একসময় মেয়েটি নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল, সময় সেই মেয়েটিই হয়তো নিজের কন্যার বিয়ের বয়স নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। যে সংসারে তার স্বপ্নের চেয়ে দায়িত্ব বড় ছিল, মতামতের চেয়ে সামাজিক সম্মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল— একদিন সেই একই মূল্যবোধের রক্ষক হয়ে ওঠেন তিনি। যে নিয়ম একদিন তার শৈশব কেড়ে নিয়েছিল, অজান্তেই সেই নিয়মের ধারক হয়ে ওঠেন পরবর্তী প্রজন্মের সামনে। প্রশ্ন হলো, যে মানুষ একটি ব্যবস্থার ভুক্তভোগী, তিনি কীভাবে কখনো সেই ব্যবস্থারই পুনরুৎপাদক হয়ে ওঠেন?
প্রতি বছর ১১ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিনটি পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বজুড়ে কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্য দূর এবং তাদের জন্য সমান সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই দিবসে চলতি বছরের প্রতিপাদ্য, ‘বাল্যবিবাহ বন্ধ করা এবং কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করা’।
উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া ভয়
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, নিপীড়ন শুধু নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে টিকে থাকে না, টিকে থাকে বিশ্বাসের মধ্য দিয়েও। যে মেয়ে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে, পরিবারের সম্মান রক্ষার দায়িত্ব তার, বিয়েই তার নিরাপদ ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা, কিংবা স্বামীর সংসারে মানিয়ে নেয়াই নারীর সাফল্য— বড় হয়ে সে এসব ধারণাকে প্রশ্নহীন সত্য বলে মেনে নিতে পারে। নিজের জীবনে যে নিয়মকে সে বদলাতে পারেনি, কখনো কখনো মেয়ের জীবনেও সেই নিয়মকেই স্বাভাবিক বলে প্রতিষ্ঠা করে।
সমাজবিজ্ঞানের ভাষায়, এর একটি ব্যাখ্যা হলো ‘ইন্টারজেনারেশনাল ট্রান্সমিশন অব সোশ্যাল নর্মস’— এক প্রজন্মের সামাজিক বিশ্বাস ও আচরণ পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়া। পরিবার এখানে শুধু ভালোবাসা ও মূল্যবোধের আশ্রয় নয়, সামাজিক নিয়ম শেখারও প্রথম প্রতিষ্ঠান। শিশুরা দেখে শেখে, শোনে শেখে, আবার কোন আচরণের জন্য প্রশংসা কিংবা তিরস্কার পেতে হয়, তা থেকেও শেখে। ফলে একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা সব সময় বাইরের কোনো কর্তৃপক্ষের নির্দেশে টিকে থাকে না, পরিবারের দৈনন্দিন সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েও তা পুনর্গঠিত হয়। তবে এই প্রক্রিয়াকে কেবল মায়ের ব্যক্তিগত মানসিকতার সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। যে নারী নিজেই অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন কিংবা মেয়ের অবিবাহিত থাকা নিয়ে লোকলজ্জার আশঙ্কা করেন, তার সামনে বিকল্পের পরিসরও সীমিত হতে পারে। বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ নিয়ে ইউনিসেফের ২০২৫ সালের ‘চাইল্ড ম্যারেজ এভিডেন্স প্রোফাইলস’ এই বাস্তবতার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে। গবেষণা পর্যালোচনায় দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, যৌতুকের চাপ, মেয়েদের যৌনতা ও চলাফেরার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবারের সম্মান হারানোর ভয়কে বাল্যবিবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
যে ক্ষত একদিন নিয়ম হয়ে ওঠে
মানুষ সব সময় নিজের কষ্টের উৎসকে প্রত্যাখ্যান করতে পারে না। কখনো পরিচিত যন্ত্রণাই তার কাছে অপরিচিত স্বাধীনতার চেয়ে নিরাপদ মনে হয়। যে নারীকে সারাজীবন বলা হয়েছে, ভালো মেয়েরা পরিবারের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়, তিনি হয়তো মেয়ের প্রতিবাদকে অধিকারচর্চা হিসেবে না দেখে অবাধ্যতা হিসেবে ব্যাখ্যা করবেন। যে নারী নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখাকে কর্তব্য বলে শিখেছেন, তিনি মেয়ের স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা ভাবতে পারেন। এটি অবশ্য সব মায়ের ক্ষেত্রে সত্য নয়। একই অভিজ্ঞতা কাউকে পুরনো নিয়মের অনুসারী করে, আবার কাউকে সেই নিয়ম ভাঙার সবচেয়ে দৃঢ় মানুষে পরিণত করে। অনেক মা নিজের বাল্যবিবাহের অভিজ্ঞতা থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, মেয়েকে সেই পথের পুনরাবৃত্তি করতে দেবেন না।
পরিবর্তন শুধু বিয়ে ঠেকানো নয়
বাংলাদেশের বাস্তবতায় বাল্যবিবাহ বন্ধের লড়াই শুধু একটি বিয়ে আটকে দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। একটি পরিবারকে মেয়ের বিয়ে পিছিয়ে দিতে বলার পাশাপাশি তাকে সেই সিদ্ধান্ত ধরে রাখার বাস্তব সামর্থ্যও দিতে হবে। মেয়েটির জন্য মানসম্মত শিক্ষা, নিরাপদ চলাচল, দক্ষতা অর্জন, অর্থনৈতিক সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে বিয়ে বিলম্বিত হলেও পুরনো চাপ অন্য কোনো রূপে ফিরে আসতে পারে।
ইউনিসেফের গবেষণা পর্যালোচনায় বাংলাদেশের বিভিন্ন কর্মসূচির অভিজ্ঞতা দেখায়, শিক্ষা, জীবনদক্ষতা, অর্থনৈতিক সহায়তা ও মেয়েদের ক্ষমতায়নের উদ্যোগ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একইসঙ্গে প্রয়োজন মায়েদেরও পরিবর্তনের অংশীদার করা। তাদের শুধু বোঝানো নয় যে বাল্যবিবাহ ক্ষতিকর, বরং কেন তারা কখনো এটিকে প্রয়োজনীয় মনে করেন, সেই ভয় ও অসহায়তার জায়গাগুলোও বুঝতে হবে। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন যে মা, তাকে দোষারোপ করে নয়, মেয়ের বিকল্পগুলো বাস্তব করে তুলেই পরিবর্তনের পথে আনা সম্ভব।
একটি প্রজন্মের ক্ষত পরের প্রজন্মের নিয়ম হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেই নিয়ম ভাঙার ক্ষমতাও এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। সেই পরিবর্তনের শুরু তখনই, যখন মেয়েকে শুধু সমাজের নিয়ম মেনে চলতে শেখানো হয় না— নিয়মটি অন্যায্য হলে তাকে প্রশ্ন করতেও শেখানো হয়।