জলবায়ু সংকটে আশার আলো দেখাচ্ছে সুদানের বিরল কফি বিন

কফি উৎপাদনকারী দেশগুলো বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষ দেশ ব্রাজিলে তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে উৎপাদন প্রায় ১২ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কফির দাম গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন কফি উৎপাদন চরম সংকটের মুখে, তখন দক্ষিণ সুদানে খুঁজে পাওয়া এক বিরল প্রজাতির কফি বিন গবেষক ও কফি প্রেমীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। ‘এক্সেলসা’ নামের এই প্রজাতিটি তীব্র প্রতিকূল আবহাওয়াতেও টিকে থাকতে সক্ষম, যা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী কফি চাষে চলমান বৈশ্বিক সংকট নিরসনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দক্ষিণ সুদানের নজারা অঞ্চলের একটি কফি খেত। সেখানে চারাগাছে পানি দিচ্ছেন একজন শ্রমিক

বর্তমানে বিশ্বের কফি বাজার এক কঠিন সময় পার করছে। কফি উৎপাদনকারী দেশগুলো বিশেষ করে বিশ্বের শীর্ষ দেশ ব্রাজিলে তীব্র খরা ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে উৎপাদন প্রায় ১২ শতাংশ কমে গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কফির দাম গত কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে গবেষকরা দক্ষিণ সুদানের স্থানীয় এক্সেলসা বিনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ এটি বর্তমানে প্রচলিত অ্যারাবিকা বা রোবাস্টা প্রজাতির তুলনায় অনেক বেশি জলবায়ু সহনশীল।

খেত থেকে ফল সংগ্রহ করে তা একটি খোসা ছাড়ানোর মেশিনে প্রক্রিয়াজাত করে বীজ আলাদা করা হয়

এক্সেলসা কফির প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাধারণ সহ্যক্ষমতা। এই গাছের শিকড় মাটির অনেক গভীরে যায় এবং এর পাতা ও কাণ্ড বেশ শক্ত ও মোটা হয়। ফলে এটি প্রচণ্ড তাপ এবং দীর্ঘস্থায়ী খরা অনায়াসেই সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে, যা অন্য কোনো প্রজাতির কফির পক্ষে প্রায় অসম্ভব। এছাড়া সাধারণ কফি গাছে যেসব রোগবালাই বা পোকামাকড় আক্রমণ করে, এক্সেলসা প্রজাতির গাছ সেগুলো প্রাকৃতিকভাবেই প্রতিরোধ করতে সক্ষম। বর্তমানে বিশ্ব বাজারে এই কফির উপস্থিতি ১ শতাংশেরও কম হলেও, ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা ও কফি শিল্প রক্ষায় একেই সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বীজগুলো পরে রোদে উল্টে-পাল্টে ভালোভাবে শুকানো হয়

দক্ষিণ সুদানের স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই কফি চাষ কেবল একটি কৃষিকাজ নয়, বরং এটি তাদের দারিদ্র্য বিমোচনের একটি নতুন স্বপ্ন। পশ্চিম দক্ষিণ সুদানের কৃষক ক্যাথরিন বাশিয়ামা ১২ সন্তানের জননী। দীর্ঘ তিন বছর হাড়ভাঙা খাটুনি আর পরিচর্যার পর তার লাগানো এক্সেলসা গাছে এখন কফি ধরতে শুরু করেছে। ক্যাথরিন স্বপ্ন দেখছেন, এই কফি বিক্রি করে তিনি তার সন্তানদের নিয়মিত স্কুলে পাঠাতে পারবেন এবং পরিবারের দীর্ঘদিনের অভাব দূর করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়বেন।

তবে দক্ষিণ সুদানে কফি শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পথে বেশ কিছু বড় বাধা রয়েছে। দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে দেশটির অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক। এখান থেকে কফি রফতানির ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি খরচ হয়। এ ছাড়া প্রায়ই ঝোপঝাড়ের আগুনে অনেক বাগান পুড়ে নষ্ট হয়ে যায়।

শুকানো কফি বিনগুলো সবশেষে ভেজে, গুড়া করে তৈরি করা হয় কফি পাউডার

এতসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও কৃষি গবেষকরা বর্তমানে প্রায় দেড় হাজারের বেশি স্থানীয় কৃষককে এই বিরল কফি চাষের আধুনিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। ইউরোপের বিভিন্ন নামি কফি শপে এই কফির বিশেষ চাহিদা তৈরি হচ্ছে, কারণ এর স্বাদ কিছুটা মিষ্টি এবং এতে চকলেট ও ফলের এক অনন্য মিশ্র স্বাদ পাওয়া যায়। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের যুগে দক্ষিণ সুদানের এই বিরল বিন কেবল কফির কাপই পূর্ণ করবে না, বরং গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে জর্জরিত দেশটির অর্থনীতিতেও বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসবে বলে আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

এপি অবলম্বনে

আরও