জাপানে বসন্তের সঙ্গে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ‘হে ফিভার’ বা পরাগ অ্যালার্জির প্রকোপ। বর্তমানে জাপানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৩ শতাংশ মানুষ মাঝারি থেকে তীব্র মাত্রার হে ফিভারে আক্রান্ত। তুলনামূলকভাবে এ হার যুক্তরাজ্যে ২৬ শতাংশ আর যুক্তরাষ্ট্রে ১২-১৮ শতাংশ। খবর বিবিসি।
নাক দিয়ে পানি পড়া বা চোখ চুলকানোর মতো অস্বস্তি ছাড়াও, এ অ্যালার্জির কারণে মানুষের ঘুম ও মনোযোগে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে। আক্রান্তদের মধ্যে অ্যাজমা ও ফুড অ্যালার্জির ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তবে এ সংকটের ধাক্কা কেবল স্বাস্থ্যের ওপরই নয়, দেশের অর্থনীতির ওপরও পড়ছে। হে ফিভারের পিক সিজনে কর্মীদের অসুস্থতাজনিত ছুটি ও মানুষের কেনাকাটা কমে যাওয়ার কারণে জাপানের দৈনিক প্রায় ১৬০ কোটি ডলার বা ১৩৬ কোটি পাউন্ড অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।
জাপানের এ তীব্র অ্যালার্জি সমস্যার পেছনে কোনো দূষণ বা প্রাকৃতিক পরিবেশ দায়ী নয়। এর দায় সাত দশক আগে সরকারের নেয়া কিছু ভুল সিদ্ধান্তের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপানের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করা হয়। টোকিও, ওসাকা ও কোবের মতো বড় শহরের চা পাহাড়গুলো সম্পূর্ণ গাছপালাহীন হয়ে পড়ে। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে বৃক্ষহীন পাহাড়গুলোর কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা দেয় ভূমিধস ও বন্যা।
কোবের জন্য বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে সবুজ বন। ছবি: সিটি অব কোবে
জাপানের এ তীব্র অ্যালার্জি সমস্যার পেছনে কোনো দূষণ বা প্রাকৃতিক পরিবেশ দায়ী নয়। এর দায় সাত দশক আগে সরকারের নেয়া কিছু ভুল সিদ্ধান্তের। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জ্বালানি সংকটের কারণে জাপানের প্রাকৃতিক বনাঞ্চল উজাড় করা হয়
মাটি ক্ষয় রোধে দ্রুত বনায়ন ও কাঠের জোগান নিশ্চিত করতে সেসময় সরকার কেবল জাপানি সিডার ও জাপানি সাইপ্রেস এ দুটি দু প্রজাতির চিরহরিৎ গাছের চারা রোপণ করে। বর্তমানে এ বাগানগুলো জাপানের মোট স্থলভাগের এক-পঞ্চমাংশ (প্রায় ১ কোটি হেক্টর) এলাকা জুড়ে রয়েছে। গাছগুলো ৩০ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর বিপুল পরিমাণ হালকা ওজনের পরাগরেণু বাতাসে ছড়াতে শুরু করে, যা সহজেই শহরের দিকে ভেসে আসে। বর্তমানে প্রায় সব গাছের বয়স ৩০ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় পরাগরেণু নিঃসরণের পরিমাণ সর্বোচ্চসীমায় পৌঁছেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে জাপানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। ভিডিওটি দেখে মনে হয়, সবুজ বনাঞ্চল থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী বা মেঘ উড়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবে তা ধোঁয়া ছিল না; ছিল কোটি কোটি ‘পোলেন’ বা পরাগরেণু।
জাপানে জলাভূমি পুনরুদ্ধার ও প্রায় ১০ হাজার হেক্টর বাণিজ্যিক বনকে তৃণভূমি ও মিশ্র পর্ণমোচী বনে রূপান্তর করার কাজ চলছে। ছবি: এফপিসিজে
বন রূপান্তরের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে প্রযুক্তি ও চিকিৎসার সাহায্য নিচ্ছে জাপান। বাতাসে পরাগরেণুর মাত্রা বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে
২০২৩ সালে জাপান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এ অ্যালার্জিকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে ঘোষণা করে। সেইসঙ্গে আগামী ৩০ বছরের মধ্যে পরাগরেণুর পরিমাণ ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে সুগি বনের এলাকা ২ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে জলবায়ুর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক রাখতে গাছ কাটার পাশাপাশি সেখানে নতুন প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। জলাভূমি পুনরুদ্ধার ও প্রায় ১০ হাজার হেক্টর বাণিজ্যিক বনকে তৃণভূমি ও মিশ্র পর্ণমোচী বনে রূপান্তর করার কাজ চলছে। এর জন্য ২০২৪ সাল থেকে জাপানের প্রত্যেক বাসিন্দার ওপর বার্ষিক ১ হাজার ইয়েন (৬ ডলার) ‘বন পরিবেশ কর’ ধার্য করা হয়েছে।
বন রূপান্তরের পাশাপাশি তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে প্রযুক্তি ও চিকিৎসার সাহায্য নিচ্ছে জাপান। বাতাসে পরাগরেণুর মাত্রা বুঝতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৩ সালে দেশজুড়ে হাজার হাজার পোলেন-ডিটেক্টিং রোবট স্থাপন করা হয়েছে, যা পরাগরেণুর মাত্রা অনুযায়ী চোখের রঙ পরিবর্তন করে মানুষকে সতর্ক করে। সেইসঙ্গে বিজ্ঞানীরা জিনগতভাবে রূপান্তরিত চাল উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন, যা খেলে অ্যালার্জির উপসর্গ কমবে। এছাড়া জিহ্বার নিচে নেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি ইমিউনোথেরাপি ট্যাবলেটের সফল ট্রায়ালও সম্পন্ন হয়েছে।