হাতে হাতে স্মার্টফোন, রাস্তায় ছুটে চলা বৈদ্যুতিক গাড়ি, চিকিৎসাখাত ও প্রযুক্তি উপাদান; কিংবা দূর আকাশে ঘূর্ণায়মান উইন্ড টারবাইন— আধুনিক এই প্রযুক্তিগুলোর আড়ালে লুকিয়ে আছে একদল নীরব ধাতু, যাদের ছাড়া বর্তমান সভ্যতা কার্যত অচল। এগুলো ‘বিরল খনিজ (রেয়ার আর্থ)’ নামে পরিচিত। রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ হলো ১৭টি ধাতব মৌলের একটি বিশেষ শ্রেণি। এসব ধাতব আধুনিক প্রযুক্তির জন্য খুবই জরুরি। বর্তমানে বহুল আলোচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম, স্মার্টফোন, ইলেকট্রিক গাড়ি, উইন্ড টারবাইন ও এলইডি লাইট তৈরিতে এগুলো ব্যবহার হয়। এমনকি এমআরআই মেশিনের মতো উন্নত চিকিৎসা যন্ত্রেও বিরল খনিজ অন্যতম উপাদান হিসেবে কাজে লাগে।
বিরল খনিজ নামের কারণে এগুলোকে বিরল মনে হলেও আসলে তা খুব বিরল নয়। প্রকৃতিতে এদের উপস্থিতি আছে। কিন্তু এগুলো মাটি থেকে আলাদা করা সহজ নয়। উত্তোলন ও পরিশোধন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং ব্যয়বহুল।
বিরল খনিজের উপাদানগুলো হলো- ১. স্ক্যান্ডিয়াম ২. ইট্রিয়াম ৩. ল্যান্থানাম ৪. সেরিয়াম ৫. প্রাসিওডিমিয়াম ৬. নিওডিমিয়াম ৭. প্রোমেথিয়াম ৮. সামারিয়াম ৯. ইউরোপিয়াম ১০. গ্যাডোলিনিয়াম ১১. টার্বিয়াম ১২. ডিসপ্রোসিয়াম ১৩. হোলমিয়াম ১৪. এরবিয়াম ১৫. থুলিয়াম ১৬. ইটার্বিয়াম ও ১৭. লুটেশিয়াম
‘রেয়ার আর্থ’ শব্দটি মূলত একটি ঐতিহাসিক পরিভাষা। এই ধাতুগুলো প্রথম আবিষ্কৃত হয় সেরাইট বা গ্যাডোলিনাইটের মতো বিরল খনিতে। এখানে ‘আর্থ’ শব্দটি আজকের অর্থে মাটিকে বোঝায় না; বরং ফরাসি ও জার্মান ভাষায় একসময় শব্দটি অক্সাইড বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। বিরল খনিজ মৌলগুলো প্রথম আলাদা করা হয়েছিল অক্সাইড আকারে। এসব অক্সাইড সাধারণত বাদামি বা কালো রঙের গুঁড়া হয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে— যেমন নিওডিমিয়ামের অক্সাইড এর রং তুলনামূলকভাবে অনেক হালকা হতে পারে।
প্রথাগতভাবে ল্যান্থানাইড মৌলগুলোকে হালকা ও ভারী রেয়ার আর্থ—এই দুই ভাগে ভাগ করা হয়। পারমাণবিক সংখ্যা ৫৭ থেকে ৬৩ পর্যন্ত মৌলগুলোকে হালকা বিরল খনিজ এবং ৬৪ থেকে ৭১ পর্যন্ত মৌলগুলোকে ভারী বিরল ধরা হয়। স্ক্যান্ডিয়াম (পারমাণবিক সংখ্যা ২১) হালকা এবং ইট্রিয়াম (পারমাণবিক সংখ্যা ৩৯) ভারী বিরল খনিজের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এদের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য কাছাকাছি। তবে এই বিভাজন সব গবেষণায় একভাবে মানা হয় না। কোথাও কোথাও মাঝারি-ভারী বিরল খনিজ নামে তৃতীয় একটি শ্রেণির কথাও উল্লেখ করা হয়।
ভারী বিরল খনিজ তুলনামূলকভাবে অনেক বিরল। এগুলো প্রক্রিয়াজাত করাও হালকা বিরল খনিজের তুলনায় জটিল। এ কারণেই বাজারে এদের দাম সাধারণত বেশি হয়।
প্রথম থেকে ১৭তম মৌল আবিষ্কারের যাত্রা
রেয়ার আর্থ ডটকমের তথ্যমতে, মৌলগুলোর আবিষ্কার প্রক্রিয়া ছিল দীর্ঘ ও জটিল। একটি মৌল বাদে বাকি সব বিরল খনিজ মৌল আবিষ্কার করতে প্রায় ১২০ বছর সময় লেগেছে। ১৭৯৪ সালে ইট্রিয়াম আবিষ্কারের মাধ্যমে এই যাত্রা শুরু হয় এবং ১৯০৭ সালে লুটেশিয়াম আবিষ্কারের মাধ্যমে তা শেষ হয়। লুটেশিয়াম আবিষ্কারের প্রায় ৪০ বছর পর যুক্তরাষ্ট্রের ওক রিজ ন্যাশনাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা প্রোমিথিয়াম শনাক্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে পর্যায় সারণীর শেষ অপূর্ণতাটিও পূরণ হয়।
বিরল খনিজের মৌলের অনেকগুলোই একই সময়ে একাধিক বিজ্ঞানীর মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছিল। এর কারণ ছিল, প্রাথমিক সময়ে খনিজ থেকে মৌল আলাদা করার মতো উন্নত প্রযুক্তির অভাব। ফলে একই মৌল বিভিন্ন গবেষকের হাতে ভিন্ন ভিন্নভাবে ধরা পড়ে। এই ইতিহাসে সুইডেনের স্টকহোমের কাছে অবস্থিত ইটারবি খনির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৭৮৭ সালে সুইডিশ সেনা কর্মকর্তা কার্ল অ্যাক্সেল অ্যারেনিয়াস সেখানে একটি কালো রঙের খনিজ আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ওই খনি থেকেই ইট্রিয়ামসহ আরো কয়েকটি বিরল খনিজ মৌল শনাক্ত করা হয়।
জঁস ইয়াকব বেরজেলিয়াস এবং সুইডিশ রসায়নবিদ কার্ল গুস্তাভ মোসান্ডার উদ্ভাবিত একটি পৃথকীকরণ পদ্ধতি বিরল খনিজের মৌল আবিষ্কারে বড় ভূমিকা রাখে। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সব বিরল খনিজের মৌল শনাক্ত করা সম্ভব হয় এবং এ নিয়ে গবেষণাও অনেক এগিয়ে যায়। পাশাপাশি ১৮৫৯ সালে স্পেকট্রাল বিশ্লেষণ পদ্ধতির বিকাশ বিরল খনিজের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় এনে দেয়।
বিরল খনিজের বাজারে চীনের একচেটিয়া প্রভাব
বিরল খনিজের বাজারে বর্তমানে চীনের অবস্থান সবার শীর্ষে। উত্তোলন-পরিশোধন প্রক্রিয়া জটিল ও ব্যয়বহুল হওয়া, পরিশোধন প্রক্রিয়ায় অতিমাত্রায় কার্বন নিঃস্বরণ এবং সংশ্লিষ্ট আরো কিছু কারণে যুক্তরাষ্ট্র বিরল খনিজের ওপর গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে অনেক আগেই। ‘এশিয়া টাইমস’-এ প্রকাশিত রাভি কান্তির ‘ইউএস, চায়না ওয়ান্স হ্যাড রেয়ার-আর্থ অ্যাসেস ইন দ্য হোল, বাট দ্য ইউএস ফোল্ডেড’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র পিছু হটলে চীন সে সুযোগটি দারুণভাবে গ্রহণ করে এবং বিরল শিল্পে দক্ষতা অর্জন করে। চীন পরিবেশগত বোঝা মেনে নিয়েই এ শিল্প উন্নয়নে ব্যাপক সম্পদ বিনিয়োগ করেছে। বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বিরল খনিজের সঞ্চয় (৪৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন) রয়েছে চীনের কাছে। ফলে বর্তমান বিশ্বে উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে দেশটি। তারা পরিশোধন ক্ষমতার ৮৫ শতাংশ এবং প্রক্রিয়াকরণের ৯৮ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। বর্তমানে এ খনিজ সংক্রান্ত পেটেন্টের ৮০ শতাংশই তাদের নিয়ন্ত্রণে।
চীনে ৩৯টি বিশ্ববিদ্যালয় বিরল খনিজের ওপর প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম পরিচালনা করে এবং ৭টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্রিয়াকরণের কোর্স প্রদান করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠান এখন এই চ্যালেঞ্জ নেয়ার চেষ্টা করছে, তবুও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র চীনের স্তরে পৌঁছায়নি। সব মিলিয়ে, এই শিল্পে চীনের আধিপত্য চ্যালেঞ্জ করা অত্যন্ত কঠিন।
দ্য জার্মান মিনারেল রিসোর্সেস এজেন্সি (ডিইআরএ) মনে করছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত বিরল খনিজ ধাতুর চাহিদা গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৬ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০২০ সালে যেখানে রেয়ার আর্থ অক্সাইডের চাহিদা ছিল ১ লাখ ৩১ হাজার টন, সেখানে তা বেড়ে ১ লাখ ৮৮ হাজার ৩০০ টনে পৌঁছাতে পারে। এই বাড়তি চাহিদার প্রধান কারণ হলো উইন্ড টারবাইন ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে ব্যবহৃত স্থায়ী চুম্বক। বেলজিয়ামের গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় কেএইউ ল্যুভেনের একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শুধু ইউরোপেই ২০৫০ সালের জলবায়ু লক্ষ্য অর্জন করতে বর্তমানে ব্যবহৃত বিরল খনিজ ধাতুর তুলনায় ৭ থেকে ২৬ গুণ বেশি প্রয়োজন হবে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) তুলনামূলকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪০ সালে বিরল খনিজের চাহিদা বর্তমানের তুলনায় ৩ থেকে ৭ গুণ বেশি হতে পারে। এসব কারণেই যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য বিরখ খনিজকে ‘গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল’ হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করেছে।
ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নিজস্ব বিরল খনিজ উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ জোরদার হয়েছে। একসময় বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরল খনিজের খনি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার পাহাড়ের গিরিপথে। তবে চীনের প্রবল প্রতিযোগিতার মুখে অকার্যকর হয়ে পড়ায় ২০০২ সালে খনিটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৭ সালে আবার খনির কার্যক্রম শুরু হয়। তবু এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ওই পাহাড় থেকে উত্তোলিত কাঁচামালকে শিল্প পর্যায়ে চূড়ান্ত পণ্যে রূপান্তর করার পর্যাপ্ত সক্ষমতা নেই। প্রয়োজনীয় পরিশোধনাগার ও চুম্বক কারখানা এখনো নির্মাণাধীন। ফলে অক্সাইডের মতো প্রাথমিক পণ্য চীনে পাঠানো হয় এবং পরে সেগুলো স্থায়ী চুম্বক হিসেবে চীন থেকে আবার আমদানি করা হয়।
চীন শুধু নিজ দেশে উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না; বরং বিদেশে বিরল খনিজ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজ নিয়ে কাজ করা কোম্পানিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করে। এ কারণে চীন বহু বছর ধরে একদিকে যেমন বিরল খনিজের সবচেয়ে বড় উৎপাদক, তেমনি সবচেয়ে বড় আমদানিকারকও। চীনে প্রক্রিয়াজাত ভারী বিরল খনিজের বড় একটি অংশ আসে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে। ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও, সামনের দিনগুলোতেও এ খনিজটির বাজারে চীনের প্রভাব শক্ত অবস্থানেই থাকবে। লন্ডনের বেসরকারি সংস্থা সেফের মিনারেলস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক আবিগেল হান্টারের মতে, কৌশলগত বিনিয়োগ ও সরকারি সহায়তার মাধ্যমে চীন এ খাতে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে কয়েক আলোকবর্ষ এগিয়ে রয়েছে।
বিরল খনিজ মৌল আধুনিক সভ্যতার নীরব চালিকাশক্তি। আমাদের দৈনন্দিন জীবন ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে এদের ভূমিকা অপরিহার্য। বর্তমানে চীনের একচেটিয়া আধিপত্য বিশ্ব বাজারে অন্য দেশগুলোর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশগুলো এ শিল্পে নিজের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক রাজনীতিতে বিরল খনিজের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। এটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় মূল প্রভাবশালী উপাদান হিসেবে রয়ে যাবে।