কম ক্ষমতাবান, সে-ই বরং বেশি সাহসী হয়ে ওঠে। সে দেবদাসের কাছে যায়, নিজের ভালোবাসার কথা বলে, সম্পর্কটিকে বাঁচানোর চেষ্টা করে। দেবদাস পারে না। তার ভেতরের দ্বিধা, পারিবারিক আনুগত্য ও সামাজিক ভীরুতা তাকে ক্রমশ এমন এক জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে সে ভালোবাসে, কিন্তু ভালোবাসার জন্য সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।
এই জায়গাতেই দেবদাসের ট্র্যাজেডি সবচেয়ে গভীর। সে শুধু সমাজের শিকার নয়,সে সেই সমাজের তৈরি মানুষও। যে সামাজিক কাঠামো তাকে পার্বতীর চেয়ে বেশি ক্ষমতা দিয়েছিল, সেই কাঠামোর বিরুদ্ধেই দাঁড়ানোর সাহস তার ছিল না। ফলে তার পতন শুধু বাইরের বাধায় ঘটে না, ঘটে নিজের ভেতরেও। সমাজ তাকে থামায়, আর সে নিজেও থেমে যায়।
পার্বতীর জীবনে সেই সামাজিক বাস্তবতা আরো নির্মম। দেবদাসকে হারানোর পর তার বিয়ে হয় এক বয়স্ক, ধনী জমিদারের সঙ্গে। এখানে প্রেমের জায়গা নেয় সামাজিক নিরাপত্তা, পারিবারিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক হিসাব। পার্বতী যেন নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে না; তাকে এক সামাজিক ব্যবস্থার ভেতরেই নতুন করে স্থাপন করা হয়। তার ভালোবাসা ব্যক্তিগত, কিন্তু তার বিবাহ সামাজিক। আর সেই সামাজিক বিবাহই শেষ পর্যন্ত তার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার ওপর জয়ী হয়।
এই উপন্যাসে চন্দ্রমুখীর উপস্থিতি সেই সমাজের ভণ্ডামিকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। পার্বতী সমাজের চোখে সম্মানিত নারী, চন্দ্রমুখী সমাজের চোখে অপাংতেয়। অথচ দেবদাসের জীবনের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তগুলো আসে চন্দ্রমুখীর কাছ থেকেই। সে দেবদাসকে ভালোবাসে, তার কষ্ট বোঝে, তার পাশে দাঁড়াতে চায়। সমাজ যাকে ‘পতিতা’ বলে দূরে সরিয়ে রাখে, সেই নারীই হয়ে ওঠে সবচেয়ে সহানুভূতিশীল মানুষ।
শরৎচন্দ্র কোনো সরল নৈতিক শিক্ষা দেন না। তিনি বলেন না, পার্বতী ভালো আর চন্দ্রমুখী খারাপ, কিংবা উল্টোটা। বরং তিনি দেখান, সমাজের তৈরি ‘সম্মানিত’ ও ‘অসম্মানিত’ নারীর পরিচয় কতটা ভঙ্গুর। পার্বতী ভালোবাসার অধিকার হারায় সামাজিক মর্যাদার কারণে, আর চন্দ্রমুখী সামাজিক মর্যাদা হারিয়েও ভালোবাসার মানবিকতা ধরে রাখে। তাদের দুজনের জীবনই শেষ পর্যন্ত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নিয়মে বাঁধা, কিন্তু তাদের মানবিকতা সেই নিয়মের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে।
শরৎচন্দ্র 'দেবদাস' লিখেছিলেন কি শুধু প্রেমের জন্য? হয়তো প্রেম ছিল গল্পের শুরু। কিন্তু তার গভীরে ছিল আরো বড় এক প্রশ্ন—কেন মানুষ নিজের ভালোবাসার জন্য দাঁড়াতে পারে না? কেন একটি সম্পর্কের মূল্য নির্ধারিত হয় পরিবারের সম্পদ, বংশ, জাত ও সামাজিক মর্যাদায়? কেন একজন নারীকে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য এত বেশি মূল্য দিতে হয়? আর কেন একজন পুরুষ, যে সমাজের সুবিধা ভোগ করে, সেই সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হারিয়ে ফেলে?