সাম্রাজ্য থেকে সাম্রাজ্যে: ভিন্ন যুগে রমজানের ভিন্ন রূপ

রাত্রিকালীন বাজার, খাবারের দোকান, মানূষেড় রাতের ভ্রমণ, সব মিলিয়ে রমজান ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। বিশেষ রমজানি রুটি ‘পিদে’, দুধ-ভিত্তিক মিষ্টি ‘গুল্লাচ’, এবং সুগন্ধি শরবত এই সময়েই জনপ্রিয় হয়।

ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের জন্য রমজান সংযমের মাস। বাংলাদেশে রমজান মাস শুরু হলে চারদিকের পরিবেশ, জীবনযাত্রা সবকিছু বদলে যায়। বিশ্বের মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর চিত্রও একই রকম। তবে আজ থেকে বহু বছর আগে কেমন করে পালন করা হত এই রমজান? অতীতে মুসলমানরা কীভাবে রোজা পালন করতেন, তা বুঝতে হলে আমাদের একসঙ্গে প্রবেশ করতে হবে প্রাসাদের ভোজসভায় ও জনপদের অলিতে গলিতে।

উমাইয়া যুগ (৬৬১–৭৫০ খ্রিস্টাব্দ)

৬৬১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া খিলাফত যখন তাদের রাজধানী দামেস্ক নগরীতে স্থাপন করে, তখন ইসলামী শাসনব্যবস্থা অভূতপূর্ব গতিতে বিস্তৃত হচ্ছিল। অল্প কয়েক দশকের মধ্যেই ইসলামী সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত।

সেই সময়ের রমজান পালন প্রাথমিক ইসলামী ধারাতেই ছিল- সংযত, সামষ্টিক এবং আরবীয় সংস্কৃতিতে প্রভাবিত। দামেস্কের গ্র্যান্ড মসজিদ যা পরবর্তীকালে উমাইয়া মসজিদ নামে পরিচিত হয়, সেখানে ইফতারের সময় হত বিশাল জনসমাগম। তেলের প্রদীপের টিম টিম আলোয় কোরআন তিলাওয়াতের আসর বসত ইফতারের পর।

সেখানে সাধারণ মানুষের ইফতারও ছিল সাধারণ, খেজুর, যবের রুটি, দুধ, কখনো সাধারণ মাংসের ঝোল। দই দিয়ে তৈরি পানীয় ‘লাবান’ খাওয়ারও প্রচলন ছিল।

দামেস্কে মুয়াবিয়ার মতো খলিফারা ইফতারের দাওয়াতে গোত্রীয় নেতাদের আমন্ত্রণ জানাতেন, রোজা ভাঙার সঙ্গে সেখানে হত রাজনৈতিক আলাপ। একটি নবগঠিত সাম্রাজ্যে, যেখানে গোত্রভিত্তিক ক্ষমতার ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল, রমজানের সন্ধ্যা ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সূক্ষ্ম রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের সময়।

আব্বাসীয় বাগদাদ: (৭৫০–১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ)

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আব্বাসীয় খিলাফত উমাইয়াদের পরাজিত করে এবং ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করে নতুন রাজধানী বাগদাদ। অল্প সময়েই বাগদাদ হয়ে ওঠে জ্ঞানের, বাণিজ্যের এবং সংস্কৃতির বিশ্বকেন্দ্র। এখানে রমজান এক ভিন্ন মাত্রা পায়- নগরায়িত, বিশ্বজনীন, আলোকোজ্জ্বল। সেখানে বাজারগুলো গভীর রাত পর্যন্ত খোলা থাকত। মসজিদগুলো ঝলমল করত তেলের প্রদীপে। তারাবির পর বসত জ্ঞানীদের পাঠচক্র। অনেক ইতিহাসবিদ উল্লেখ করেছেন— 'অনেক আলেম ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের রাতেই তাদের গ্রন্থরচনা ও পাঠদান জোরদার করতেন।'

বাগদাদে হারুন-উল-রশিদের শাসনামলে (৭৮৬–৮০৯) প্রাসাদীয় রমজান ছিল কিংবদন্তিতুল্য। দরবারি বিবরণে পাওয়া যায় বহু পদের ভোজ, সুগন্ধে ভরা অট্টালিকা, নামাজ পরবর্তী গজলের আসর। ভারত, মধ্য এশিয়া, চীন ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আগত বাণিজ্যিক প্রভাব খাদ্যসংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছিল। বাসমতি সদৃশ চালের পদ, ভেড়ার মাংস, মিষ্টি শরবত, মাহশি নামের সবজি, জাফরান, বাদাম, মিষ্টান্ন ইত্যাদি ছিল ইফতারের আকর্ষণ।

তবে দশম শতাব্দীতে রাজনৈতিক দুর্বলতা ও অর্থনৈতিক চাপের ফলে খাদ্যসংকট দেখা দেয় বাগদাদে। রুটির দাম বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে অস্থিরতার উল্লেখ পাওয়া যায় বিভিন্ন সূত্রে। দুর্ভিক্ষের বছরে সাধারণ মানুষ কখনো কেবল পানি ও অল্প শস্য দিয়েই ইফতার করতেন। আব্বাসীয় যুগে পবিত্র এ মাসে দাতব্য ব্যবস্থা সংগঠিত রূপ পায়। মসজিদ ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান থেকে খাদ্য বিতরণ বাড়ে। যার ফলে অভাবগ্রস্থ মানুষদের জন্যেও এই মাস কিছু স্বস্তিদায়ক ছিল।

অটোমান সাম্রাজ্যঃ (১২৯৯–১৯২২)

অটোমান সাম্রাজ্য রমজানকে রূপ দেয় এক সুপরিকল্পিত নাগরিক উৎসবে। ১৪৫৩ সালে ইস্তাম্বুল রাজধানী হওয়ার পর রমজান নগরজীবনের কেন্দ্রে পরিণত হয়। মসজিদের মিনারের মাঝে ঝুলানো হতো আলোকসজ্জিত বার্তা। যেখানে লেখা থাকত 'রমজান মোবারক' কিংবা 'দানই মহৎ'। ইফতারের মুহূর্ত চারিদিক কেঁপে উঠত কামানের গর্জনে যা রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রতীক। আজও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে এ কামানের প্রচলন রয়েছে।

রাত্রিকালীন বাজার, খাবারের দোকান, মানুষের রাতের ভ্রমণ, সব মিলিয়ে রমজান ছিল জাঁকজমকপূর্ণ। বিশেষ করে, রমজানি রুটি ‘পিদে’, দুধ দিয়ে তৈরি মিষ্টি ‘গুল্লাচ’ এবং সুগন্ধি শরবত এই সময়েই জনপ্রিয় হয়।

অটোমানদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল ইমারেত অর্থাৎ গণরান্নাঘর। পথিক, ছাত্র, বিধবা ও দরিদ্রদের জন্য প্রতিদিন সেখানে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা হতো। রমজানে এই সেবার পরিধি বহুগুণ বাড়ত। ডাল, চাল, শাকসবজি মিশিয়ে বড় কড়াইয়ে রান্না করা হত স্যুপ। অনেক ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়—প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখানে আহার পেতেন। সুলতানরা প্রকাশ্যে দান বিতরণ করতেন, মসজিদে নামাজ আদায় করতেন—রমজান হয়ে উঠত শাসনের নৈতিক বৈধতার প্রকাশ। তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪–১৯১৮) সময় দুর্ভিক্ষ অটোমান ভূখণ্ডকে আঘাত করে। রুটির রেশনিং চালু হয়। বহু পরিবার জলপাই ও পাতলা স্যুপ দিয়েই ইফতার করত। আলোকোজ্জ্বল রমজান হঠাৎই রূপ নেয় টিকে থাকার সংগ্রামে।

মুঘল সাম্রাজ্য- (১৫২৬–১৮৫৭)

দক্ষিণ এশিয়ায় মুঘল সাম্রাজ্য রমজানকে রূপ দেয় পারস্য ঐতিহ্য ও ভারতীয় ঐশ্বর্যের সংমিশ্রণে। দিল্লির মতো নগরীতে রমজানের রাত ভরে উঠত সুগন্ধি রান্নার সুবাসে ও আলোকিত বাজারে। রাজকীয় রান্নাঘর যাকে বলা হত মতবাখ, তা ছিল সুসংগঠিত। রুটি, মাংস, মিষ্টি, পানীয় প্রতিটি বিভাগ আলাদা। জাফরান, গোলাপজল, এলাচ ও লবঙ্গ সুবাসিত করত খাবার। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব (১৬৫৮–১৭০৭) ব্যক্তিগতভাবে কঠোর রোজা পালন করতেন। তার আমলে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি গুরুত্ব বাড়ে এবং দানশীলতা বৃদ্ধি পায়। মসজিদের আশপাশে রমজানের বাজার জমজমাট থাকত। বড় কড়াইয়ে হালিম রান্না হতো। ইফতারে এই হালিমের প্রচলন সেখান থেকেই শুরু হয়।

তবে গ্রামীণ ভারতের বাস্তবতা ছিল কঠিন। কৃষকরা রোজা রেখে মাঠে কাজ করতেন। ইফতারেও খেতেন সামান্য খাবার। তবে মুঘল অনেক সম্রাটই এ মাসে দাতব্য কার্যক্রম চালাতেন, যার ফলে কৃষকদের মুখেও কখনো কখনো হাসি ফুটে উঠত। সেসময় রাজ দরবারে বিশাল আয়োজন করে সর্বস্তরের মানুষদের মাঝেমধ্যে ইফতার করানোর প্রচলনও ছিল।

উমাইয়া, আব্বাসীয়, অটোমান ও মুঘল— এই চার সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতায় একটি সুস্পষ্ট ধারা দেখা যায়। রমজান শুরু হয়েছিল মরু অঞ্চলে খেজুর, পানি ও অত্যন্ত সাধারণ কার্যক্রম দিয়ে। সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তা গ্রহণ করেছে পারস্য আচার, তুর্কি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, ভারতীয় রন্ধনকলাকে। কিন্তু সূর্যাস্তের সেই মুহূর্ত, আজানের সেই ধ্বনি, ইফতারের সেই প্রথম চুমুক, আর সংযমের ধারা অপরিবর্তিত থেকেছে।

আরও