ডিসেম্বরের শেষ রাত। আকাশে সূর্য ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায়, আর পৃথিবী যেন এক নিঃশব্দ প্রত্যাশায় থমকে দাঁড়ায়। শহর হোক বা গ্রাম, সমুদ্রতীর হোক বা পাহাড়ি অঞ্চল, এই মুহূর্তটিতে মানুষ একত্র হয়, অন্তরের গভীর থেকে পুরনোকে বিদায় জানাতে এবং নতুনকে স্বাগত জানাতে। বছর শেষের এই রাত, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে, আলাদা আলাদা রীতি ও উৎসবের মধ্য দিয়ে একটি সাধারণ সত্য প্রকাশ পায়, মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা শেষ হওয়া মুহূর্তগুলোকে সংরক্ষণ করা, এবং নতুন বছরের দিকে সাহসী পা ফেলা।
জাপানের শেষ ঘণ্টাধ্বনি
টোকিও ও কিয়োটোর শান্ত মন্দিরগুলোতে এ রাতের নিঃশব্দ ভেঙে দেয় বিশাল ঘণ্টার প্রতিধ্বনি। জোয়া-নো-কানে নামক বৌদ্ধ রীতি অনুযায়ী, বিশাল ব্রোঞ্জের ঘণ্টা ১০৮ বার বাজানো হয়। ঘণ্টা ধ্বনিগুলো যেন বছরব্যাপী জমে থাকা চিন্তাকে এক এক করে মুক্ত করে, আর শেষ ঘণ্টার প্রতিধ্বনি নতুন বছরের দরজা খুলে দেয়।
মাদ্রিদের ‘দ্বাদশ আঙুরের সংস্কৃতি’
ইউরোপের দিকে গেলে, মাদ্রিদের পুয়ের্তা দেল সোলের ক্লক টাওয়ারের সামনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়, সবার চোখ স্থির থাকে বিশাল ঘড়ির কাটায়। ঘড়ির ১২ টি ঘণ্টায় ১২টি আঙুর খায় সবাই। এই দ্বাদশ আঙুরের রীতি শুধুই খাওয়ার খেলাই নয়, এটি সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য এবং একে অপরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির প্রতীক। প্রতিটি আঙুরকে বছরব্যাপী ভালোবাসা, স্বাস্থ্য, ও সুখের প্রতীক হিসেবে ধরে নেন সেখানকার হিজপ্যানিক সম্প্রদায়ের মানুষেরা। তাদের হাত ধরেই এই ‘দ্বাদশ আঙুরের সংস্কৃতি’ বিশ্বের আরও বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে।
ডেনমার্কের ভাংচুরের সংস্কৃতি
ডেনমার্কের ছোট শহরগুলোতে, বছর শেষের সময় বাড়িগুলোতে জমা করে রাখা হয় পুরনো প্লেট ও থালাবাসন। রাত ১২ টার আগেই এগুলো বন্ধু বা প্রতিবেশীর দরজায় ছুঁড়ে মারা হয়। শব্দের আওয়াজ, ভাঙা থালার টুকরো এইসব তাদের আনন্দের অংশ। তারা বিশ্বাস করে এই ধ্বংসাত্মক আনন্দ পুরনো বছরের দুশ্চিন্তা দূর করে নতুন বছরকে খোলা মনে স্বাগত জানানোর শিক্ষা দেয়।
সমুদ্রে ডুব দিয়ে নতুন বছর উদযাপন
দক্ষিণ আমেরিকার রিও ডি জেনেরিওর কোপাকাবানা বিচে, রাত ভোরের সঙ্গে মিলেমিশে উদযাপন হয়। 'রেভেলিয়ন' নামক উৎসবে, হাজার হাজার মানুষ সাদা পোশাকে ঢেকে রাখে নিজেকে যা শান্তি ও আধ্যাত্মিক পরিচ্ছন্নতার প্রতীক। তারা সমুদ্রের ঢেউতে সাতবার লাফ দেয়, প্রতি লাফে স্বাস্থ্যের, প্রেমের, এবং নতুন বছরের সমৃদ্ধির প্রার্থনা করে। ফুল উপহার হিসেবে সমুদ্রে ছাড়া হয়, যা প্রার্থনার সঙ্গে মিলেমিশে বয়ে চলে জলে।
আগুনের স্বাগতম
ইকুয়েডরে, বিদায়ের অনুষ্ঠান হয় আগুনের আলোয়। স্থানীয়রা তৈরি করে 'আনো ভিয়েজো' নামে বড় আকারের পুতুল, যা পুরনো বছরের কষ্ট, অপ্রাপ্তি ও অশুভ ঘটনাগুলোকে প্রতিফলিত করে। মধ্যরাতে, পুতুলগুলো জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং ধোঁয়া আকাশে মিলিয়ে যায়। তাদের মতে এটি যেন একটি সমষ্টিগত আত্মবিশ্লেষণ, পুরনো সবকিছু আগুনে বিলীন হয়ে যায়, আর মানুষ নতুন বছরের দিকে শুদ্ধতা নিয়ে এগিয়ে যায়।
পেয়াজ ঝুলিয়ে বর্ষবরণ
ফার্মহাউস থেকে শহর পর্যন্ত, এ রাতের রীতিনীতিগুলো বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময়। কিউবা ও লাতিন আমেরিকার কিছু দেশ বাড়ির বাইরে জল ছুড়ে দেয় যা পুরনো দুর্ভাগ্য ধুয়ে ফেলার প্রতীক। গ্রিসে ঘরের দরজায় পেয়াজ ঝুলানো হয়, যা বৃদ্ধি ও পুনর্জন্মের প্রতীক। দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে হপ্পিন জন নামক খাবার খাওয়া হয় যা সমৃদ্ধি ও বৃদ্ধি কামনার প্রতীক।
ফার্স্ট-ফুটার সংস্কৃতি
ব্রিটেন ও স্কটল্যান্ডে, ডিসেম্বর ৩১ তার বিস্তৃতি ও ঐতিহ্যের জন্য প্রসিদ্ধ। স্কটল্যান্ডের হগমেনাই নামক প্রাচীন উৎসবের বিশেষ রীতি হলো “ফার্স্ট-ফুটার”অর্থাৎ মধ্যরাতের পর প্রথম যে ব্যক্তি কোনো বাড়ির দোরগোড়ায় প্রবেশ করে, তাকে সাধারণত উপহার নিয়ে আসতে হয়, এটিকে পুরো বছরের শুভ সূচনার প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। কয়লা, রুটি, হুইস্কি এসব প্রতীকী উপহার সৌভাগ্য, বন্ধুত্ব, এবং সমৃদ্ধির প্রার্থনার সঙ্গে মিলেমিশে ঐতিহ্যবাহী আনন্দের এক চিত্র গঠন করে।
আরো কিছু ভিন্ন সংস্কৃতি
কোলম্বিয়া ও মেক্সিকোতে কেউ খালি স্যুটকেস নিয়ে বাড়ির চারপাশে ঘোরে যা ভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চারের প্রতীক। লাল অন্তর্বাস পড়ার রীতি তুরস্ক ও লাতিন আমেরিকায় প্রেম ও সৌভাগ্য আকর্ষণের জন্য পালিত হয়। আয়ারল্যান্ডে মানুষ হাঁড়ি ও পাত্র বাজিয়ে দূর করে দুর্ভাগ্য, আর ওয়েলসে শিশুরা গান গাইতে গাইতে দরজায় কয়েন বা খাবারের প্রার্থনা করে, এ সবই এক অদ্ভুত মিশ্রণ যা পুরনো বছরের শেষকে মহিমা দেয়।
ডিসেম্বর ৩১-এর এ রাত, পৃথিবী যেন একত্রে নিঃশ্বাস ফেলে। অতীতকে সম্মান জানিয়ে বর্তমানকে উদযাপন করে, এবং ভবিষ্যতের দিকে দৃষ্টি স্থির করা হয়। বিদায়ের এই শিল্প কেবল অনুষ্ঠান নয়, এগুলো মানবতার এক চিরন্তন গল্প, যেখানে পুরনোকে মুক্তি দেওয়াই নতুনকে গ্রহণের প্রথম পদক্ষেপ।