রিভিউ

মূল অ্যানিমেশনের প্রাণহীন কার্বন কপি লাইভ-অ্যাকশন ‘মোয়ানা’

নতুন ‘মোয়ানা’ মূল সিনেমার প্রায় দৃশ্য থেকে দৃশ্য, সংলাপ থেকে সংলাপ অনুসরণ করেছে। শুধু অল্প কিছু নতুন অংশ যোগ করা হয়েছে। তবে গানগুলো এখনো দারুণ থাকায় সিনেমাটি যা কিছুটা উপভোগ করা যায়। মোয়ানার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যাথরিন লাগাইয়া, অসাধারণ গান গেয়েছেন তিনি। আর ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে সমুদ্রও আগের চেয়ে আরো নীল দেখায়

ডিজনির লাইভ-অ্যাকশন রিমেক নিয়ে যা-ই বলা হোক না কেন, অন্তত একটি বিষয় তো তারা করেছে! একই গল্পের দুটি সংস্করণ বানিয়ে দর্শকদের সেরাটি বেছে নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। প্রশ্ন হলো— আপনি কোনটি দেখতে চাইবেন? প্রাণবন্ত, আবেগময় ও দারুণ অ্যানিমেটেড ‘মোয়ানা’, যেটি মুক্তি পেয়েছিল ২০১৬ সালে। নাকি ডোয়েইন জনসনকে ফ্যাবিও-ধাঁচের লম্বা চুলের উইগ পরিয়ে বানানো উদ্দেশ্যহীন নতুন রিমেকটি?

মূল কথায় আসা যাক, সমুদ্র তো বিশাল। অথচ পলিনেশীয় রাজকুমারী মোয়ানা যেন ১০ বছর ধরে একই জায়গায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ডিজনির সেরা নায়িকাদের একজন সে। হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের কিংবদন্তি নির্মাতা রন ক্লেমেন্টস ও জন মাস্কারের কম্পিউটার অ্যানিমেশনে তৈরি হয় মূল সিনেমাটি। সঙ্গে আছে লিন-ম্যানুয়েল মিরান্ডার প্রাণবন্ত গান। সব মিলিয়ে ‘মোয়ানা’ এই শতাব্দীতে ডিজনির অ্যানিমেশনের অন্যতম সেরা অর্জন।

কিন্তু এর পর থেকে যাত্রাটা খুব একটা মসৃণ হয়নি। শুরুতে স্ট্রিমিং সিরিজ হিসেবে পরিকল্পনা করা ‘মোয়ানা ২’ গল্পটিকে তেমন এগিয়ে নিতে পারেনি। আর নতুন লাইভ-অ্যাকশন রিমেকটি করেছে তারও কম। বক্স অফিসে যত আয়ই করুক না কেন, ডিজনির বেশিরভাগ লাইভ-অ্যাকশন রিমেকই বিশেষ প্রশংসা পায়নি। তবে থমাস কেইল পরিচালিত ‘মোয়ানা’ যেন সবচেয়ে বেশি পথ হারিয়েছে। এটি মূলত কল্পনাপ্রবণ অ্যানিমেশনকে সরিয়ে একই গল্পের নিষ্প্রাণ বাস্তব সংস্করণ তুলে ধরেছে। ফলাফল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, অনেক সময় একে ‘স্যাটারডে নাইট লাইভ’-এর কোনো ব্যঙ্গাত্মক স্কেচ বা ‘স্পাইডার-ভার্স’ সিনেমার হাস্যরসাত্মক অল্টারনেটিভি ইউনিভার্সের দৃশ্য বলে মনে হয়।

নতুন ‘মোয়ানা’ মূল সিনেমার প্রায় দৃশ্য থেকে দৃশ্য, সংলাপ থেকে সংলাপ অনুসরণ করেছে। শুধু অল্প কিছু নতুন অংশ যোগ করা হয়েছে। তবে গানগুলো এখনো দারুণ থাকায় সিনেমাটি যা কিছুটা উপভোগ করা যায়। মোয়ানার চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যাথরিন লাগাইয়া, অসাধারণ গান গেয়েছেন তিনি। আর ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণে সমুদ্রও আগের চেয়ে আরো নীল দেখায়।

মাউই চরিত্রে ডোয়েইন জনসন

কিন্তু অনুকরণের কারণে সৃজনশীলতা যেন পুরোপুরি হারিয়ে গেছে। অ্যানিমেশনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এক নিমেষে যেকোনো কিছু সম্ভব করে তোলা। সেখানে নির্মাতার কল্পনাশক্তি স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। মূল ‘মোয়ানা’র সৌন্দর্য ছিল এর গভীর পলিনেশীয় সাংস্কৃতিক সংযোগ এবং কার্টুনধর্মী মজার মুহূর্তগুলোয় অর্ধদেবতা মাউই (ডোয়েইন জনসন)-এর হাস্যকর রূপ বদলের ক্ষমতা, বিশাল কাঁকড়া তামাতোয়া (জেমেইন ক্লেমেন্ট)-এর নাচ-গানে ভরা উপস্থিতি কিংবা সমুদ্রের ঢেউয়ের মোয়ানাকে আবার জাহাজে তুলে দেয়ার দৃশ্য।

এসব কল্পনাকে বাস্তব করে তোলা মানে শুধু ফরম্যাট বদল নয়। বরং এতে তাদের অ্যানিমেশনের প্রাণটাই হারিয়ে গেছে। ফলে সিনেমাটি প্রকৃত শিল্পকর্মের বদলে যেন মঞ্চে অভিনীত কোনো নাটক মনে হয়। এটা স্বীকার করবেন যে— প্রথম ‘মোয়ানা’য় ছোট্ট নারকেল-যোদ্ধা কাকামোরাদের দেখে কেউই ভাবেনি, ‘এদের আরো বাস্তবসম্মত সংস্করণ দেখানো খুব প্রয়োজন।’

লাইভ-অ্যাকশন সংস্করণের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত মোয়ানার জন্মভূমি মোতুনুই দ্বীপকে নতুনভাবে ফুটিয়ে তোলা। মূল সিনেমাটি যদি পলিনেশীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হয়ে থাকে, তবে বাস্তব মানুষের উপস্থিতি সেই সংস্কৃতিকে আরো স্পর্শযোগ্য করে তুলেছে। মোয়ানার গোত্রপ্রধান বাবার চরিত্রে টোঙ্গান বংশোদ্ভূত নিউজিল্যান্ডের অভিনেতা জন তুই বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন।

তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অ্যানিমেশন থেকে লাইভ-অ্যাকশনে রূপান্তরের ফলে দৃশ্যের অনেক কিছু হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব চরিত্রের আসল শক্তিই ছিল কার্টুন হয়ে থাকা—যেমন মোরগ হেইহেই। আর সবচেয়ে বেশি ভুগেছে তামাতোয়া চরিত্রটি। তার গান ‘সো শাইনি’, যা একসময় মূল সিনেমার অন্যতম সেরা আকর্ষণ ছিল, এখন পুরো ছবির সবচেয়ে অস্বস্তিকরভাবে নির্মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।

এর কোনোটিই অবশ্য ক্যাথরিন লাগাইয়ার দোষ নয়। তার প্রাণবন্ত অভিনয়ই ছবিটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রধান শক্তি। আত্মবিশ্বাসী, দুষ্টুমিভরা এবং শেষ পর্যন্ত বীরোচিত মাউই চরিত্রটি ডোয়েইন জনসনের জন্য সবচেয়ে মানানসই চরিত্রগুলোর একটি। তাই অবাক লাগে, এখানে তার অভিনয়ে অ্যানিমেটেড মাউইয়ের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। সম্ভবত সাম্প্রতিক সময়ে তিনি বেশি নাটকীয় চরিত্রে অভিনয়ের দিকে ঝুঁকেছেন। আবার এটাও হতে পারে, কল্পনার জগতে জন্ম নেয়া চরিত্রটির জন্য তার বয়স এখন আর ততটা মানানসই নয়—আর একটি উইগ সেই পার্থক্য ঢাকতে পারেনি।

ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’ খুব শিগগিরই প্রেক্ষাগৃহে আসছে। দেবতা, সমুদ্রযাত্রা এবং ঘরে ফেরার পৌরাণিক কাহিনিভিত্তিক সিনেমার জন্য সময়টি বেশ উপযুক্ত। মোয়ানা ফ্র্যাঞ্চাইজিটি আর কত দূর যাবে, তা কেউ জানে না—তৃতীয় অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের কাজ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। তবে এতটুকু নিশ্চিত, মোয়ানার এখন নতুন কোনো সমুদ্রে পাড়ি দেয়ার প্রয়োজন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।

ওয়াল্ট ডিজনি কোম্পানির প্রযোজনায় ‘মোয়ানা’ প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে আজ। মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন ছবিটিকে পিজি রেটিং দিয়েছে। কারণ এতে রয়েছে অ্যাকশন ও বিপজ্জনক পরিস্থিতি, কিছু ভীতিকর দৃশ্য, সস্তা রসিকতা এবং সংক্ষিপ্ত কিছু বিষয়ভিত্তিক উপাদান। ছবিটির দৈর্ঘ্য ১১৫ মিনিট।

জেক কয়েলের রিভিউ অবলম্বনে

আরও