প্রদর্শনী

বিষণ্নতার রঙে আঁকা ‘ষষ্ঠরেখা—দ্য মার্জিন অব মেমোরিজ’

ঢাকার ধানমন্ডির ৪ নম্বর রোডে গ্যালারি চিত্রকের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই মনে হয় যেন এক এক করে জীবনের সব স্তর, সব স্মৃতি, সব অজানা ব্যথা ক্যানভাসে সাজানো আছে। এখানেই চলছে ‘ষষ্ঠরেখা—দ্য মার্জিন অব মেমোরিজ’ শীর্ষক দলীয় চিত্রকর্ম প্রদর্শনী। বাংলাদেশের কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এসএম সুলতান, শামসুল ইসলাম নিজামী, কাইয়ুম চৌধুরী, ধীরাজ চৌধুরী, হামিদুজ্জামান খানসহ অনেকের কাজ আছে এখানে। আছে অনেক তরুণের প্রচলিত ও নিরীক্ষাধর্মী চিত্রকর্ম।

প্রদর্শনীতে ৫০ জন শিল্পীর ৬০টি চিত্রকর্ম স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত ও পর্তুগালের শিল্পীর কাজ রয়েছে। কেউ জীবনের, কেউ মৃত্যুর, কেউ অন্তর্জগতের গল্প তুলেছেন রঙের ভাষায়। স্টুডিও সিক্স বির আয়োজনে গত ২৫ অক্টোবর বিকালে প্রদর্শনীটির উদ্বোধন হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও অধ্যাপক জামাল আহমেদ।

প্রদর্শনী ঘুরে দেখা যায়, শুরুতেই বাংলাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীদের দুর্লভ কাজ। দেয়ালে টাঙানো এসএম সুলতানের জলরঙের একটি আনটাইটেল্ড চিত্র—রঙের মধ্যে যেন মাটি, ঘাম আর আত্মা একাকার হয়ে গেছে। গ্রামের নারী-পুরুষের দৈনন্দিন কাজের বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রত্নেশ্বর সূত্রধরের চিত্রে দেখা যায় জাহাঙ্গীরনগরের লেকে ভেসে থাকা লাল শাপলার জীবন্ত উপস্থিতি। ছবিটি এত জীবন্ত ও আকর্ষণীয় যে দর্শনার্থীদের এটিকে মুঠোফোনে ধারণ করতে দেখা গেছে, কেউ আবার পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন।

রত্নেশ্বর সূত্রধরের ‘রিফ্লেকশন ইন ব্লুম’

নতুন প্রজন্মের কাজে বিষণ্ন-বেদনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ফাইন আর্টের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ফাতেমা ইসলাম প্রিমার চিত্রকর্মটির নাম ‘ইনারসেলফ।’ এ ছবিতে ফাতেমা নিজের ভেতরের কষ্ট, উদ্বেগ ও না বলা কথাগুলোকে টেক্সচার, সুতা ও রঙের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এটা তার মানসিক পৃথিবীর একটি প্রতিকৃতি।

ফাতেমা ইসলাম প্রিমার চিত্রকর্ম ‘ইনারসেলফ’

চিত্রকর্মটি সম্পর্কে তরুণ এ শিল্পী বলেন, ‘এর পেছনে রয়েছে আমার নিজের ভেতরের জগৎ নিয়ে ভাবনা। আমার মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ বা যেসব কথা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না, সেগুলোকেই আমি ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছি। আমি মূলত টেক্সচার বেজড কাজ করি। এখানে অ্যাক্রিলিক মিডিয়া ব্যবহার করেছি। সঙ্গে রয়েছে এনামেল রঙ ও সেলাইয়ের কাজ। সেলাইয়ের সুতার ফোঁড়গুলোর মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছি—আমার ভেতরের অনুভূতিগুলো যেন জোর করে বাইরে আসতে চায়। সেই টান, সেই চেপে ধরা ব্যথাটা সুতোর টানে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি।’ কেউ হয়তো গানে, কেউ গল্প-কবিতার মাধ্যমে নিজের ব্যথা প্রকাশ করেন। শিল্পী প্রিমা এখানে ছবির মাধ্যমে তার গহিনের কষ্টকে তুলে এনেছেন।

অন্যদিকে নাজমুস সাকিবের পেন ড্রইংয়ে করা ‘ভাইব্র্যান্ট ঢাকায়’ ফুটে উঠেছে ঢাকার তিনটি সামাজিক স্তরের জীবন। ফ্লাইওভার ব্রিজের ওপরের গাড়ি, নিচের দোকানপাট, রিকশা ও পথচারী। একই ছবিতে শহরের উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের অস্তিত্ব একত্রে মিলেছে এক সজীব বাস্তবতায়।

প্রদর্শনীর কিউরেটর আলভি সাকিবের নিজের কাজও আছে প্রদর্শনীতে। তার চিত্রকর্মটির নাম ‘হোয়াট ডু ইউ এক্সপেক্ট’; যেখানে অনেক চাকচিক্য ও আভিজাত্যে ভরা এক নারীর মুখাবয়ব। কিন্তু সেই আভিজাত্যের মধ্যেও বিষণ্নতা রয়েছে। চিত্রকর্মটি সম্পর্কে শিল্পী আলভি বলেন, ‘মানুষ অনেক কিছু অর্জন করার পরও ভেতরে যে অশান্তি ও কষ্ট রয়ে যায়, সেটাই আমি আমার কাজের মাধ্যমে প্রকাশ করেছি।’

আলভি সাকিবের ‘হোয়াট ডু ইউ এক্সপেক্ট’

শিল্পী পলি আনামের দুটি ইনস্টলেশন কাজ আছে। নাম ‘আনটোল্ড পেইন থার্টি সেভেন ও থার্টি এইট। এ দুটি ছবিও বিষণ্নতা ধারার।

আন্তর্জাতিক সীমানায়

প্রদর্শনীর এক বিশেষ আকর্ষণ পর্তুগালের শিল্পী আনা সিলভিয়া মালহাজোর কাজ ‘আই ফাউন্ড ইউ ইনসাইড মাইসেলফ’। তিনি ব্যবহৃত চা ব্যাগের ভেতরে ক্ষুদ্রাকারে চিত্রকর্ম এঁকেছেন। দর্শক যখন কাছ থেকে তাকান, মনে হয় চা পাতার সুবাসের মধ্যেই কারো মুখ, কারো ছায়া, কারো ব্যথা লুকানো আছে। ভারতের পদ্মভূষণপ্রাপ্ত শিল্পী ধীরাজ চৌধুরীর দুটি কাজ, ‘আনটাইটেল্ড-ওয়ান’ ও ‘আনটাইটেল্ড-টু’ মানুষের মুখাবয়বে সময়ের চিহ্ন উপস্থাপন করা হয়েছে।

শেষ প্রান্তে আলো ও আধ্যাত্মিকতা

দেয়ালের শেষ প্রান্তে টাঙানো একটি ব্যতিক্রম কাজ। একটি স্কাল্পচার নির্মিত হয়েছে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআনের সূরা আশ-শারাহর ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতের ভাবনা থেকে। ক্যালিগ্রাফি ধারার কাজটি করেছেন শিল্পী ও আর্কিটেক্ট নাজেম আনোয়ার। স্কাল্পচারে রূপ দেয়া আয়াতটির বাংলা অর্থ ‘কষ্টের পরেই আসে স্বস্তি।’

গ্যালারি থেকে বের হয়ে যখন শহরের শব্দে ফিরে আসার চেষ্টা করা হয়, মনে হয় স্মৃতির প্রান্ত থেকে আমরা সবাই একে অন্যের ইনারসেলফের দিকে তাকিয়ে আছি। সবার জীবনে আছে কোলাহল, ব্যস্ততা, কারো আছে আভিজাত্যও। কিন্তু কেউই বিষণ্নতার বাইরে নয়।

প্রদর্শনীটি শেষ হচ্ছে আজ, শেষ দিনও রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে।

আরও