বাটন ফোন— স্রেফ ফোনই তো নয়, আবেগে মাখামাখি স্মৃতির পসরা

তখন প্রতি মিনিট কলরেট ছিল ৪-৬ টাকা। তখনকার হিসাব অনুযায়ী যা ছিল অনেক ব্যয়বহুল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মোবাইল অপারেটরগুলো আনল ‘হ্যাপি আওয়ার’—শুক্রবার দুপুর কিংবা গভীর রাতে অর্ধেক বা তারও কম খরচে কথা বলার সুযোগ। ফলে সে বিশেষ সময়টুকু অনেকের জন্য অলিখিত উৎসব হয়ে উঠত। মানুষ সপ্তাহজুড়ে কথা জমিয়ে রাখত। ফোনে বসার আগে অনেকেই মনে মনে একটি তালিকা তৈরি করে রাখত, যাতে একটি সেকেন্ডও অপচয় না হয়। প্রতিটি সেকেন্ডের আর্থিক মূল্য থাকায় কথা হতো অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক

প্রযুক্তির এ প্রাচুর্যের যুগে যখন-তখন যার সঙ্গে ইচ্ছে কথা বলা যায়। যখন খুশি বার্তা পাঠানো যায়। এক ক্লিকে হোয়াটসঅ্যাপ বা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে ছবি পাঠানো, ভয়েস নোট দেয়া কিংবা ভিডিও কলে সরাসরি মুখ দেখা যায়। কিন্তু খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যখন মোবাইল ফোনে যোগাযোগের পেছনে জড়িয়ে ছিল গভীর অর্থনৈতিক হিসাব। আর সে হিসাবের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছিল অদ্ভুত সুন্দর যাপনচিত্র। ২০০০-এর দশকে ফিচার ফোন ছিল দ্রুত যোগাযোগের ভরসা। সেই বাটন ফোনের যুগে অপারেটরদের দেয়া কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা কীভাবে আমাদের ভাষা, আবেগ আর মনস্তত্ত্বকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল, তা আজ ফিরে দেখার মতো এক গল্প।

তখন প্রতি মিনিট কলরেট ছিল ৪-৬ টাকা। তখনকার হিসাব অনুযায়ী যা ছিল অনেক ব্যয়বহুল। পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে মোবাইল অপারেটরগুলো আনল ‘হ্যাপি আওয়ার’—শুক্রবার দুপুর কিংবা গভীর রাতে অর্ধেক বা তারও কম খরচে কথা বলার সুযোগ। ফলে সে বিশেষ সময়টুকু অনেকের জন্য অলিখিত উৎসব হয়ে উঠত। মানুষ সপ্তাহজুড়ে কথা জমিয়ে রাখত। ফোনে বসার আগে অনেকেই মনে মনে একটি তালিকা তৈরি করে রাখত, যাতে একটি সেকেন্ডও অপচয় না হয়। প্রতিটি সেকেন্ডের আর্থিক মূল্য থাকায় কথা হতো অত্যন্ত গভীর ও আন্তরিক।

টাকা বাঁচানোর আরেকটি অদ্ভুত কৌশল ছিল ‘‌মিসড কল’। টাকা না খরচ করেই কীভাবে নিজের উপস্থিতি বা কোনো বার্তা অপর প্রান্তে পৌঁছে দেয়া যায়—তার ওপর ভিত্তি করে এক অলিখিত কোড বা ভাষা তৈরি হয়েছিল সেই যুগে।

একটা মাত্র রিং বা মিসড কল দেয়ার মানে ছিল—‘আমি সাবধানে পৌঁছে গেছি’ কিংবা ‘বাসার নিচে চলে এসেছি, নেমে এসো’। প্রিয় মানুষটির মিসড কল পাওয়া মানে—‘আমি তোমার কথা ভাবছি’। আর টানা কয়েকটি মিসড কল ছিল ‘তাড়াতাড়ি কল ব্যাক করো’র সংকেত। রিং হওয়ার সময়টুকুতেই জমে থাকত এক বুক ব্যাকুলতা আর উত্তেজনা। এক পয়সাও খরচ না করে কেবল ডিসপ্লেতে নিজের নামটা ভাসিয়ে নেয়ার এ আবেগ আজকের আনলিমিটেড প্যাকের যুগে মেলা কষ্টকর।

তখনকার দিনে একটি মেসেজ বা এসএমএস-এর দৈর্ঘ্য ছিল সর্বোচ্চ ১৬০টি অক্ষর। এর থেকে একটি ক্যারেক্টার বেশি হয়ে গেলেই ২ টাকার জায়গায় ৪ টাকা কেটে নেয়া হতো। তরুণ বা মধ্যবিত্তদের জন্য এ বাড়তি দুই টাকাই বেশ বড় ধাক্কা। ফলে জন্ম নিল এক নতুন অর্থনৈতিক ভাষাতত্ত্ব। পয়সা বাঁচাতে শুরু হলো শব্দ কেটে ছোট করার সংস্কৃতি। ‘‌কেমন আছ?’ হয়ে গেল ‘kmn aso’, ‘ভালোবাসি’ রূপ নিল ‘vlobashi’-তে। ইংরেজি শব্দেও চলল দেদার কাঁচি; ‘Tomorrow’ হয়ে গেল ‘2mrw’, আর ‘Good Night’ সংক্ষিপ্ত হয়ে দাঁড়াল ‘gn’-এ। আজকের সোশ্যাল মিডিয়া স্ল্যাং বা চ্যাটিং ল্যাঙ্গুয়েজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল দুই দশক আগে ২টা টাকা বাঁচানোর মিতব্যয়িতা থেকেই।

ফিচার ফোনের সে সময়ে আরেকটি বড় মুশকিল ছিল মেমোরির সীমাবদ্ধতা। নোকিয়া ১১০০ বা ১৬০০ মডেলে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ১০০টির বেশি মেসেজ জমা রাখা যেত না। ইনবক্স ভর্তি হয়ে গেলেই স্ক্রিনের কোণে একটি ছোট্ট খাম চিহ্ন দপ দপ করে জ্বলত আর লেখা উঠত ‘Inbox Full’। নতুন মেসেজ আসার পথ সচল করতে ডিলিট করতে হতো পুরোনো স্মৃতি।

প্রিয় বন্ধুর বার্তা, জন্মদিনের শুভেচ্ছা কিংবা বিশেষ কারো পাঠানো টেক্সটগুলোর মধ্য থেকে কোনটিকে রাখা হবে আর কোনটিকে চিরতরে মুছে ফেলা হবে তা নিয়ে চলত দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। এ সংকটের এক অদ্ভুত সমাধান বের করেছিল তখনকার প্রজন্ম। ফোন থেকে ডিলিট করার আগে প্রিয় মেসেজগুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখা হতো।

এরই মাঝে এল ৫ টাকা বা ১০ টাকায় ১০০টি, ৫০০টি এমনকি ১০০০টি পর্যন্ত এসএমএস কেনার প্যাক। মেয়াদের ভেতর সেই এসএমএস শেষ করার জন্য বন্ধুদের সঙ্গে রাতজেগে অবিরাম মেসেজ আদান-প্রদান চলত। অনেকেই আবার নির্দিষ্ট নম্বরে কম খরচে এসএমএস পাঠানোর জন্য স্পেশাল এফএনএফ সেট করে রাখতেন।

আজকের স্মার্টফোনে সাইলেন্ট বা ভাইব্রেশন মোড খুব স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু ফিচার ফোনের যুগে রিংটোন এবং ভাইব্রেশন ছিল ব্যক্তিত্ব ও আবেগের অংশ। সেই সময় নোকিয়ার নিজস্ব টিউন কিংবা ৮-বিট ও পলিফোনিক টোন মানুষের মুখস্থ ছিল। কম্পোজার অপশনে গিয়ে পিয়ানোর নোটের মতো কোড বসিয়ে নিজের পছন্দের রিংটোন বানিয়ে নেয়ার আনন্দই ছিল আলাদা।

আর কাঠের পড়ার টেবিল কিংবা লোহার ট্রাঙ্কের ওপর রাখা ফোনটিতে যখন ভাইব্রেশন হতো, পুরো ঘর গমগম করে উঠত। ‘‌ভনভন’ শব্দে টেবিলের এক কোণ থেকে অন্য কোণে ফোন সড়ে যাওয়ার ধাতব আওয়াজ আজও এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া জাগায়। ক্লাসরুমে বেঞ্চের নিচে ব্যাগের ভেতর রিংটোন বেজে ওঠার সেই ভয় কিংবা দ্রুত ‘‌এনসিপি’ (NCP - No Call Please) মেসেজ পাঠানোর তাড়াহুড়ো এখন শুধুই স্মৃতি।

আজ আমরা ‘হাইপার-কানেক্টিভিটি’র যুগে বাস করি। ২৪ ঘণ্টা ফ্রি কল বা ইন্টারনেটে নিরবচ্ছিন্ন কথা বলার সুবিধা আমাদের হাতের মুঠোয়। কিন্তু আমরা কি আসলেই আগের মতো গভীর মনোযোগ দিয়ে একে অপরের কথা শুনি? এখন মেসেজ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই ‘ব্লু টিক’ দেখে বোঝা যায় অপর প্রান্তের মানুষটি তা পড়েছে কিনা। যোগাযোগের গতি এখন তীব্র। কিন্তু সেই ধীরগতির এসএমএসের যুগের মধ্যেই ছিল এক অন্যরকম রোমাঞ্চ। একটি মেসেজ পৌঁছাতে সময় লাগত, উত্তর পেতেও অপেক্ষা করতে হতো। এখনকার সার্বক্ষণিক টুটাং আর নোটিফিকশনের ভিড়ে সেই উত্তেজনা, রোমাঞ্চ কোথায়?

আরও