বেরির বাম্পার ফলনে জমে উঠেছে কাকাপোর প্রেম

কাকাপোর প্রজনন মৌসুম সাধারণত ২-৪ বছর অন্তর ঘটে, যখন বেরিজাতীয় দেশীয় রিমু গাছের ফলে বাম্পার ফলন হয়। ওই গাছের ফল কাকাপোর প্রিয়। সর্বশেষ এমন ফলন হয়েছিল ২০২২ সালে। ছানাদের বেঁচে থাকার জন্য বিপুল খাদ্য দরকার। তবে প্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা কীভাবে ফলনের প্রাচুর্য টের পায়, তা স্পষ্ট নয়

বিশ্বের একমাত্র উড়তে না পারা টিয়া পাখি কাকাপো। এক সময় মনে করা হতো, জন্মগত এ বৈশিষ্ট্যের কারণে বিলুপ্তির মুখে এ প্রজাতি। কাকাপো শরীর ভারী ও চলাচল খুবই ধীরগতির। আর শিকারি প্রাণির কাছে খুবই ‘সুস্বাদু’ বিবেচিত হওয়ায় টিকে থাকা ছিল কঠিন। তার ওপর প্রজননের ব্যাপারেও এদের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ঢিলেঢালা।

রাতচরা ও লাজুক স্বভাবের নিউজিল্যান্ডের পাখিটির ভাগ্য এখন ধীরে ধীরে টিকে থাকার দিকে ঘুরছে। এক অভিনব সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলে গত তিন দশকে ৫০ থেকে বেড়ে দুই শতাধিকে ওঠে এসেছে কাকাপোর সংখ্যা। চলতি বছর প্রিয় বেরির বাম্পার ফলন তাদের জীবন করে তুলেছে প্রেমমুখর। ফলে ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ডসংখ্যক ছানা জন্মানোর আশা করছেন সংরক্ষণকর্মীরা।

নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলের তিনটি ছোট ও প্রত্যন্ত দ্বীপে বাস কাকাপোর। বনে তাদের দেখা পাওয়ার সুযোগ খুবই বিরল। তবে ভূগর্ভস্থ বাসার থেকে লাইভস্ট্রিমের বদৌলতে চলতি প্রজনন মৌসুমে একটি পাখি ইন্টারনেটে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সেখানে একটি ছানাও জন্মেছে।

স্বাভাবিক আয়ু পেলে কাকাপোর জীবনকাল হতে পারে ৬০-৮০ বছর। প্রতিটি পাখির ওজন ৩ কিলোগ্রামের বেশি পর্যন্ত হতে পারে। তাদের পেঁচার মতো মুখ, গোঁফের মতো সূক্ষ্ম পালক, আর রয়েছে সবুজ-হলুদ-কালো মিশ্রিত ছোপছোপ পালক, যা বনের ছায়া-আলো মেশানো পরিবেশের সঙ্গে মিশে যায়।

তবে উড়তে না পারার বৈশিষ্ট্যই কাকাপোর টিকে থাকা কঠিন করে তুলেছে। নিউজিল্যান্ডের প্রাণি সংরক্ষণ দপ্তরের কাকাপো বিষয়ক কর্মসূচির অপারেশন ম্যানেজার ডেইড্রে ভারকো বলেন, ‘কাকাপোর গন্ধ খুব তীব্র। তাদের ঘ্রাণ অসাধারণ। মসলাদার ও ফলের মতো।’

শত শত বছর আগে নিউজিল্যান্ডে মানব বসতি স্থাপনের পর এ তীব্র গন্ধই পাখিগুলোর জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের সঙ্গে আসে ইঁদুর, কুকুর, বিড়াল ও স্টোটের মতো প্রাণী। এর পাশাপাশি মানুষের নির্বিচার শিকার ও বনভূমি ধ্বংস মিলিয়ে নিউজিল্যান্ডের সমৃদ্ধ উড়তে না-পারা পাখির ভাণ্ডার থেকে অনেক প্রজাতিই বিলুপ্ত বা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যায়, যার মধ্যে কাকাপোও ছিল।

১৯৭৪ সাল নাগাদ কাকাপোর অস্তিত্বের খবরই পাওয়া যাচ্ছিল না। তবু সংরক্ষণকর্মীরা খোঁজ চালিয়ে যান। অবশেষে ওই দশকের শেষ দিকে কিছু কাকাপো আবিষ্কৃত হয়। তবে পুরোপুরি বিলুপ্তি থেকে ভাগ্য ফেরানোর সহজ ছিল না।

কাকাপোর সংখ্যা ধীরে বাড়ার একটি বড় কারণ হলো, তাদের অদ্ভূত প্রজনন অভ্যাস। একটি ডিম পাড়া সফল হওয়ার পর আরেকটির মাঝে কয়েক বছর, এমনকি কয়েক দশকও কেটে যেতে পারে।

প্রজনন মৌসুম সাধারণত ২-৪ বছর অন্তর ঘটে, যখন বেরিজাতীয় দেশীয় রিমু গাছের ফলে বাম্পার ফলন হয়। ওই গাছের ফল কাকাপোর প্রিয়। সর্বশেষ এমন ফলন হয়েছিল ২০২২ সালে। ছানাদের বেঁচে থাকার জন্য বিপুল খাদ্য দরকার। তবে প্রাপ্তবয়স্ক পাখিরা কীভাবে ফলনের প্রাচুর্য টের পায়, তা স্পষ্ট নয়।

ডেইড্রে ভারকো বলেন, ‘সম্ভবত তারা গাছের মাথায় উঠে ফলনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে। যখন বড় ফলন আসছে, তখন তারা কোনোভাবে সেটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেয়।’

এরপর শুরু হয় আরো অদ্ভুত আচরণ। পুরুষ কাকাপো মাটিতে খোঁড়া বাটির মতো গর্তে অবস্থান নেয় এবং গভীর গর্জন শোন যায়। এর পর শোনা যায় মরিচাধরা খাটের স্প্রিং নড়ার আওয়াজের মতো পরিচিত শব্দ ‘চিং’।

এ সময় রাতে বনজুড়ে পুরুষ পাখির শব্দ শোনা যায় এবং তা স্ত্রী কাকাপোদের ওই গর্তের দিকে আকৃষ্ট করে। স্ত্রী পাখিরা সর্বোচ্চ চারটি ডিম পাড়তে পারে এবং একাই ছানাদের লালন-পালন করে।

পাখিপ্রেমীরা গত মাস থেকে লাইভস্ট্রিমের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়ার বিরল ঝলক দেখছেন। হোয়েনহুয়া হো দ্বীপে বসবাস করে ২৩ বছর বয়সী কাকাপো রাকিউরা। এবার পাখিটি তিনটি ডিম পেড়েছে, যার মধ্যে দুটি নিষিক্ত হয়েছে। প্রজাতিটির টিকে থাকার অনিশ্চয়তা বিবেচনা করে, আসল ডিমগুলো কৃত্রিম ডিম দিয়ে বদলে রেখে ইনকিউবেটরে তা দেয়া হয়েছে।

এক প্রযুক্তিবিদ কৃত্রিম ডিম নিউজিল্যান্ড সময় মঙ্গলবারে সরিয়ে প্রায় ফুটতে-যাওয়া আসল একটি ডিম কাকাপোর বাসায় রাখেন। বদলের সময় কাকাপো কিছুটা দূরে সরে ছিল, তবে অল্প পরেই নির্বিকারভাবে বাসায় ফিরে আসে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর ছানাটি জন্মায়। দ্বিতীয় আসল ডিমটিও কয়েক দিনের মধ্যে বাসায় রাখা হবে।

কাকাপোর চেয়েও অদ্ভুত হয়তো নিউজিল্যান্ডবাসীর এ পাখিকে বাঁচানোর উদ্যোগ। গত তিন দশকে সংখ্যা চারগুণ বাড়াতে কাকাপেরগুলোকে তিনটি প্রত্যন্ত, শিকারিমুক্ত দ্বীপে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি প্রজনন প্রক্রিয়া খুঁটিনাটি তত্ত্বাবধান করা হয়েছে।

ভারকো বলেন, ‘আমরা যা পারি করছি, যেন আর কোনো জেনেটিক বৈচিত্র্য হারিয়ে না যায়। প্রতিটি দ্বীপে সেরা জুটি মিলিয়ে আমরা প্রক্রিয়াটি খুব সতর্কভাবে পরিচালনা করি।’

প্রতিটি পাখির একটি করে নাম আছে এবং তাদের পিঠে ছোট ট্র্যাকার বসানো থাকে। কোনো পাখি হারিয়ে গেলে তাকে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কাকাপো এখনো সংকটাপন্ন প্রজাতি হওয়ায় সংরক্ষণ প্রচেষ্টা শিগগির শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

এপি অবলম্বনে

আরও